সমঝোতার সুযোগ এখনো

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২৩, ১১:২০ এএম

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলেও সমঝোতার সুযোগ এখনো আছে বলে মনে করেছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, অতীতেও তফসিল ঘোষণার পর এ ধরনের সমঝোতার নজির আছে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদেরও একই অভিমত। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক সমঝোতা হলে নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে, তফসিল পুনরায় দেওয়া যেতে পারে।

গতকাল বুধবার যখন তফসিল ঘোষণা করা হয় তখনো নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর ধারাবাহিক সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি চলছিল। বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলো জানিয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর তারা আরও কঠোর কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবে।

অন্যদিকে সংবিধান মেনে নির্বাচন করতে অনড় শাসক দল আওয়ামী লীগ।

বিশ্লেষকদের মতে, তফসিল ঘোষণা হলেই নির্বাচন হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি চাপ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই বলে মনে করছেন তারা। এ ক্ষেত্রে তারা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, ২০০৬ সালের শেষের দিকে জাতীয় নির্বাচনের তফসিলও বাতিল হয়েছে। ওই তফসিল অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। সে সময় আজকের আওয়ামী লীগের মতো অনড় অবস্থানে ছিল বিএনপি। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে রাজপথে ছিল আওয়ামী লীগ। সে সময় বিএনপি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেছিল। আওয়ামী লীগ ও তার শরিকরা শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়। ফলে দেশি ও আন্তর্জাতিক চাপে ওই নির্বাচন বাতিল হয়ে যায়। এরপর ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। পরের বছর শেষের দিকে ওই সরকার নির্বাচন আয়োজন করে। এক-এগার সরকার হিসেবে পরিচিত সেই সময়কার তত্ত্বাবধায়ক সরকার নানা ঘটনা ও দেন দরবারের পর ২০০৮ সালের ১৫ জুলাই তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেন। সেখানে বলা হয়, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ডিসেম্বর মাসে। শুরুতে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিতে চায়নি। কিন্তু ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে বিএনপি নিশ্চিত করে যে তারা নির্বাচনে অংশ নেবে। সে সময় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৮ ডিসেম্বর কিন্তু খালেদা জিয়ার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন ১১ দিন পিছিয়ে ২৯ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়। নির্বাচন পিছানো নিয়ে আওয়ামী লীগের তরফ থেকে তীব্র আপত্তি তোলা হলেও শেষ পর্যন্ত তারা সেটি মেনে নিয়েছিল।

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা (জানিপপ)-এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, তফসিল ঘোষণাই নির্বাচন হয়ে যাওয়ার কোনো গ্যারান্টি নয়। তফসিল ঘোষণার পর প্রকাশ্য সমঝোতার সুযোগ কিছুটা কমে আসল। কিন্ত অপ্রকাশ্য সমঝোতার সুযোগ কিন্তু শেষ সময় পর্যন্ত থাকবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মনোনয়ন দাখিলের সময় পর্যন্ত সমঝোতা সম্ভব। একটা সমঝোতা হলে নির্বাচনের তারিখও পরিবর্তন হতে পারে।’

তিনি বলেন, এখন রাজনৈতিক যে অচলাবস্থা চলছে এভাবে যদি বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ সরকার বিরোধী আন্দোলনে থাকা প্রতিটি দল তাদের অবস্থানে অনড় থাকে তখন এই নির্বাচন নিয়ম রক্ষার নির্বাচনে পরিণত হবে যেমনটা হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন।

অধ্যাপক কলিমউল্লাহ বলেন, ‘যেহেতু আমাদের নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের চাপ আছে সুতরাং সরকার চাইলেও ১৪ বা ১৮-এর মতো আরেকটা নির্বাচন করা কঠিন হবে।’

দেশের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘শেষ মুহূর্তে দলগুলো আলোচনার ক্ষেত্রে কিছুটা উদার হয় যা আমাদের আশাবাদী করে। নব্বইয়ের দশক থেকে আমরা দেখেছি নির্বাচন নিয়ে সংকটে আন্তর্জাতিক মহল আলোচনার আয়োজনে একটা ভূমিকা রাখে। সেই হিসেবে আলোচনার বড় একটা সম্ভাবনা রয়েছে বলে আমি মনে করি।’

বর্তমান সংসদের মেয়াদ ২০২৪ সালের ২৯ জানুয়ারি শেষ হচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী, বর্তমান সংসদের মেয়াদ পূর্তির ৯০ দিন আগে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। কিন্তু এই ৯০ দিনের মধ্যে কবে নির্বাচনের তারিখ সেটি ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশন চাইলে তফসিল ঘোষণার পরও নির্বাচনের তারিখ বদলাতে পারে। কিন্ত তা মেয়াদ শেষ হয়ার ৯০ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ২৯ জানুয়ারির মধ্যে হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তফসিল সংশোধন করে দেওয়া যায়।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভা-ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেখুন, সংবিধান মেনে যেকোনো পরিবর্তন হতে পারে। যেহেতু সংবিধানে ২৯ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাই যেকোনো রাজনৈতিক সমঝোতা হলে নির্বাচন আয়োজন কিছুদিন পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে বিএনপিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি বাদ দিয়ে শর্তহীনভাবে আলোচনায় বসতে হবে।’

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দল কিন্তু বারবার বলছে শর্তহীন আলোচনা হতে হবে। যা ডোনাল্ড লুর চিঠিতেও বলা আছে। এখন বিএনপিকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জাতীয় পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘রাজনৈতিক সমঝোতা হলে নির্বাচন কমিশন তার ঘোষিত তফসিল পরিবর্তন করতে পারে। প্রতীক বরাদ্দ, মনোনয়ন জমা এমনকি মনোনয়ন প্রত্যাহারের দিন পর্যন্ত সমঝোতা সম্ভব। আলোচনার পথ এখনো শেষ হয়ে যায়নি।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘আমি তো মনে করি, তফসিল ঘোষণার পরও আলোচনার খুব ভালো সুযোগ রয়েছে। যেহেতু দেশের মানুষ একটা সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন চায় তাই তফসিলের পর আলোচনার একটা সুযোগ রয়েছে মতবিরোধ দূর করা এখনো সম্ভব।’ তবে সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল যদি শর্ত দেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে আলোচনার পথে বিঘ্ন হবে বলে তিনি মনে করেন।

গত শুক্রবার জার্মানভিত্তিক চ্যানেল ডি ডব্লিউর এক টকশোতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, বিএনপির কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাইরেও একটা প্রস্তাব আছে। সরকার চাইলে বিএনপি এই প্রস্তাব দিতে পারে।

মাহবুব উদ্দিন খোকনের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, ‘এটা খুব ইতিবাচক দিক। আমরা যখন সংলাপে যাব তখন ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দরকার। আমার কাছে মনে হয় সরকারও কিছুটা উদারতা দেখাবে।’

বিএনপির সঙ্গে থেকে যুগপৎ আন্দোলন করছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘আমরা মনে করি, আলোচনার সুযোগ সবসময়ই আছে। কিন্তু সরকার যে বলছে সংবিধানের অধীনে নির্বাচন আয়োজন, এরকম শর্ত দিয়ে কোনো আলোচনা হবে না। আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত করতে চাইলে নিরপেক্ষ সরকারের দাবিকে সরকার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’

আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য অসীম কুমার উকিল বলেন, ‘আমি এখনো বিশ্বাস করি তফসিল ঘোষণার পর ও বিএনপিসহ সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে। শেষ পর্যন্ত সবাই নির্বাচনে আসবে। আলোচনার টেবিল বন্ধ হয়ে গেছে এমনটা মনে হয় না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত