ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের প্রত্যন্ত এলাকা আরু উপত্যকা। সেখানকার বাসিন্দারা বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকেন, কবে যাযাবর গুজ্জররা আসবে? তাদের হাতে তৈরি নানা উপাদেয় খাবার খাওয়ার জন্য তাদের এই অপেক্ষা। পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করা গুজ্জররা ঐতিহ্যবাহী নানা খাবার তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। লিখেছেন নাসরিন শওকত
আরু উপত্যকা
মহিষের গলায় বাঁধা ঘণ্টা বাজছে। ওপারে বাছুরের সঙ্গে খেলছে শিশুরা এটা ব্রাদেন গ্রাম। হিমালয় পর্বতজুড়ে থাকা টানা কয়েকটি চূড়ায় ২৪টির মতো মাটির ঘর নিয়ে ব্রাদেন গ্রাম। গ্রীষ্মের মাসগুলেতে এই গ্রামেই আসে যাযাবর গুজ্জররা। এ সময়ে তারা তাদের গবাদি পশু চরাতে ও নিজেদের হাতের তৈরি সুস্বাদু খাবার বিক্রি করতে এ গ্রামে আসে। কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর থেকে অনন্তনাগ জেলার বিজবিহারা বাজারে যেতে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এই জেলার ১১টি তহসিলি শহরের একটি পাহালগাম। অনন্তনাগ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে পাহালগাম শহরের অবস্থান। ‘মেষপালকদের গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত পাহালগাম আরু উপত্যকার জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। এখানকার অপরূপ তৃণভূমি, আদিম হ্রদ ও পর্বতমালা পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে। আর ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করে মনকে চাঙ্গা করতে লিডার নদী আনন্দের সঙ্গে তাদের স্বাগত জানায়। এবার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭ হাজার ৯২০ ফুট ওপরে উঠলেই দেখা যাবে এক অপরূপ নৈসর্গের আরু উপত্যকা। এ উপত্যকার কাছাকাছি পৌঁছলেই এক রোমাঞ্চকর উত্তেজনা কাজ করে। এর ছোট বাজারে গুজ্জররা তাদের জিনিসপত্র বিক্রি করতে আসে। ব্রাদেন গ্রামের নিচে সমতলভূমিতে তারা শীতের মৌসুম কাটায়।
যাযাবর গুজ্জর
১৩৮ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতে প্রায় ৬ কোটি (৬০ মিলিয়ন) স্বীকৃত নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী (উপজাতি) রয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমের প্রদেশ মহারাষ্ট্রেই ৫ কোটি উপজাতির বাস। এই ৫ কোটির মধ্যে যাযাবর উপজাতি রয়েছে ৩১৫টি। যারা তফশিলি জাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে গুজ্জর গোষ্ঠী মধ্য এশিয়া থেকে শ্বেতাঙ্গ হুন জাতির সঙ্গে ভারতে এসেছিল। গুজ্জররা মূলত যাযাবর সম্প্রদায়। তারা গুর্জর নামেও পরিচিত। তাদের কিছু গোত্র হুন, আফতালি নামেও পরিচিত। তাদের এই জাতিগত নাম থেকে বোঝা যায় যে তারা হুন গোত্র থেকে এসেছে। সপ্তম শতাব্দীতে তারা ভারতের মরুভূমি অঞ্চল রাজস্থানে ‘গুর্জারাত্রা’ নামে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাদের মহান সম্রাট মিহর ভোজা ভারতের প্রায় পুরো উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে গুজ্জর শাসনকে বিস্তৃত করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান ও ভারতের বেশ কিছু অঞ্চলে এই গুজ্জর উপজাতির নামের পাশাপাশি বিভিন্ন বংশের নামও খুঁজে পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে রয়েছে- গুজরাত, গুজরানওয়ালা, গুজরখান, গুজরগড়, গুজরপুর, বাসিগুজ্জারান, চাচিয়ান, খাতানিয়ান, খারিয়ান, হুনওয়ারা এবং আরও অনেক। ১৯৪৭-এ ভারতের স্বাধীনতার সময়েও গুজ্জর রাজা তিনটি রাজ্য শাসন করতেন। পরে যা ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।
সংস্কৃতি
ভারত, পাকিস্তান আফগানিস্তান এই তিন দেশে গুজ্জর শব্দটি ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে ব্যবহার হয়েছে। ভারতে গুজ্জরকে একটি বর্ণ, একটি উপজাতি বা একটি গোষ্ঠী হিসেবে বোঝানো হয়। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে গুজ্জররা স্থানীয়ভাবে একটি জাতি, জাত, গোত্র (কওম) বা সম্প্রদায় (ব্যারাদার) হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করে। গুজ্জররা ধর্মীয় ও ভাষাগত দিক থেকে বৈচিত্র্যময়। বসবাসকারী অঞ্চল ও দেশের ভাষায় কথা বলতে সক্ষম গুজ্জরদের নিজস্ব ভাষাও রয়েছে। তাদের ভাষা ‘গুজরি’ নামে পরিচিত। দক্ষিণ এশিয়ার প্রধানত এই তিন দেশে বসবাসকারী গুজ্জররা হিন্দু, ইসলাম ও শিখ ধর্মের অনুসারী। হিন্দু গুজ্জরদের বেশিরভাগকেই ভারতের রাজস্থান, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাবের সমতলভূমি এবং মহারাষ্ট্রে দেখতে পাওয়া যায়। মুসলিম গুজ্জরদের বেশিরভাগই পাকিস্তানের পাঞ্জাবে দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশই গুজ্জর সম্প্রদায় রয়েছে। তারা প্রধানত পাঞ্জাবের উত্তরাঞ্চলীয় শহর গুজরানওয়ালা, গুজরাট, গুজর খান, জেহলুম এবং লাহোরে অবস্থান করে। এদিকে আফগানিস্তান ও ভারতীয় অঞ্চল হিমালয়ের জম্মু ও কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখন্ডের গাড়ওয়াল ও কুমায়ুন বিভাগে তারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিশেষ করে নুরিস্তান প্রদেশের কিছু কিছু এলাকায় গুজ্জর সম্প্রদায়ের অবস্থান। ভারতে গুজ্জরদের রাজপুত ও অন্য জাতের বিপরীতে প্রধান একটি বর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ দেশের ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে গুজ্জরদের অন্য অনগ্রসর শ্রেণি (ওবিসি) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। তবে এদিকে জম্মু ও কাশ্মীর এবং হিমাচল প্রদেশের কিছু অংশে থাকার জন্য গুজ্জদের তফশিলি উপজাতির মর্যাদা রয়েছে। একসময় হিন্দু গুজ্জররা বেশ কয়েকটি গোত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। দিল্লিতে গুজ্জর উপজাতি বেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তারা দিল্লি ও এর আশপাশের বিশাল এলাকাজুড়ে তাদের ঐতিহ্যবাহী পশুপালন এবং প্রান্তিক চাষাবাদকে একত্র করেছে।
