যাও প্রেম, তুমি পক্ষী হয়ে উড়ে যাও। এই পরানের গহনে তব্দা দিয়ে বসে না থেকে, এইবার এট্টু উড়াল দেও। পক্ষ মেলো হে প্রেম। তার দিকে যাও। গিয়ে তারে বলো, এই মাঘ মাসে ঢাকা শহরের হাতিরঝিলের পলাশবাগিচায় বিষম বিস্তর পলাশ ফুটেছে। দূরের সাগাইয়ার ক্ষেতিখোলার আলে আলে এবড়ে-জেবড়ে দাঁড়ায়ে থাকা শিমুলের ডালে ডালে শিমুলও ফুটে আছে ঢের। আর, আমের বোলে বোলে ভ্রমরের গুণগুণানীরও কোনো বিরাম-বিশ্রাম নেই। এমন পুষ্প-উথলানোর কালও কি তার মনে পড়বে না আমাকে?
যাও প্রেম, তার খোঁজে যাও! বলো তারে, আমি অপেক্ষায়। চিরকাল ধরে অপেক্ষায়। কোথায় সে উধাও হয়ে আছে? আমাকে কি তার মনে পড়ে না? নাকি বরাবরের মতোই সে এখনো অন্যমনা, অন্যবিহারী! আমি তার চরাচরের কোথাও নেই এখনো? আমি তার হৃদস্পন্দনে, রক্তের চাঞ্চল্যে, অপেক্ষার নিথরতার ছিলাম না তো কোনো দিন! এখনো নেই, তাই না?
তাকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম, জানো, সেই প্রথম দেখার ক্ষণেই আমাকে কানাঅলায় ধরেছিল! সেই কথা তাকে কোনো দিন জানাবার ফুরসত তো হলো না!
হে প্রেম, হে চির শুচিস্মিত অগ্নি! তুমি যখন তার সন্ধান পাবে, তখন আমার এই কানাঅলায় ধরার বৃত্তান্তটাও বিশদ রকমে তাকে জানান্তি দিয়ো। বোলো, সেই কানাঅলায় ধরার প্রহরটা থেকেই, আমার রক্তে ঝনাৎকার দিয়ে উঠছে তার প্রণয় লাভের সাধ! সেই থেকে এই এখন পর্যন্ত দেখো মিহি ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মতো, নিরল একাকিনী অশ্রুধারার মতো বাসনা বা বাঞ্ছা, ঝরেই চলছে নিরন্তর। তারই জন্য। কীভাবে কানাঅলায় ধরেছিল আমাকে? বলি তবে সেটা, এক্ষণ।
দুই.
সর্বলোকেই জানে যে, কানাঅলায় থাকে সুমসুমা নির্জন রাস্তায়। তার পছন্দ কালো-আন্ধার মেঘমোড়ানো ঠান্ডা পথ! সেই পথ ধরে একা-একলা চলতে থাকা কোনো মনিষ্যিরে যদি কানাঅলায় পেয়ে যায়, তখন সে সেই মানুষটারে সাপটে ধরে ফেলে! তারপর কানাঅলায় তারে কোত্থেকে যে কই নিয়ে যেতে থাকে, সেই বিবরণ কেউই সঠিক রকমে দিতে পারে নাই কেউ কোনো দিন। কানাঅলায়-ধরা মানুষে যে কী দেখতে কী দেখে, সেটা কী সেই মানুষে বোঝে? বোঝে না! সে তখন কেবল হাঁটে হাঁটে হাঁটে! পথ ফালায়ে আপথে আপথে, আঘাটায় আঘাটায় গোত্তা খেতে থাকে!
শোনো প্রেম! আমাকে যখন সেই কানাঅলায় পায়, আমি কিন্তু তখন কোনো কালো মেঘে ঢাকা, বিজন রাস্তায় ছিলাম না! ছিলাম কলেজে!
