গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডি ৮এ’র ইসমাত মুস্তারির বাসায় বিদ্যুৎ চলে যায়। পাঁচ সেকেন্ডের মধ্যে ডিজেলচালিত জেনারেটর চালু হতেই ফিরে আসে বিদ্যুৎ। গত পরশু মঙ্গলবার রাতে লালমনিরহাটের হাতিবান্ধায় রাত ১০টার পর থেকে পরের দিন ৭টা পর্যন্ত অন্তত ৫০ বার বিদ্যুৎ গেছে। সেখানে ডিজেলচালিত জেনারেটরের বিদ্যুৎ-সেবা নিতে পারেনি মানুষ।
ঘোষিত লোডশেডিংয়ের দুদিন পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে ঢাকা, বরিশাল ও খুলনায় লোডশেডিং ১ থেকে ২ ঘণ্টার মধ্যে ছিল। তবে পিছিয়ে থাকা উত্তরবঙ্গের আট জেলায় পরিস্থিতি ভয়াবহ ছিল। ওই অঞ্চলে প্রথম দিনেই ভেঙে পড়েছে লোডশেডিংয়ের সূচি।
সরকার গত পরশু এলাকাভিত্তিক লোডশেডিং শুরু করেছে উদ্দেশ্য ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ রেখে জ্বালানি সাশ্রয় করা। দেশের ১০টি ডিজেল-বিদ্যুৎকেন্দ্র তিন বছর ধরে বন্ধ থাকায় এসব কেন্দ্র নতুন করে বন্ধ রাখার সুযোগ নেই। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার ধনি ও উচ্চ মধ্যবিত্ত থাকেন এমন সব জায়গায় যেখানে বিদ্যুৎ না থাকলেও ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে তারা বিদ্যুৎ নিতে পারেন। ফলে ডিজেল সাশ্রয় হচ্ছে না। উল্টো এসব ডিজেলচালিত জেনারেটরের দক্ষতা বা এফিসিয়েন্সি অত্যন্ত কম হওয়ায় ভর্তুকির ডিজেলে পুড়েছে বেশি। কার্যত জ্বালানির অপচয় হয়েছে।
লোডশেডিংয়ে ধনি-গরিব : গতকাল ঢাকার ধানম-িতে বেলা ১১টায় বিদ্যুৎ চলে যায়, ফিরে আসে দুপুর ১২টায়। আবার ১২টায় পান্থপথ কলাবাগান গ্রিনরোড এলাকায় বিদ্যুৎ চলে যায়, ঠিক দুপুর ১টায় ফিরে আসে। ঢাকার খিলক্ষেত এলাকায় দুপুর ১টায় বিদ্যুৎ চলে যায়, ফিরে দুপুর ২টায়। তবে এ চিত্র ঢাকার সব এলাকায় ছিল না। অপেক্ষাকৃত নিম্ন আয়ের মানুষ থাকেন ঢাকার এমনসব এলাকায় যেখানে বিদ্যুৎ বিভাগের বেঁধে দেওয়া সময়ের চেয়ে লোডশেডিং ছিল বেশিক্ষণ। মিরপুর এলাকার শেওড়াপাড়া থেকে আফজাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার বাসায় দুপুরে দেড় ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল।
গতকাল ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি হওয়ায় তাপপ্রবাহের মাত্রা ছিল কম। ফলে দিনে হওয়া লোডশেডিংয়ে বড় ভোগান্তিতে পড়েনি সাধারণ মানুষ।
ঢাকার ধানমন্ডি, গুলশান, বনানীসহ অভিজাত এলাকায় এক ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং হয়নি। এসব এলাকায় লোডশেডিংয়ের সময় অধিকাংশ ভবনে জেনারেটরের বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের রংপুর বিভাগের আট জেলা রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী তীব্র লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে, কোনো কোনো উপজেলায় ৪ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত।
লালমনিরহাটের হাতিবান্ধার অবস্থা ছিল অসহনীয়। গত পরশু মঙ্গলবার রাত ১০টা থেকে পরের দিন পর্যন্ত অন্তত ৩০ বার বিদ্যুৎ যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানকার বাসিন্দা আলতাফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাত ১০টার পর বিদ্যুৎ এসেই চলে গেছে। সকাল ৭টা পর্যন্ত ছিল এ অবস্থা। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। এখনো রাত পড়ে আছে।’
ঠাকুরগাঁও শহরে লোডশেডিংয়ের প্রথম দিন আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না। গতকাল লোডশেডিং হয় ১০ ঘণ্টা। সেখানকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘গতকাল আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না, ১০ বার বিদ্যুৎ গেছে। আর আজ সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে আট ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে। রাত তো পড়েই আছে। প্রতিবার বিদ্যুৎ যাওয়ার পর এক-দেড় ঘণ্টা পরে বিদ্যুৎ এসেছে। উত্তরের শেষ জেলা পঞ্চগড়ে গতকাল ৮ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া গেছে। দেশের সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের বাস কুড়িগ্রাম জেলায়। সেখানে গড়ে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল বলে জানা গেছে। কুড়িগ্রামের চিলমারীর সুমন আজম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে ৯ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়েছে।’
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে অঞ্চলভেদে বিভিন্ন মাত্রার লোডশেডিং হয়েছে। আনোয়ারার বাসিন্দা এরশাদ নাবিল গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ৪৮ ঘণ্টায় ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাইনি। গত রাত ১০টা থেকে আজ দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ১৫ ঘণ্টায় ৪ ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ ছিল।
দেশের হাওর এলাকা হিসেবে খ্যাত সুনামগঞ্জের শহর ছাড়া বাকি এলাকা ছিল লোডশেডিংয়ের কবলে। শেরপুরের ঝিনাইগাতিতে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের খবর পাওয়া গেছে।
রংপুর জেলা শহরে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা আর কোনো ইউনিয়নে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রংপুরের তারাগঞ্জের একারচালি ইউনিয়ন দক্ষিণ হাজিপাড়ায় গত পরশু সকাল থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না।
উত্তরের আট জেলায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। আগস্ট মাস শুরুর আগেই বড়পুকুরিয়া ৫২৫ মেগাওয়াটের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে কয়লার অভাবে। ইতিমধ্যে কয়লার অভাবে বড়পুকুরিয়ায় ১২৫ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। ১২৫ মেগাওয়াটের আরেকটি ইউনিট দীর্ঘদিন ধরে মেরামত করা হচ্ছে। বড় পুকুরিয়ায় এখন ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে। মজুদ কয়লা দিয়ে বড়জোর আর দিন কয়েক চলতে পারে। তারপর বন্ধ হয়ে যাবে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র।
ঢাকা থেকে উত্তরের জেলাগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে। কিন্তু ঢাকাসহ সারা দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি থাকায় উত্তরের ওই আট জেলায় কতখানি সরবরাহ করা যাবে সেটাই এখন বড় কথা। বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতির চরম বিপর্যয় ঘটবে।
জ্বালানি সাশ্রয় হচ্ছে না : সারা দেশের ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। কারণ ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় জ্বালানির দাম বাড়ার আগেই ইউনিটপ্রতি ছিল ২৪ টাকা। সম্প্রতি এসব বন্ধ কেন্দ্র চালানো হবে দাবি করে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় এতে ১০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় হবে। অথচ ঢাকার ধানম-ি, গুলশান, বনানীসহ অভিজাত এলাকায় যখনই এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ বন্ধ রেখেছে বিদ্যুৎ বিভাগ, সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ডিজেলচালিত জেনারটর চালু হয়েছে।
ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা বেশি আর বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত ডিজেলচালিত জেনারেটরের দক্ষতা কম। সে কারণে এসব ডিজেলচালিত জেনারেটর চালু থাকলে তাতে জ্বালানি সাশ্রয় হবে না, বরং জ্বালানির অপচয় বাড়বে।
ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায় সকাল ১১টায় এক ঘণ্টার লোডশেডিং শুরু হয়। সরেজমিনে দেখা গেছে, তিন নম্বর থেকে সাতাশ নম্বরের মোড় পর্যন্ত সব শপিং মলে জেনারেটরের বিদ্যুৎ ছিল। সাশ্রয় চিন্তা বাস্তবে ফল দেয়নি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিজেল সাশ্রয়ের বক্তব্যটি জনরোচক। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। নতুন করে বন্ধ করার সুযোগ নেই। আর ঢাকায় যখন লোডশেডিং হচ্ছে তখন যাদের সামর্থ্য আছে তারা ভর্তুকির ডিজেল দিয়ে জেনারেটর চালু করে বিদ্যুৎ নিচ্ছে। এতে ডিজেল সাশ্রয় না হয়ে অপচয় হচ্ছে। আর উত্তরের অনাগ্রসর জেলাগুলোতে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। সেখানে অভাবী মানুষ আরও বেকায়দায় পড়ছে। তাদের অবশ্য ডিজেলচালিত জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ নেই। এ লোডশেডিংয়ে ধনীর সংকট হচ্ছে না, বেকায়দায় পড়েছে দরিদ্ররা। দরিদ্ররা সবখানে সংকটে পড়ে।
যেসব এলাকা কম সংকটে থাকবে : বরিশাল বিভাগে কম লোডশেডিং হবে। কারণ হলো ভোলার গ্যাসক্ষেত্র থেকে সরবরাহ করা গ্যাসে ভোলায় ৪৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। বরিশালে সামিটের ১১০ মেগাওয়াটের ফার্নেস তেলভিত্তিক একটি কেন্দ্র রয়েছে। পটুয়াখালীতে ইউনাইটেডের ১৫০ মেগাওয়াটের আরেকটি ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া পায়রার ১২৫০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের একটা অংশ যায় বরিশালের বিভিন্ন জেলায়।
খুলনা জেলায়ও পরিস্থিতি উত্তরের আট জেলার মতো নয়। খুলনা শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ হচ্ছে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, নড়াইলেও বিদ্যুতের লোডশেডিং সীমার মধ্যে রয়েছে। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে পরিস্থিতি অতটা অসনীয় নয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জ্বালানি সংকট একটি বৈশ্বিক সমস্যা। আমরা সে সমস্যাকে ঠিকমতো মোকাবিলা করার জন্য আগেই কিছু ব্যবস্থা নিয়েছি। দেশবাসীকে কিছুদিনের জন্য সংকট মেনে নেওয়ার আহবান জানাচ্ছি।’