সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে বেশি পরিচিত, এ রকম অনেকে দ্বাদশ নির্বাচনে আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ হয়ে ‘ইন্ডিয়া আউট’ নামে একটি প্রচারাভিযান শুরু করে। ভারতের পণ্য বয়কটের আন্দোলন বাস্তবসম্মত নয়। প্রশ্নটি আদতে রাজনৈতিক। আবার অনেকের মতে, অর্থনৈতিক কারণেও এটি সম্ভব নয়, কারণ আমাদের বাণিজ্যিক নির্ভরতা অনেক বেশি। খাদ্যশস্য থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি হেন কিছু নেই, যা ভারত থেকে আনা হয় না। এসব কথায় লজিক আছে।
দুই
ভারতের সরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে ভারত ভ্রমণকারী বিদেশিদের শীর্ষে আছে বাংলাদেশি। এ ছাড়া ভারতের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সরকারি হিসাবে ২০০৮ সালে বাংলাদেশের আমদানি ছিল ২০০ কোটি ডলার, যা এখন দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার এবং বাংলাদেশ এখন ভারতের চতুর্থ শীর্ষ রপ্তানিবাজার। আবার সরকারিভাবে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি তেল ও তরলীকৃত গ্যাস আমদানি প্রায় শূন্য থেকে শত কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর বাইরে আছে সীমান্ত হাট যার বাণিজ্যিক মূল্য অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো জয়শ্রী সেনগুপ্তের হিসাবে, আনুমানিক শত কোটি ডলার।
তা ছাড়া নিত্যপণ্য ও খাবারের চাল, গম এবং পেঁয়াজ আমদানি ঘাটতি হলে বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার সময় আমরা ভারতের সহযোগিতা চাই। পোশাকশিল্পের সুতা, ওষুধশিল্পের অনেক কাঁচামাল আসে ভারত থেকে। এই সামগ্রীগুলো যদি ইউরোপ, আমেরিকা থেকে আসে তাহলে, কাপড় ও ওষুধ কিনতে হবে ১০ গুণ বেশি দামে। যারা আজ ভারত বর্জন করতে বলছেন, তারা কখনো এসব পণ্য বর্জন করে দেশ চালাতে বা জনগণের প্রয়োজন মেটাতে পারবেন?
তিন
১৯৪৭ সালে ধর্ম দিয়ে ভাগ করে সাধারণ মানুষকে শোষণ করার কৌশল বহু পুরনো কৌশল। এই কৌশলে ব্রিটিশরা মানুষ হওয়ার আগে ভারতবাসীকে হিন্দু, অথচ মুসলমান হিসেবে দেখিয়েছিল। তাদের কলোনিতে ফেলে আমাদের মাঝে একে অপরকে ঘৃণা করার বিষবাষ্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে খানিকটা মগজে ঢুকিয়েছিল। প্রায় শতাব্দীর পথভ্রমণে আমরা এর থেকে বের হতে পারিনি। আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলন কর্মকাণ্ডে আরও বেশি মনোনিবেশ করা প্রয়োজন।
ধর্মান্ধতায় বাংলাদেশ, ভারত, আমেরিকা, সুইডেন বা মিয়ানমার কেউ পিছিয়ে নেই। এখনো আমরা মানুষ নই; কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান, কেউ খ্রিস্টান, কেউ বৌদ্ধ আবার কেউ বা ইহুদি। তবে মৌলবাদী ও ধর্মান্ধদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। মানবতাবাদ এদের কাছে কিছু নয়, নিজেদের স্বার্থই আসল।
এই উপমহাদেশে দুই ধর্মের মানুষের বিরোধিতাজনিত মনোভাব সবসময় খুব শক্তিশালী। যখন যার দরকার সে তখন এটা ব্যবহার করে। শুধু সাধারণ মানুষেরা এটা বুঝতে পারি না। এখন চলছে ‘ভারত বয়কট’ নামের প্রচার। ভারতীয় পণ্যের বিপরীতে আমার দেশের পণ্য থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেশি পণ্য বলে যে কেউ তার পণ্য ক্রেতার সামনে এগিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে, সেই দেশের পণ্য বর্জনের আহ্বান তো ন্যূনতম নৈতিক নয়।
চার
বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনীতি গুরুত্ব পাচ্ছে কেন? এর জবাবে বলা যেতে পারে, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের সময় ভারত আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছে এবং ভারতের কারণেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে বলে বিএনপি-জামায়াতের যুক্তি। তবে তো একই যুক্তিতে চীনের পণ্যও বর্জনের দাবি তোলা দরকার। কেননা, চীনও তো নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছে। রাশিয়াও নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছে। তাহলে রাশিয়ার পণ্যও বর্জন করা দরকার।
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে পণ্য বয়কটের রাজনীতি কোনো সমাধান নয়। কেউ তা পারে না। আমি না চাইলেও অন্যজন পণ্য আনবে। বিএনপির মধ্যেও ব্যবসায়ীরা আছে। বিএনপি এখন যা করছে, পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগও তাই করেছে। পাকিস্তানের শাসকদের রাজনীতি ছিল ভারতের অন্ধ বিরোধিতা।
ভারতীয় পণ্য বর্জনের আন্দোলনে বিএনপি-জামায়াত কী ফল পেতে পারে। মানুষের মধ্যে এক ধরনের জিহাদি উন্মাদনা তৈরি করা ছাড়া? বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তো প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘পাকিস্তান আমলে আমরা ভালো ছিলাম’। যারা পাকিস্তান আমল দেখেনি, তাদের বুঝতে হবে বিএনপি-জামায়াত আসলে কী চাইছে। পাকিস্তানেও এখন এমন ইন্ডিয়াবিরোধী প্রোপাগান্ডা নেই।
পাঁচ
২০১৩ সালে প্রণব মুখোপাধ্যায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঢাকা এলেও সেই সময় খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার সাক্ষাৎকার বাতিল হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা এসে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এখন আবার নতুন করে সেখানে ভারতীয় পণ্য বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছে।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকায় থাকা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা এবং লন্ডন থেকে আসা দু-একজন মিলে একটি প্রতিনিধিদল ভারত সফর করে। ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্কের সঙ্গে বৈঠক করে তারা। অর্থাৎ নির্বাচনে নিজেদের জন্য ভারতের আনুকূল্য চেয়েছিল তারা। তবে এর পরের পাঁচ বছরে প্রকাশ্যে ভারতবিরোধী কোনো মন্তব্য করেনি দলটি। তাহলে কি নির্বাচনে যাওয়া না-যাওয়ার সঙ্গে তাদের ভারত বিরোধিতার কোনো সম্পর্ক আছে?