কলেজের তেতলায় বাংলা বিভাগ! দ্বাদশ মানবিকে অল্প কয়জন স্টুডেন্ট মাত্র উচ্চতর বাংলা বিষয়টা পড়ছে! তাই তাদের জন্য বড়ো ক্লাসরুমের দরকার কী! বিভাগের সেমিনারেই ক্লাস নেওয়ার বন্দোবস্ত করা আছে!
সেই ক্লাস শেষ করে, সেইদিন তখন, মাত্র পা দিয়েছি করিডোরে!
করিডোরে রোদ রোদ! আর হাওয়া! আর অনার্সের ভাইয়া-আপারা!
এতসব সিনিয়ারের ভিড় ঠেলে সিঁড়ির কাছে পৌঁছুনো! কঠিন না? অনেক কঠিন! আর, কেন যে তাদের পাশ দিয়ে যেতে কুণ্ঠা হতে থাকে!
সেইদিন তখন, সেই কুণ্ঠা-শীতল মুখখানা কোনোমতে মাটির দিকে নোয়ায়ে রেখে আমার পা সিঁড়ির দিকে ছুটছে। কোন সিঁড়ি দিয়ে নামলে পরের ক্লাসটার কাছে জলদি পৌঁছুনো যাবে, সেই ভাবনায় তখন উচাটন আমার চোখ।
তখন সিঁড়ি ধরে হুড়মুড় নামতে থাকাটাতেই আমার সমস্তটা মন পড়ে আছে! জোর ছুট দিয়ে না নামলে যে দেরি হয়ে যাবে! তাই সিঁড়ি বেয়ে কে উঠে আসছে বা আমার পেছনে কে নামছে, এসব কে খেয়াল করে!
নামতে নামতে আচমকা সেইদিন, থড়াক করে কিছু একটার সাথে ঝাপটা খাই! লম্বাসম্বা কিছু একটা! তারপর সেই জিনিসটাকে নিয়ে আমি আরও কয়েক সিঁড়ি নিচে নেমে যাই। মাথায় বেদম একটা ধাক্কা লাগে! মাথা জ¦লতে থাকে! আমার চশমটা বেঁকেচুরে গিয়ে আমার মুখে খামচি দিতে থাকে।
তার মধ্যেও টের পাই, যে জিনিসটার সাথে ধাক্কা খেয়ে আমি নিচে হাবলে পড়ে যাচ্ছিলাম, সেটাই যেন শক্ত হাতে আমাকে আগলে নিয়েছে। সিঁড়ির দেয়াল ঘেঁষে আমাকে দাঁড়ও করিয়ে দিয়েছে! তারপর যেন আমার চশমাটাও আলগোছে ঠিক করে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে! জিনিসটা কী রে বাবা? কেমনে ধাক্কা খায় আমার সাথে? কেমন বেয়াক্কেলে এইটা!
বিষয়টা পরিষ্কার রকমে বোঝার জন্য চশমাটা ঠিকমতো পরার তাগাদা পেতে থাকি আমি! চশমা ছাড়া দিন-দুনিয়ার কিছুই যে সাফসাফা দেখি না! ধাক্কার চোটে বেঁকে-যাওয়া চশমার ঘোলাটে কাচে-ঢাকা আমার চোখ তখন, সামনে ছড়িয়ে দেয় নিজেদের!
কে?
কে!
আশ্চর্য! ঠিক সেই সময়টাতেই কিনা আমাকে কানাঅলায় ধরে! একদম সাপটে ধরে নেয় তক্ষণ তক্ষণ আমারে, কানাঅলায়! ঘোর আন্ধার দেখতে থাকি আমি দুনিয়ার সবদিকে! আমার সামনে কোনো সিঁড়ি থাকে না। পেছনে কোনো সিঁড়ি নেই! যেন আমিও আর দুনিয়ার কোনোখানে নেই!