এদিকে হরিয়ানায় গুজ্জর সম্প্রদায় বিবাহ অনুষ্ঠান ও অন্য সব অনুষ্ঠানের জন্য বিস্তৃত নির্দেশিকা নির্ধারণ করেছে। তাদের মহাপঞ্চায়েতে যারা যৌতুক চাইবে তাদের সমাজ থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে গুজ্জর সম্প্রদায়। অন্যদিকে রাজস্থানের ডেমালি, মালাশেরি, আসিন্দ ও যোধপুরিয়ায় বছরে দুবার শ্রী দেবনারায়ণ ভগবানের মেলার আয়োজন করা হয়।
ঐতিহ্যবাহী যাযাবর গুজ্জররা কোনো স্থানে স্থায়ীভাবে বাস করে না। তারা ঋতু ও সময় অনুযায়ী পরিবার নিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়ায়। এক সময় কেবলমাত্র পাহাড়ে পশুপালন করেই জীবিকা নির্বাহ করত এই যাযাবর সম্প্রদায়। তবে কালের ধারায় পশুপালনের পাশাপাশি নিজেদের নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি করে বাজারে বিক্রির মাধ্যমে গুজ্জরদের দিন কাটছে আজকাল। আরু উপত্যকার পাহালগামে গুজ্জর ও বাকেরওয়াল যাযাবর বাস করে। তাদের নানা ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো গুচ্চি মাশরুম দিয়ে গুচ্চি পোলাও, বাটার কালারি, কুদান ও ঐতিহ্যবাহী রুটিও তৈরি করে। যা স্বাদে যেমন অনন্য তেমনি দুষ্প্রাপ্য ও ব্যয়বহুলও।
বাটার কালারি
সাধারণ মাটির একটি ঘরে ৪৫ বছরের জুলাইখা থাকেন। তিনি বশিরের স্ত্রী। আজ জুলাইখা তার পরিবারের জন্য ঐতিহ্যবাহী বাটার ও কালারি তৈরি করবেন। এই খাবার তৈরি করার আগে জুলাইখা ব্রাদেনের গোয়ালঘরে একটি পাত্রে এক সপ্তাহ ধরে দুধ ও সর জমা করেন। এই বাটার কালারি তিনি বাজারেও বিক্রি করে।
জুলাইখা স্টিলের একটি বড় পাত্র হাতে ঘরের এক প্রান্তে থাকা থামের কাছে চলে যান। ওই পাত্রে গত আট দিন ধরে জমা করা দুধ রাখা আছে। এভাবে জমানো দুধ ও সর দিয়ে প্রতি সপ্তাহে তিনি বাটার কালারি তৈরি করেন। এবার তিনি কাঠের তৈরি মাখন বানানো পাত্রটিকে পুরো সরসহ স্টিলের পাত্রে বসান। এর গোড়ায় কুদা ও একটি কাঠের গলবন্ধ লাগিয়ে নেন। সরের পাত্রটিকে দড়ি দিয়ে থামের সঙ্গে বেঁধে নেন জুলাইখা। দড়ির দুই প্রান্তে ভেড়ার পুরনো দুই টুকরো হাড় বেঁধে তিনি জোরে জোরে দুহাতে টানতে থাকলে জমাট বাঁধা সর গলতে থাকে। এভাবে সর থেকে মাখন তৈরি করতে জুলাইখার কমপক্ষে তিন ঘণ্টা সময় লেগে যায়। ভেড়ার ওই হাড় ও কুদা বংশপরম্পরায় রয়েছে।
এর কিছক্ষণ পর জুলাইখা মাখনের পাত্রের তাপমাত্রা পরীক্ষা করে তার ছেলের বউকে চুলা থেকে আগুনে পোড়া জ¦লতে থাকা কাঠের টুকরো ওই পাত্রের নিচে রাখতে বলেন। তার ছেলের বউ চুলায় আগুন ধরান। সময় হলে জুলাইখা দুধের ওপরে জমা মাখন হাত দিয়ে তুলে একটি গামলায় জমা করতে থাকেন। এবার মাখন থেকে বের হওয়া বাকি ঘোল দিয়ে জুলাইখা কালারি তৈরি শুরু করেন।
