পরিচিতজন, সহকর্মী, বন্ধু কিংবা নিকটাত্মীয়ের ব্যাংক বা অন্য কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের গ্যারান্টার (জামিনদার) হয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন অনেকেই। ঋণ খেলাপি হলে গ্যারান্টরের ওপরও ঋণ পরিশোধের জন্য দায় বর্তায়। সেজন্য ঋণ না নেওয়া সত্ত্বেও গ্যারান্টররাও ঋণখেলাপি হন। ঋণ খেলাপি হলে সেটি আদায়ের জন্য কেবল ঋণগ্রহীতা নয়, গ্যারান্টরের বিরুদ্ধেও মামলা করার বিধান রয়েছে।
সাধারণত ঋণগ্রহীতা পরপর তিনটি কিস্তি দিতে না পারলে প্রথমে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিভাগগুলো পদক্ষেপ নেয়। সেখানে ঋণের অর্থ উদ্ধার না করা গেলে শুরু হয় আইনি প্রক্রিয়া। সেক্ষেত্রে প্রথমে ঋণ গ্রহীতা ও জামিনদারের বিরুদ্ধে চেকের মামলা করা হয় এবং পরে অর্থঋণ মামলা করা হয়। এসব মামলায় জামিনদারের কারাদণ্ডও হতে পারে।
খেলাপি ঋণ আদায় করতে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়ের করা হাজার হাজার মামলা রয়েছে। এসব মামলায় প্রায় অর্ধলক্ষাধিক বিবাদী রয়েছেন যারা ঋণের গ্যারান্টার হয়েছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যারান্টররা আর মূল ঋণগ্রহীতাদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে গা বাঁচাতে পারবেন না। মূল ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে আদালতের স্থগিতাদেশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সুদসহ পুরো ঋণ শোধের দায়ও এড়াতে পারবে না তারা।
ব্যক্তিগত ঋণে যেহেতু ব্যাংকে কিছু গচ্ছিত রাখা হয় না, ফলে অর্থ আদায় না হলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে দুজনের বিরুদ্ধে মামলা করবে। সেক্ষেত্রে আদালত থেকে ব্যাংক রায় পেয়ে গেলে একই আইন অনুযায়ী প্রথমে ঋণ গ্রহীতার থেকে অর্থ নেবে, তার থেকে না পেলে জামিনদারের থেকে বাকি অর্থ উদ্ধার করবে।
আর মূল ঋণ গ্রহীতার কাছে অর্থ নেই বলেই যেহেতু সে সেই অর্থ ফেরত দিতে পারেনি, তাই এর বড় দায়ভার চলে যায় জামিনদারের কাঁধে। কোনো ঋণগ্রহীতা ঋণ শোধে ব্যর্থ হলে তার গ্যারান্টরের সম্পত্তি নিলামে তোলার পথ পরিষ্কার হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এক ঐতিহাসিক রায়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে একটি আপিল নিষ্পত্তি করে আদালত রায় দেন যে গ্যারান্টররা রিট দায়ের করে নিলাম কার্যক্রম বন্ধ করতে পারবে না। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, অর্থ ঋণ আদালত আইন-২০০৩ অনুযায়ী কোনো গ্যারান্টরের সম্পত্তি নিলামে তুলে ব্যাংকের পাওনা সমন্বয় করতে কোনো বাধা নেই।
মামলা-মোকদ্দমার বাইরেও ঋণের গ্যারান্টার হয়ে নানাবিধ বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়। মাঝেমধ্যেই আর্থিক প্রতিষ্ঠান গ্যারান্টারের কাছে ধরনা দেয়। সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করলে ওই গ্যারান্টার পরবর্তীতে ঋণের আবেদন করলে সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিআইবি রিপোর্টে আটকে দেয়।
সে কারণে ঋণের জামিনদার হওয়ার আগে বেশকিছু বিষয় সম্পর্কে স্পষ্টভাবে জেনে নিতে হবে। সেগুলো হলো—
জামিনদার হওয়ার ক্ষেত্রে আগে কেবল স্বাক্ষর প্রয়োজন হলেও এ বছর আগস্টে জামিনদারের বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ নেওয়া বাধ্যতামূলক করে সার্কুলার জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ ছাড়াও ঋণ দেওয়ার সময় জামিনদার হবার আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে জামিনদারকে জানানোর দায়িত্ব ব্যাংকারদের।
সবশেষ এই সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বেশ কিছু পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেগুলো হলো—
১। ঋণ নেওয়ার কারণ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জামিনদারকে জানতে হবে। একইসঙ্গে নেওয়া ঋণগ্রহীতা ফেরত দিতে পারবে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন ।
২। জামিনদার হওয়ার আগে ঋণ সংক্রান্ত চুক্তির শর্ত ভালো করে জানা ও বোঝা উচিত। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া যেতে পারে।
৩। সাদা কাগজে সই করা থেকে বিরত থাকা।
৪। ঋণগ্রহীতা যদি ঋণ পরিশোধ করতে না পারে তবে তার সঙ্গে জামিনদারও খেলাপি হবেন এবং তার সিআইবি রিপোর্টে প্রভাব পড়বে।
৫। ঋণগ্রহীতা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে জামিনদাতা তা পরিশোধে বাধ্য হবে। সেক্ষেত্রে ওই পরিমাণ অর্থ দেওয়ার সামর্থ্য আছে কি না তা ভেবে দেখা।
এ ছাড়া জামিনদার হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে লিখিতভাবে সম্ভাব্য দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে জেনে নেওয়াও প্রয়োজন।