শুধু মনে মনে দেখতে থাকি, ওই কোন দূরে জানি কী একটা দেখা যায়! ফুলস্লিভ বটল গ্রিন শার্টপরা একটা দীঘল শরীর যেন দেখা যায়! ওটা মানুষের দেহ, না একহারা এক ছাতিম গাছ? ছাতিম গাছ? কী জানি! কিচ্ছু স্পষ্ট হয় না আমার সামনে।
আব্বার খুব প্রিয় এই গাছ! খুব প্রিয়। তাই আমরা সবকয়টা ভাইবোন এই গাছেরে চিনি। নভেম্বরে ছাতিম গাছ সবজে-সাদা ফুলে ফুলে একাকার হয়! আব্বার সাথে হাঁটতে হাঁটতে কতবার নভেম্বরের শান্ত-শীতল সন্ধ্যার বাতাসে ছাতিম ফুলের গন্ধ ভাসতে দেখেছি আমরা!
এখন তো নভেম্বর মাস না! তাও যে আমি ছাতিম ফুলের গন্ধ পাই! কলেজের এই সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে এমন মধুর-কড়া সুবাস কেমনে পাই! কোথাও কিচ্ছু দেখতে পাই না! তবু গন্ধ পাওয়া যায় এমন!
কানাঅলায় ধরলে এমুনই হয়? এমুন বেতালা লাগে? চক্ষে কিচ্ছু দেহা যায় না, খালি সুগন্ধখান শইল্লে আইয়া লাগে! ওমা! আরও কিছু য্যান হইতাছে আমার অন্তরের ভিতরে! কেমুন একটা ছোবল লাগতাছে য্যান আমার ভিতরে! কেমন একটা সুখমোড়ানো ছোবল!
এতরকম উল্টাপাল্টা লাগালাগি চলতে থাকলে একটা মানুষ কেমনে কী করে! আমি কেমনে সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাবো! এতখানি সিঁড়ি!
‘এই ইন্টারমিডিয়েটের মেয়েগুলা এত্তো বেহায়া! ইচ্ছা করে গায়ে ঢলে পড়ে!’ টলতে টলতে নামতে নামতে এই কথা শুনতে পাই আমি! একটা মেয়ের গলাই তো এটা, না?
কে? কে বলছে এমন করে এমন বিচ্ছিরি কথা? ফুলস্লিভ বটলগ্রিন শার্টের ছাতিম গাছের সাথে কেউ আছে বুঝি? আছে নিশ্চয়ই!
‘কী বলো এসব তুমি, বহ্নিশিখা? বাচ্চাটা এমন চোট পেয়েছে! চশমাটা ভেঙেছে দেখেছো? ও বাড়ি যাবে কেমনে!’ ছাতিম গাছ কথাও বলে নাকি! ওরে বাবা! কোনো দিন জানতাম না তো!
দেখো তো! কানাঅলায় ধরলে তবে কানেও শোনা যায়? জানতাম না তো! ওহ!
তিন.
শোনো প্রেম! জানো, সেই ছোবলটা পাবার পরে কী ঘটেছিল?
ছোবলটা পাবার পরে কিছুর মধ্যে কিছু না আমার চোখের সামনে, আকাশে দুইটা রঙধনু উঠেছিল! দুই-দুইটা রঙধনু! একসাথে আমার আকাশে!
অন্য সময় না রঙধনু আকাশের যে কোনো এক কিনারে চুপচাপ পড়ে থাকে? অথচ আমার চোখের সামনে আচমকা দেখা দেওয়া রঙধন দুটো কী অদ্ভুত! একটা কিনা ধীরে ধীরে নিচু হয়ে আসতে থাকে! আসতে থাকে আমার দিকে।
একা একা আমার উতলা-উতলা লাগতে থাকে! রঙধনু নিচে নামে ক্যান! কেনো!
দেখো! সেই রঙধনু কিনা নামতে নামতে শেষে এসে লেপটে পড়ছে মাটিতে! ধীরে ধীরে বিছিয়ে পড়ছে আমার সামনে! ক্রমে সে হয়ে গেছে একটা পথ! সোজা সটান একটা রঙধনু-বিছানো পথ! আমার জন্য!
অন্য রঙধনুটাও আস্তে আস্তে নিচুতে নেমে আসে! তারপর বাতাসে ভাসতে ভাসতে বলে, ‘আমাকে ছোঁও!’
আমি ছুঁতেই সে পলকে পলকে রূপ বদলাতে থাকে! অই তো সে নীল রাজহংস, নাকি সে কমলা পলাশের বন! নাকি বৃষ্টির তোড়!
তারপর তারা দুজনেই হয়ে যায় সুনসান এক পথ!
সেই পথে পথে কবিতা পড়ে পড়ে এক মেয়ে একা একা হাঁটে! সেই মেয়ে রোজ সকালে তারপর কতদিন প্রাতঃরাশে বসে। তখন সে শুধু চিবোয়, খাবার চিবোয়; সেই খাবার গিলে ফেলতে তার ভুল হতে থাকে! সে ইতিহাস মুখস্থ করতে থাকে, মুখস্থ করতে থাকে, কিন্তু পড়াটা মনে থাকে না আর তার!
তার ভীরু পায়েরা কলেজের তেতলায় ওঠার পথ আর খুঁজে পায় না! অথচ সেই পথের খোঁজ পাবার জন্য পুরোটা দিন ভরে সে কলেজের পায়ে-হাঁটা পথে পথে ঘোরে। ক্লাস ফেলে রেখে রেখে ইতিবিতি ঘোরে! সবুজ ঘাসে ঘাসে কত কত ঘাসফুল! তারা কি কোনো ছাতিম গাছের খোঁজ জানে? দেখেছে আজকে তাকে?
কেমন দেখতে লেগেছে আজকে তাকে? পাশে তার স্বপ্নকন্যাটি আছে তো? বহ্নিশিখা? তারপর আর কোনো মেয়ের কথা কি মনে করার ফুরসত হয় তার? সে কী জানে, কেউ একজন তাকে খুব খুব খোঁজে? জানে না, জানে না!
পথে পথে হাঁটা ছাড়া আর কী করতে পারে মেয়েটা! হাঁটা পথে তার আগে আগে রোজ উড়তে থাকে একটা শালিখ পাখি! সেই একা একলা শালিখের দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কী দেখার আছে তার! কিছু নেই কিছু নেই!
চার.
সেই এক পথ ছিল! বৃষ্টির ঢলে ভেসে যাওয়া পথ! নাম তার সতেরো বছর বয়স!
এক পথ ছিল, সকালভরে কাঠগোলাপ ঝরে পড়ার পথ! সাদায়-হলুদে মেশানো সেই পথে সবুজ পাহাড়! পাহাড়ের ঢালে ঢালে লজ্জার মতো সবজে ঘাসফুল! ঘাসের গভীরে থাকা ঘাসফড়িংয়েরা আচমকাই উড়াল দেয় কোনো কোনো দিন! উড়াল দিয়ে মেয়েটার মুখে অথবা চুলে এসে বসে পড়ে! মেয়েটি ভয় পায়! ভয় পেয়ে পেয়ে নিজের হাতেই ঘাসফড়িংটাকে সরায় সে। আর তখন হৃদয়ে কেমন ব্যথার মোচড় পেতে থাকে!
কানাঅলা-ধরা মেয়েটার জন্য অইই থাকে শুধু! তার জন্য থাকে শুধু পথ!
পরিশিষ্ট
শোনো প্রেম, তারে বোলো; সেই পথ ধরে এই যে আমি তারদিকে হেঁটেই চলেছি! কিন্তু তার কাছে কী পৌঁছুনো হলো! এমনই ভাগ্য যে, সমস্তটা জীবন কেটে গেল পথে পথে পথে! আর কবে করমচা ফুলের ছায়ায় ঢাকা চৈত্র-বিকেলের সাথে দেখা হওয়া! কবে! বোলো তারে, এইবার সে তবে আসুক আমার জন্য!
