তারকাদের ঘর সংসার ও মিডিয়ার সালিশ

আপডেট : ১১ জুন ২০২৩, ১২:১৫ এএম

‘পরীমণিকে কাঁদিয়ে ছাড়ল লাইভ প্রেজেন্টার’ সংবাদ শিরোনাম হিসেবে এটি কেমন? আমার ধারণা বেশ ভালো। এই বাক্যের মধ্যে পরীমণিকে দেখা যায় শক্তিমতী নারী হিসেবে, যাকে কাঁদিয়ে ছাড়তে হয় এবং তা করতে পারে দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যম। ‘লাইভে এসে কাঁদলেন পরীমণি’ লিখলে ব্যাপারটা অন্যরকম মনে হতো। না, এমন কোনো সংবাদ শিরোনাম আমার চোখে পড়েনি, তবে পড়তে কতক্ষণ!  

সোশ্যাল মিডিয়া, নিউ মিডিয়া, সিটিজেন জার্নালিজম এই সমস্ত টার্মস এখন আর নতুন নেই। কিন্তু তথ্য, সংবাদ, সংবাদ পরিবেশন, সংবাদের নীতি-নৈতিকতা থেকে শুরু করে অডিয়েন্স পর্যন্ত এই সময়ে নানা রকম চেহারা নিচ্ছে। এর কারণই সম্ভবত মিডিয়ার এই এত রকম ডাইমেনশন আর সে-সবের এত রকম ব্লেন্ডিং।

যা বলছিলাম, চিত্রনায়িকা পরীমণিকে শক্তিমতী নারী হিসেবে পারসিভ করার, দেখার বা দেখানোর কারণ কী? এটা করপোরেট ফেমিনিজমের যুগ এই সময়ে নারীবাদ অত্যন্ত হট টপিক। এমন একটা নারীবাদী ভঙ্গিই দেখা যায় পরীমণির ইমেজে। এমন ইমেজ মিডিয়াই তৈরি করে দিয়েছে যে পরীমণি একটা শক্ত মেয়ে। একের পর এক খবর তৈরি করা মদ্যপান, প্রেম, বিয়ে, বিচ্ছেদ ইত্যাদি সম্পর্কে খোলামেলা অবস্থান, মাতলামি করে জেলখানা থেকে ঘুরে আসা ইত্যাদি তাকে সাহসী মেয়ে হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করে। এই সমাজে নিজের মতো করে বাঁচতে পারার স্বাধীনতা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে কয়জন? মনের মধ্যে এতখানি মুক্তির আকাক্সক্ষা থাকে কয়টা মেয়ের!

কিন্তু সামান্য মাতলামির জন্য ধরে জেলে পুরে দেওয়ার সময় তার পাশে থাকা আর তার বাচ্চার দাঁত ওঠার মতন অযোগ্য সংবাদ প্রকাশ করে তাকে নিয়ে মিডিয়ার এত বড় জায়গা দখল করানোর ক্ষেত্র প্রস্তুত করা  দুটো আলাদা বিষয়। পরীমণি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে হাতে মেহেদী দিয়ে ‘ডোন্ট লাভ মি বিচ’ লিখে মোটামুটি আধুনিক নারীমুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছেন। যাকে বলে হিরোইজম।

মিডিয়ার এই স্টার সিস্টেমের মধ্যে নারী তারকাদের মধ্যে হিরোইজমের এই ডাইমেনশনটা নতুন। ইংরেজিতে হিরোইজম বলুন আর বাংলায় বীরত্ব বলুন, দুটো শব্দই পুরুষবাচক। নারী তারকাদের কখনো সাহস, অ্যারোগেন্স, স্পর্ধা শো অফ করতে হয় না, তাদের শো অফ করতে হয় দুঃখ, সতীত্ব, নম্রতা ইত্যাদি। উদাহরণ দিচ্ছি  এর আগে বাংলার আর এক চলচ্চিত্র অভিনেত্রী অপু বিশ্বাস নিজের এক বছরের ছেলেকে নিয়ে লাইভে এসে কান্নাকাটি করে প্রচুর সহানুভূতি আদায় করেছিলেন।

সেই সময়েই মিডিয়ার এই ভূমিকা নিয়ে খটকা লেগেছিল। লিখেওছিলাম সে কথা। লাইভটা যারা দেখেননি তাদের জন্য একটু বিশদে বলা যেতে পারে। অপু বিশ্বাস বেশ হাসিখুশি মুডেই কথা শুরু করেন। লাইভের ব্রেকের পর তার কোলে দেখা যায় শাকিব খানের ঔরসে জন্মানো অপুর এক বছর বয়সী শিশুপুত্রকে অপু শাকিব খানের বিবাহিত স্ত্রী হওয়ার খবর এবং সন্তান জন্মানোর খবর সামনে এনে সিনেমার সতী নারীর মতন আঁচল পেতে শাকিবকে ফিরে পেতে চান। ফিরে পেতে চাওয়ার কারণ শাকিব ততদিনে বুবলী নামের আর এক নায়িকার সঙ্গে প্রেম করছিলেন। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য বুবলীও কয়েক বছর পর এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন। অপু সতীত্ব, বিবাহিত স্ত্রীর মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মান্তরিত হওয়ার ত্যাগ উল্লেখ করতেও সম্ভবত ভুল করেননি। বুবলীও নির্ভুলভাবে তার জন্মগতভাবে মুসলিম পরিচয়ের গরিমা তুলে ধরেন।

