কী ছিল আর কী হলো। স্থানীয় রাজনীতিতে ও প্রশাসনে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরাই ছিলেন সবকিছু। প্রশাসনিক প্রধান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) ছিলেন শুধু নির্বাহী। আর সংসদ সদস্যরা (এমপি) ছিলেন দূরগ্রহের বাসিন্দাদের মতো উপদেষ্টা।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় উপজেলা পরিষদের মতো ধাপ সংযোজন করে প্রশাসনকে তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সাধারণ মানুষ হাতের কাছে আদালত পেয়েছিল। তাদের শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করেন এমন শিক্ষা কর্মকর্তা পেয়েছেন। একইভাবে প্রাণিসম্পদ, সমাজকল্যাণ, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ প্রয়োজনীয় সব বিষয়ের দপ্তর ও কর্মকর্তাও পেয়েছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তাদের একজন নেতা নির্বাচন করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সব সম্ভাবনার অকাল মৃত্যু হলো।
উপজেলা চেয়ারম্যানদের দাপট ছিল সর্বত্র। তারাই প্রশাসন চালাতেন, তাদের মাধ্যমেই উন্নয়নের বরাদ্দ হতো। তারা ছিলেন কার্যকর জনপ্রতিনিধি। কিন্তু সেই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী উপজেলা চেয়ারম্যানরা সময়ের আবর্তে যেন সর্বহারায় পরিণত হয়েছেন। তাদের হাতে আজ উন্নয়ন বরাদ্দ নেই, প্রশাসনও তাদের কথা শোনে না। শুধু নির্বাচন এলেই তাদের ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা দেখা দেয়।
এতকিছুর পরও আগের সেই উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা এখনো মানুষকে স্মৃতিকাতর করে তোলে। সেই সময় যারা উপজেলায় চাকরি করেছেন, এখন তারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। যারা ওই সময় উপজলায় রাজনীতি করেছেন তাদের অনেকেই এখন সরকার পরিচালনায় যুক্ত। উপজেলার সুবিধাভোগী বিশাল জনগোষ্ঠীও সুযোগ পেলেই উপজেলা প্রসঙ্গ টেনে আনেন।
এমন প্রেক্ষাপটের মধ্যে ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপে আজ বুধবার ১৩৯টি উপজেলায় ভোটগ্রহণ হবে।
উপজেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচন হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। ওই নির্বাচন মানুষকে খুব আলোড়িত করেছিল। যদিও উপজেলা পদ্ধতিটা চালু হয়েছিল ১৯৮২ সালে। ওই সময় সংসদ ছিল না। তাই উপজেলা পর্যায়ে কোনো জনপ্রতিনিধিও ছিলেন না। তবে সেই নির্বাচনও সহজে করা যায়নি। নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়ার পরও ওই সময় ছাত্র আন্দোলন জোরদার হয়। মূলত ছাত্রদের কারণেই সেই নির্বাচনটা করা যাচ্ছিল না। ১৯৮৫ সালের নির্বাচনের আগে হঠাৎ করেই সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাঁচ মাস বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা হয়। ওই ফাঁকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচন করে ফেলেন। ওই নির্বাচন করার জন্যই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
স্থানীয় সরকার সম্প্রসারণে উপজেলা ছিল যুগান্তকারী ব্যবস্থা। ইউনিয়ন ও জেলার মাঝখানে থানা থাকার পরও সেখানে কোনো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ছিল না। ফলে কোনো সমন্বিত উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। উপজেলা পদ্ধতির আগের ব্যবস্থা ছিল খুবই সাধারণ মানের। সার্কেল অফিসার (সিও) রেভিনিউ এবং সার্কেল অফিসার (সিও) উন্নয়ন এ দুজনকে ঘিরেই চলত সার্কেল অফিস। হাটবাজার ইজারা দেওয়ার মতো ছোটখাটো কাজ ছিল তাদের। কিছু পরিবর্তন এনে এরশাদ নাম দিয়েছিলেন আপগ্রেডেড উপজেলা। পর্যায়ক্রামে উপজেলা প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হলো। উপজেলা প্রবর্তনের ফলে সেখানে যেসব কর্মকর্তাকে চাকরি দেওয়া হয় তারা সব বাছাই করা। কৃষি কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বা পশুসম্পদ কর্মকর্তারা মনে করেন, জনগণের সেবা দেওয়ার জন্য তাদের সেখানে বসানো হয়েছে। স্থানীয় মানুষের ভোটে একজন উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন যিনি স্থানীয়দের উন্নয়ন সমন্বয় করবেন। সরকারি অফিসের মূল কাজই হচ্ছে জনগণকে সেবা দেওয়া। শুধু অবকাঠামোই উন্নয়ন নয়। স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন, শিক্ষা উন্নয়নও দায়িত্বের বড় অংশ। সবই সমন্বয় করেন চেয়ারম্যান। উপজেলায় স্থাপিত সব অফিসই তদারকি করবেন উপজেলা চেয়ারম্যান। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় যেমন প্রধানমন্ত্রী করেন, তেমনি উপজেলায় চেয়ারম্যান করবেন। এতে ব্যাপক সাড়া পড়ে।
সাংবিধানিকভাবে সংসদ সদস্যদের আইন প্রণয়নের বাইরে আর কোনো উল্লেখযোগ্য কাজ করার সুযোগ নেই। চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে স্থানীয় সরকার কার্যকর হলে উন্নয়নে এমপিদের অংশগ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। তারা তাদের আইন প্রণয়ন নিয়েই ব্যস্ত থাকতে পারবেন। কিন্তু তিনি উন্নয়নও করেন আবার আইনও করেন এ দ্বিমুখী নীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রাজনীতি ও প্রশাসন।
সংসদ সদস্য শুধু আইন প্রণয়ন নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন আর উপজেলা চেয়ারম্যান দেখভাল করবেন উন্নয়ন ও প্রশাসনিক পরিচালনা। এমন পরিস্থিতি থাকলে এমপি ও চেয়ারম্যানের দ্বন্দ্বে জড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এমপিকে আইন নিয়েই থাকতে হবে। সংসদে কী আইন আসছে বা সংসদীয় কমিটির কাজ নিয়েই তারা ব্যস্ত থাকবেন। সংসদীয় কমিটির সদস্য হিসেবে এমপিরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজের গভীরে যেতে চান না। এমপি ব্যস্ত থাকেন এলাকার রাজনীতি নিয়ে। কার প্রাধান্য বেড়েছে, কে উন্নয়নের কমিশন নিয়ে যাচ্ছে সেগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকেন এমপি। মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটি সংসদীয় গণতন্ত্রের একটি বড় জায়গা কিন্তু সেখানে নজর দেওয়া হচ্ছে না।
উপজেলাকে স্থানীয় সরকার হিসেবে যেভাবে ধারণ করা দরকার তা না করায় জনগণের কাজে লাগছে না। এখন প্রশাসনিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জেলায় ডিসি আর উপজেলায় ইউএনও কোনো জনপ্রতিনিধির কাছে দায়বদ্ধ নন। শুরুতে ইউএনওরা ছিলেন উপজেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী। এটা বদল করে প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে আনার ফলে ইউএনওরা চেয়ারম্যানের কাছে জবাবদিহি করেন না। আর ইউএনওদের প্রশাসনিক দক্ষতা কাজে লাগাতে না পেরে চেয়ারম্যানরাও যেন ‘ঠুঁটো জগন্নাথে’ পরিণত হয়েছেন। এ ব্যবস্থা সংস্কার করে জনপ্রতিনিধিদেরই নেতৃত্বে রাখা উচিত। তাহলে জনগণ আসল সেবাটা পাবে।
আলোচিত এ উপজেলা ব্যবস্থার দুর্বলতাও ছিল। মুনসেফ আদালতের ক্ষেত্রে এটাকে অতিক্ষমতায়ন করা হয়েছিল। ফলে এর অপব্যবহার হয়েছিল। প্রতিটি উপজেলায়ই ছিল মুনসেফ আদালত। এই মুনসেফরা পরে বিচার বিভাগে একীভূত হয়ে যান। উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেটও নিয়োগ হয়েছিল। তারা একীভূত হন প্রশাসন ক্যাডারে। ওই সময় মামলার পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। হাতের কাছে আদালত থাকায় সরাসরি গিয়ে সেখানে মামলা করা হতো। স্থানীয় রাজনীতিতেও এর ব্যবহার ছিল। উপজেলা পদ্ধতির প্রবর্তন করেছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন বিএনপির কাছ থেকে। পরে ক্ষমতায় গিয়ে উপজেলা ব্যবস্থায় সংস্কার না এনে খালেদা জিয়া তা সরাসরি বাতিল করে দেন।
১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ তা পুনর্বহাল করে। কিন্তু নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। ২০০১ সালে আবার বিএনপি ক্ষমতায় যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে নির্বাচন দেয়।
চেয়ারম্যান নাকি সংসদ সদস্য কে বড়। এ দ্বন্দ্বে জড়িয়েই উপজেলাকে প্রশাসনিকভাবে দুর্বল করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে পুনর্বহাল করার পর ইউএনও এককভাবে উপজেলা পরিষদ পরিচালনা শুরু করেন। তখন জনপ্রতিনিধি বা চেয়ারম্যানের অভাবে বিষয়টি যেন ইউএনওদের পকেটে চলে যায়। পরে জনপ্রতিনিধি আসার পরও তা পুনরুদ্ধার হয়নি। আর সরকারও আমলাদের চাহিদাটাকেই গুরুত্ব দিয়েছে। এখনো ইউএনও আদেশ করলেই কাজ হয়। চেয়ারম্যানের গুরুত্ব নেই। কিন্তু চেয়ারম্যান ওই উপজেলার জনগণের প্রতিনিধি। আর ইউএনও হচ্ছেন সরকারের একজন কর্মচারী। তাকে বিধিবিধানের ভেতর থেকে চলতে হয়। উপজেলা চেয়ারম্যান আইনগত বা প্রশাসনিক সব বিষয় জানবেন না এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে তাকে সাচিবিক সহায়তা দেবেন ইউএনও।