একটি পাত্রে ওই ঘোল ঢেলে তার সঙ্গে সম্পূর্ণ কাঁচা দুধ মিশিয়ে চুলায় বসিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পরই মিশ্রণটি দই হয়ে শক্ত আটায় রূপ নেয়। এর বিশ মিনিট পর জুলাইখা একটি চামচ দিয়ে ওই দইয়ের আটা কেটে পাত্রে রাখেন। এবার ওই আটাকে ছোট ছোট বলের মতো টুকরো করে প্লেটে রাখেন। দইয়ের বলগুলো দুই হাতের তালুর মধ্যে রেখে চাকতি বানান। ছোট রুটির মতো দেখতে এই চাকতিই বাজারে বিক্রির আগে রোদে শুকানো হয়। পুরোপুরি শুকিয়ে সাদা রুটি বা দুধের রুটির মতো হয়ে উঠলেই তাকে কালারি বলে। কালারির স্বাদ অন্য পনিরের থেকে আলাদা। কখনোই এর নরম ভাব ও সুগন্ধ নষ্ট হয় না।
দুপুরের খাবার হিসেবে যখন কালারি তৈরি করা হয়, তখন তার পদ্ধতি হয় ভিন্ন। সাধারণ এই অঞ্চলের রাস্তার পাশের দোকানগুলোতে জনপ্রিয় এই কালারি বিক্রি হয়। এই ধরনের কালারি তৈরি করতে প্রথমে কালারিকে মরিচ, হলুদ ও লবণ দিয়ে প্রলেপ দিতে হয়। তারপর সরিষার তেলে ভাজতে থাকতে হবে যতক্ষণ না তা মচমচে হয়ে ওঠে। এসময় কালারির গায়ের সোনালি আস্তরণ পড়বে। তবে ভেতরের অংশ নরম ও ক্রিমযুক্ত থাকলেই বুঝতে হবে দুপুরের খাবার কালারি তৈরি হয়ে গেছে। এই কালারি ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। তবে জুলাইখার মতে সমকালের নাস্তা হিসেবে এক কাপ চায়ের সঙ্গে এই কালারি দুর্দান্ত স্বাদ এনে দেয়। এই অঞ্চলের অনেক খাবার দোকানে থাকা রুটি হিসেবে ভাজা এই কালারি ‘কুলচা’ নামে পরিচিত।
জুলাইখা প্রথমে ১০ কেজি গরুর দুধ দিয়ে কালারি বানানো শুরু করেছিলেন। সে সময় তা থেকে বাজারে বিক্রি করার জন্য প্রায় দুই কেজি মাখন ও এক ডজন কালারি তৈরি হয়। সব মিলিয়ে সে সময় জুলাইখা মোটামুটি ৯০০ রুপি আয় করেছিলেন। যদিও এই টাকা খুব বেশি নয়, তারপরও জুলাইখার কাছে তা অনেক। জীবন ধারণের জন্য এই অর্থই তাকে অনেক সহায়তা করে জানিয়ে জুলাইখা বলেন, ‘এই অর্থ আমাকে আমার পরিবার চালাতে সহায়তা করে। কারণ আমি কালারি ও মাখন বিক্রি করে অনেক অর্থ আয় করি। এই অর্থ দিয়েই আমি আমার দৈনন্দিন জীবনের খরচ চালাই।’
গুচ্চি পোলাও
গুজ্জারদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে গুচ্চি পোলাও খুব ব্যয়বহুল ও সুস্বাদু। এই পোলাও সচরাচর তৈরি করা হয় না। জুলাইখাদের পাহালগাম গ্রামের ঢালের সাতটি বাড়ির মধ্যে একটিতে শাহিনা থাকেন। তিনি তার দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দিতে বাবার বাড়ি এসেছেন। তার ২৫ বছর বয়সী বোন মারুফা। সে গুচ্চি পোলাও তৈরি করতে শাহিনাকে সাহায্য করবেন।
শাহিনা প্রথমে গ্রামের চারপাশের পাহাড় থেকে কিছু গুচ্চি মাশরুম (বন্য মোরল) সংগ্রহ করেছেন। শাহিনাদের পরিবার সাধারণত গুচ্চি খায় না। এই সুস্বাদু খাবারের মূল্য জানা নেই তার। তবে শাহিনাদের পরিবার মূলত বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য গুচ্চি পোলাও রান্না করে।
গুচ্চি পোলাও তৈরি করতে নানা ধাপ পার করতে হয়। এই খাবার তৈরি করতে অবশ্যই কিছু ভালো গুচ্চি মাশরুমের প্রয়োজন হয়। শাহিনা প্রথমে দুটি হাঁড়ি নেন। এর একটিতে কিছুক্ষণের জন্য মাশরুম ধুয়ে ভিজিয়ে রেখেছিলেন। অন্য হাঁড়িতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে কিছু চাল ভিজিয়ে রাখা ছিল। এবার শাহিনা একটি মাটির চুলায় ভাত রান্না চড়িয়ে দেন। ভাতের সমস্ত পানি শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত চুলায় জ¦াল দিতে থাকেন। তারপর ভাতটি ঠান্ডা করতে আলাদা পাত্রে ঢেলে নেন। এবার গুচ্চি পোলাও রান্নার জটিল প্রক্রিয়া শুরু করেন।
শাহিনা একটি ধাতুর প্লেটে তার তৈরি করা সমস্ত মসলা সাজিয়ে নেন। এবার এক এক করে তিনি প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে কয়েকটা লবঙ্গ, এলাচ, কালো এলাচ, কিছু দারুচিনি, মরিচ ও লবণ বের করে প্লেটে সাজিয়ে রাখলেন।
তারপর ভিজিয়ে রাখা মোরেল মাশরুমগুলো মাটির চুলায় প্রায় ১৫ মিনিট জ্বাল দিয়ে নামিয়ে নেন। তবে এসময় মাশরুমের সঙ্গের পানি ফেলে দেন তিনি। শাহিনা একটি হাঁড়িতে ঘরে তৈরি করা কয়েক চামচ ঘি ঢেলে দিলেন। ঘি পুরোপরি গলে যাওয়া পর্যন্ত গরম করেন। এরপর ওই হাঁড়িতে পানি শুকানো মাশরুমগুলো ঢেলে দেন। এর সঙ্গে দেন কিছু আস্ত মসলা, লবঙ্গ, সবুজ ও কালো এলাচ। আবার কিছু দারুচিনি ঘিতে ছেড়ে দিয়ে নাড়তে থাকেন। এই পুরো মিশ্রণটি পরবর্তী ১৫ মিনিট সেদ্ধ হতে থাকে। এসময় ঘর থেকে সুগন্ধ বেরোতে শুরু করে।
মিশ্রণটি পুরোপুরি ভাজা হয়ে এলে শাহিনা তা রুপালি একটি সসপ্যানে ঢেলে দেন। এতে চাল দিয়ে আরও ১৫ থেকে ২০ মিনিটের জন্য অল্প আঁচে জ্বাল দিতে থাকেন। তারপরে তিনি সবগুলো উপাদানকে একসঙ্গে মিশিয়ে আরও ১০ থেকে ২০ মিনিটের জন্য চুলার ওপর রেখে দেন। যাতে গুচ্চি মাশরুমগুলো সম্পূর্ণরূপে রান্না করা হয়। এবার চাল সমস্ত সুগন্ধি রস শুষে নিলে শাহিনা তাতে একের পর এক লবণ, মরিচ হলুদ দিয়ে আরও ১০ মিনিট নাড়তে থাকেন। শাহিনা চুলা থেকে গুচ্চি পোলাও নামিয়ে পরিবেশনের জন্য প্লেটে সাজান। এবার তৈরি হয়ে যায় সোনারঙের গুচ্চি পোলাও। পাহালগামের কেবলমাত্র একটি রেস্তোরাঁয় এ পোলাও পাওয়া যায়। এর অবিশ্বাস্য দামের জন্য এই সুস্বাদু পোলাওটি সেখানে দুষ্প্রাপ্য।
কুদন ও রুটি
পাহালগামের গুজ্জরদের পাশাপাশি উপজাতি বাকারওয়ালের বাস। জুলাইখাদের কাছাকাছি এক বাকারওয়াল পরিবার তাঁবু খাটিয়েছে। এই পরিবারের ৬০ বছর বয়সী সদস্য বান বারগাত। পরনে বাকারওয়ালদের ঐতিহ্যবাহী সালোয়ার-কামিজ। মাথায় টুপির মতো ক্যাপ। তার ওপরে শাল জড়ানো। গলায় লম্বা মালায় বড় রুপালি লকেট ঝুলছে। এই বাকারওয়াল উপজাতির ঐতিহ্যবাহী খাবারের নাম কুদন। এর পাশাপাশি তাদের তৈরি বিশেষ এক ধরনের রুটিও আছে। বাকারওয়ালরা তাদের গবাদি পশুর দুধ ও বন্য এলাকা থেকে রান্নার নানা দুষ্পাপ্য উপকরণ সংগ্রহ করে। তারপর সেই উপকরণ দিয়ে কুদন তৈরি করে তারা।