পরীমণি যেহেতু ‘সাহসী মেয়ে’, তিনি এই ধরনের ভিকটিমহুড প্লে করবেন না বলে আশা করা গেলেও দেখা গেল এই চেনা সূত্র ধরেই হাঁটছেন তিনিও। সতী ও ত্যাগী নারীর বহুল প্রচলিত ছকের মধ্যে থেকে পরীমণি, স্বামী রাজের কমফোর্ট নিশ্চিত করতে নানুভাইকে দেশের বাড়ি শিফট করার কথা বলতে বলতে কান্না চাপতে ব্যর্থ হন। মোট কথা নারীকে ত্যাগ করতে হবে, যে যত কম্প্রোমাইজ করতে পারবে, যে যত স্যাক্রিফাইস করতে পারবে সে নারী ঘর সংসারের জন্য তত যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে, স্ত্রী হিসেবে স্টার মার্ক বা এ প্লাস। এমন এ প্লাস বউ ফেলে বাইরে চিল করতে যাওয়া স্বামীকেও নিশ্চয়ই সমাজ ছেড়ে কথা বলবে না, যতই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হোক না কেন! কেননা সতীত্বের বা ত্যাগের যে মহিমার কথা বললাম তা পুরুষতান্ত্রিক ফ্রেমওয়ার্কের সেট করা স্ট্যান্ডার্ডকেই ফুলফিল করে।   

করপোরেট মিডিয়ার যুগে এই সব কনটেন্ট যথেষ্ট এন্টারটেইনিং হলেও মূলত আগাছার মতনই। বা বলা যেতে পারে জাংকফুডের মতন। জাংকফুড দিয়ে পেট ভরে রাখলে শিশুরা স্টেপল ফুড আর খেতে পারে না, দেখতে স্বাস্থ্যবান লাগলেও শিশুদের শরীরে থেকে যায় অপুষ্টি। তেমনই এই সব জাংক খবর দিয়ে সøট ভরে রাখলে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের জন্য সময়ের এবং/অথবা স্থানের টানাটানি হয়। ডিজিটাল মাধ্যমে স্থানের স্বল্পতার কথা বাদ দিলেও সময়ের বিষয়টি থেকেই যায়।

কিন্তু মিডিয়াগুলো কি সে কথা ভাবছে? গণমাধ্যম যে কেবল তথ্য সংগ্রহ করে সত্য পরিবেশন করে তা তো নয়। বরং জনমানুষের চিন্তাচেতনাও শেপ করে মিডিয়াই। ফ্যাক্ট চেকিং জাতীয় শব্দের উদ্ভব নতুন না হলেও সেদিনের কথা। একটা সময় ছিল যখন মানুষ পত্রিকার পৃষ্ঠায় ছাপা প্রত্যেকটা শব্দ চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করত। বর্তমানে পরিস্থিতি তেমন না থাকলেও মিডিয়া মানুষের জীবনকে প্রবলভাবেই প্রভাবিত করতে পারে। গণমাধ্যম কি এখন এই ক্ষমতার অপব্যবহার করছে না!

লাইভের প্রেজেন্টার এক পর্যায়ে পরীমণিকে প্রস্তাব করেন যে তিনি চাইলে অনুষ্ঠানের পক্ষ থেকে অ্যারেঞ্জ করা যেতে পারে একটা লাইভ যেখানে এই দুজন সামনা-সামনি কথা বলতে পারবেন।  অপু বিশ্বাসের লাইভের ব্রেকের পর শিশুপুত্রকে দেখে যে বিবমিষা আমার হয়েছিল, প্রায় একই রকম বিবমিষা বোধ হলো এই কথাটি শুনে। মিডিয়ার যা সব কাজ আমরা জানি, তার মধ্যে তথ্য ও সংবাদের মতন বিনোদন দেওয়া একটা অন্যতম প্রধান কাজ হলেও, কারও সংসারে অশান্তি হলে সালিশ করা সম্ভবত পড়ে না। তবে কেউ বলতে পারে, এটা বিনোদনের মধ্যেই পড়ে। সত্য বটে, বাঙালি আজও রাস্তায় ঝগড়া দেখলে দাঁড়িয়ে যায়। বড় বড় তারকাদের সেক্সুয়াল জেলাসি ও দাম্পত্য কলহ মেটানোর বিচার সালিশে মোড়ল হিসেবে আবির্ভূত হয়ে টিআরপি কামিয়ে নেওয়ার সুযোগ মিডিয়াগুলোই বা ছাড়বে কেন?

লেখক : সাহিত্যিক ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত