আবার ফাইনাল ইস্তাম্বুলে। এবারও মুখোমুখি ইংল্যান্ড এবং ইতালির দুই ক্লাব। ২০০৪ সালে লিভারপুল আর এসি মিলানের সেই রোমাঞ্চ ছড়ানো অবিস্মরণীয় ফাইনালে অনেক নাটকীয়তার পর লিভারপুল হারিয়েছিল এসি মিলানকে। এবার মুখোমুখি ম্যানচেস্টার সিটি আর ইন্তার মিলান। এবারও কি বিস্ময়ের জন্ম দেবে ইস্তাম্বুল। কামাল আতাতুর্কের নামের স্টেডিয়াম থেকে মিলান শহরের দল কি আবারও ফিরবে হতাশ হয়ে? এখানেই কি রচিত হবে আধুনিক ফুটবলের নতুন ইতিহাস, ম্যানচেস্টার সিটির।
শক্তিমত্তায় ম্যানসিটি এগিয়ে, তারা খুঁজছে প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা যা জিতলেই পূর্ণ হবে ট্রেবল। অন্যদিকে ইন্তার মিলান লিগে তৃতীয় হলেও এই মৌসুমে টুর্নামেন্টে দারুণ সফল। ইতালিয়ান কাপের শিরোপা তারা জিতেছে নবমবারের মতো। ২০০৯-১০ মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পর আরও ৬ বার ইউরোপের শীর্ষ ক্লাব প্রতিযোগিতায় সুযোগ পেয়েছিল ‘নেরাজ্জুরি’রা, কিন্তু শেষ ষোলোর বেশি যেতে পারেনি কোনো মৌসুমেই। এবার একেবারে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে সিমোনে ইনজাঘির শিষ্যরা। শেষ লড়াইয়ে আসার আগে তারা হারিয়ে এসেছে বার্সেলোনা, পোর্তো, বেনফিকা ও এসি মিলানকে।
অন্যদিকে ম্যানসিটি রীতিমতো অশ্বমেধের ঘোড়ার মতোই অদম্য। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ সিটিজেনরা জিতেছে ৩ ম্যাচ হাতে রেখে। এফএ কাপের ফাইনালে হারিয়েছে নগর প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে। চ্যাম্পিয়নস লিগে গ্রুপ পর্বে ৬ ম্যাচে ৪ জয় আর ২ ড্র নিয়ে তারা পা রেখেছিল নকআউট পর্বে। এরপর তারা একে একে বিদায় করে দিয়েছে লিপজিগ, বায়ার্ন মিউনিখ ও রিয়াল মাদ্রিদের মতো ইউরোপের পরাশক্তিদের। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ও চ্যাম্পিয়নস লিগের সফলতম দল রিয়াল মাদ্রিদকে সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত করে ফাইনালে পা রেখেছে পেপ গার্দিওলার দল। প্রথমবারের মতো ইউরোপসেরা হওয়া থেকে মাত্র ১ ম্যাচ দূরে ম্যানসিটি, মাত্র ১টা জয় ট্রেবলের মাধ্যমে পূর্ণতা দেবে তাদের গোটা মৌসুমের সাফল্যকে।
আর্লিং হালান্ড প্রথমবারের মতো নামবেন চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে। ১২ গোল করে চ্যাম্পিয়নস লিগের এই মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলদাতা হালান্ড, ৩৬ গোল করে প্রিমিয়ার লিগেও সর্বোচ্চ গোলদাতা। এই নরওয়েজিয়ান মুখিয়ে আছে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালের মতো বড় মঞ্চে গোল করতে, ‘ফাইনালে খেলতে পারাটা অবশ্যই আমার কাছে বিশেষ কিছু। আমার সব সময়ের স্বপ্ন ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে খেলা আর এই ম্যাচে খেলাটা আমার জন্য অনেক সম্মানের। তবে আমার একটা কাজও করতে হবে। দারুণ একটা মৌসুম কাটিয়েছি আমরা আর সেটা দারুণভাবে শেষও করতে হবে। আমাদেরকে সবার সেরাটা নিংড়ে দিতে হবে কারণ আমরা ইন্তার মিলানের মতো দারুণ একটা দলের বিপক্ষে খেলতে নামব।
গোলের মানুষ হালান্ড তবে গোল করানোর কাজটা কেভিন ডি ব্রুইনের। এই মৌসুমে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২৮টা গোলের অ্যাসিস্ট এই বেলজিয়ানের, ক্লাবের হয়ে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ। ডি ব্রুইনের চ্যাম্পিয়নস লিগের গোল ১৪টা যার ১১টাই এসেছে নকআউট পর্বে। বড় মঞ্চে জ্বলে ওঠার অভ্যাসটা যদি ডি ব্রুইন ধরে রাখতে পারেন, তাহলে ইস্তাম্বুলেও উঠতে পারে নীল ঢেউ।
লিগে খানিকটা পিছিয়ে থাকলেও নকআউট প্রতিযোগিতায় এই মৌসুমে ইন্টারের সাফল্যের হার বেশি। কোপা ইতালিয়াতে পারমা, আতালান্তা ও জুভেন্তাসকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর ফিওরেন্তিনাকে হারিয়ে কাপ জিতেছে ইন্তার। চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বের ৬টা ম্যাচের ৫টাতেই তাদের জালে কোনো গোল ঢোকেনি। গোল করতে দারুণ পারদর্শী লাউতারো মার্তিনেজ। বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলের এই ফরোয়ার্ডের বিশ্বকাপটা ভালো না কাটলেও ইন্তারের হয়ে মৌসুমটা ভালোই কাটছে। ৪৯ ম্যাচে ২৫ গোল, সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ইন্তারের হয়ে নিজের সেরা সময়টা কাটাচ্ছেন মার্তিনেজ। রোমেলো লুকাকুর সঙ্গে তার জুটিটাও জমে গেছে।
ইনজাঘি যদি ইন্তারকে শিরোপা জেতাতে পারেন, তাহলে তিনিই হবেন ইন্তারকে ইউরোপসেরার শিরোপা জেতানো প্রথম ইতালিয়ান কোচ। এর আগে ইন্তার ইউরোপসেরার মুকুট জিতেছিল হেলেনিও হেরেরা ও হোসে মরিনহোর কোচিংয়ে।
গার্দিওলা তার পজেশন ভিত্তিক ফুটবলই খেলাবেন, সঙ্গে যোগ হয়েছে ক্ষুরধার আক্রমণভাগ। ইকাই গুন্দোয়ান কিছুদিন আগেই এফএ কাপের ফাইনালে করেছেন জোড়া গোল, সঙ্গে হালান্ড, ডি ব্রুইনা মিলিয়ে স্বপ্নের মতো আক্রমণভাগ। ইন্তারের শক্তি তাদের মাঝমাঠ। ৩-৫-২ ছকে ইনজাঘি দল সাজান। মাঝমাঠে হাকান কানাগ্লু, হেনরিক মিখিতারিয়ান আর নিকোলা বারেয়ার সঙ্গে দুই উইংব্যাক ডেনজেল ডামফ্রিস আর ফেদেরিকো দিমার্কো। গোলবারে ক্যামেরুনের গোলরক্ষক আন্দ্রে ওনানা, চ্যাম্পিয়নস লিগে এই মৌসুমে ১২ ম্যাচে ৮ বারই রেখেছেন ক্লিনশিট, সেভ ৪৫টি। গোলের খোঁজে ইন্তারের এই জমাট রক্ষণকেই ভাঙতে হবে ম্যানসিটির ত্রিফলাকে।
১৮ বছর আগেই, ইস্তাম্বুলের এই মাঠেই মিলান ফাইনালে এসেছিল ম্যানইউ, ইন্তার, পিএসভির মতো দলকে হারিয়ে। অন্যদিকে চেলসির বিপক্ষে ভাগ্যপ্রসূত গোলে ফাইনালে উঠেছিল সেবার লিগে ধুঁকতে থাকা লিভারপুল। প্রথমার্ধেই মিলান ৩-০ গোলে লিভারপুলকে বিধ্বস্ত করে যায় মধ্যবিরতিতে। এরপরই ইতিহাস গড়ে ফিরে আসা লিভারপুলের, সমতা ফিরিয়ে টাইব্রেকারে শিরোপা জিতে নেওয়া। এবারও কি এমন কোনো বিস্ময়ই দেখবে ইস্তাম্বুল, তুঙ্গে থাকা ম্যানসিটিকে হারিয়ে ট্রেবল রুখে দেবে ইন্তার? নাকি ম্যানসিটির নীল প্লাবনে ভেসে যাবে ইন্তার?