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রিজভী যখন ভারতীয় চাদর ছুড়ে ফেলে আগুনে ঘি ঢালছেন, তার দু-এক দিন আগেই দলটির আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা প্রকাশ্যে গণমাধ্যমে জানান, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ভারতসহ সব বন্ধুরাষ্ট্রের সহযোগিতা চান তারা। এদিকে ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দিলেও ২৫ মার্চ ভারতীয় কূটনীতিকদের নিয়ে ইফতার পার্টি করেছে বিএনপি। তাহলে বিএনপির ভারত বয়কট আন্দোলনের গোড়া কোথায়? এবার ভারতবিরোধী আন্দোলন করে বিএনপি কোন স্বার্থ হাসিল করতে চায়, প্রশ্ন রাখছেন বিশ্লেষকরা।
ভারত বয়কট কতটা সাফল্য দেশের জন্য বয়ে আনবে, তা আমাদের ভাবতে হবে। মনে হয়, ভারতের পণ্য বয়কটের চাইতে আমাদের এ দাবি জোরালো করা উচিত ভারতনির্ভরতা কমাতে হবে, উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
ছয়
দেশীয় পণ্য আমরা যত বেশি কিনব, ততই বাড়বে উৎপাদনে থাকা কর্মীর সংখ্যা, পরিবহনে নিযুক্ত শ্রমিকের সংখ্যা, বিক্রয়কেন্দ্রে বিক্রেতার সংখ্যা। বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিন অর্থাৎ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রথম পর্যায় শেষ হলে, শুরুতেই ৩টি কার্যকরী পদক্ষেপের প্রথমটি ছিল বিলেতি ভোগ্যপণ্য বয়কট। সে সময় পরাধীন ভারতে স্লোগান উঠেছিল ‘স্বদেশি পণ্য, কিনে হও ধন্য’। সেই আমলে ইংরেজরা হর্তাকর্তা ছিল। এখন আমরাই সব, তাহলে স্বদেশি পণ্য ক্রয় করতে কুণ্ঠাবোধ করি কেন? দেশে কারখানা না থাকলে তরুণ, যুবকরা কোথায় কাজ পাবে? বিদেশি পণ্য কিনে তো আমরা বিদেশিদেরই অধিক দক্ষ করছি। নিজের দেশের উৎপাদিত পণ্য ব্যবহারে অগৌরবের কিছু নেই; বরং তা মহাগৌরবের। একইভাবে বিদেশি পণ্য ব্যবহারের অর্থ হলো, আমরা ওই মানের পণ্য তৈরি করতে পারি না, কিন্তু এর নির্লজ্জ ব্যবহারে আগ্রহী।
কথিত আছে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর হৃৎপিণ্ডে অস্ত্রোপচার করতে সিঙ্গাপুরে যেতে হবে ডাক্তারের এ রকম পরামর্শের জবাবে মাহাথির মোহাম্মদ বলেছিলেন, ‘আমি হলাম মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী। আমি কীভাবে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যাই? তোমরা চিকিৎসা প্রযুক্তি মালয়েশিয়ায় নিয়ে আসো। আমার অপারেশন মালয়েশিয়ার মাটিতে হবে।’ একই রকম বক্তব্য ছিল প্রায় আশি বছর বয়সী ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর। হাঁটুর অপারেশনের ক্ষেত্রে তিনি বলেছিলেন, ‘হাঁটুর অপারেশন ভারতের মাটিতেই হতে হবে’। ভারতীয় পত্রিকাগুলো ফলাও করে লিখল ‘কহবব ড়ভ ঃযব ঘধঃরড়হ’-এর কথা। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তার নিজের চিকিৎসার বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, তার চিকিৎসা যেন বাংলাদেশের মাটিতেই হয়। তাহলে আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে, শুধু চিকিৎসা নয়, আমাদের সব সেবা, পণ্য আমাদের দেশেরই ব্যবহার করতে হবে, যা আমাদের আত্মসম্মান যেমন বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে, ঠিক তেমনি আমাদের সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসও বাড়াবে বহুগুণ। বিএনপি ও তার সমমনা দল-ব্যক্তিদের উচিত মানুষের ভেতর এ রকম জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেম তৈরি করা।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও লেখক
