উত্তম চরিত্র গঠনের উপায়

আপডেট : ১২ মে ২০২৪, ০৫:১৩ এএম

সদাচরণ মানুষকে সম্মানের অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। সদাচারী মানুষের ব্যবহারে মুগ্ধ হয় সবাই। তার প্রতি পরিবার ও সমাজের এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। তাই সদাচারী মানুষকে সবাই ভালোবাসে। মহান আল্লাহও সদাচারী মানুষকে ভালোবাসেন।

উত্তম চরিত্র মানুষের প্রকৃত ইমানের প্রমাণস্বরূপ। চরিত্র ব্যতীত ইমান প্রতিফলিত হয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ইমানদার হচ্ছে সে ব্যক্তি, যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।’ (আবু দাউদ)

ইসলামে উত্তম চরিত্র গঠনের কিছু মৌলিক বিষয় পরিলক্ষিত হয়, যা উত্তম চরিত্র গঠনের ক্ষেত্রে সর্বোৎকৃষ্ট উপায় বলে মনে করা হয়। সেগুলো তুলে ধরা হলো।

সত্যবাদিতা : আল্লাহতায়ালা ও তার রাসুল (সা.) আমাদের যেসব চরিত্রের নির্দেশ দিয়েছেন, তার অন্যতম হচ্ছে সত্যবাদিতা। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে কারিমে ইরশাদ হচ্ছে, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো। (সুরা তাওবা ১১৯)

আমানতদারিতা : উত্তম চরিত্রের একটি দিক হচ্ছে আমানতদারিতা। আল্লাহতায়ালা আমানতদারিতার বিষয়ে ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, আমানতগুলো তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে।’ (সুরা নিসা ৫৮)। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এ গুণের জন্যই তার সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আল-আমিন উপাধি লাভ করেছিলেন।

বিনয় ও নম্রতা : উত্তম চরিত্রের আরেকটি দিক হচ্ছে বিনয় ও নম্রতা। একজন মুসলমান তার অন্য মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে বিনয়ী আচরণ করবে। সে ধনী হোক বা গরিব হোক। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তোমরা বিনয়ী হও। একজন অন্যজনের প্রতি অহংকার কোরো না এবং একজন অন্যজনের ওপর সীমালঙ্ঘন কোরো না।

পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার : পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা উত্তম চরিত্রের অন্যতম। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর আল্লাহর ইবাদত করো, তার সঙ্গে কোনো কিছু শরিক কোরো না এবং মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করো।’ (সুরা নিসা ৩৫)। এ আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা মাতা-পিতার প্রতি আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। অন্য আয়াতে তিনি তাদের প্রতি দয়া ও বিনয়পূর্ণ আচরণ এবং তাদের জন্য দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন।

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা : আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ওয়াজিব। আর তা ছিন্ন করা জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং অভিশাপের কারণ। কোরআনে এ বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি তোমরা ক্ষমতা পাও, তাহলে কি তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে? তারা তো ওইসব লোক, যাদের প্রতি আল্লাহতায়ালা অভিশাপ করেছেন। তিনি তাদের বধির করে দিয়েছেন এবং তাদের দৃষ্টি অন্ধ করে দিয়েছেন।’ (সুরা মুহাম্মদ ২২-২৩)

অঙ্গীকারপূর্ণ : উন্নত চরিত্র গঠন করার ক্ষেত্রে এদিকটি ভালোভাবে পালন করতে হবে। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর অঙ্গীকার পূর্ণ করো, কেননা অঙ্গীকার সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সুরা ইসরা ৩৪)। এ ছাড়া হাদিসে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাকে মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার : প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করা উত্তম চরিত্রের অন্যতম দিক। প্রতিবেশী বলা হয় সেসব লোককে যারা আমাদের বাড়ির আশপাশে বসবাস করে। প্রতিবেশীদের প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করো, নিকটাত্মীয়, এতিম, মিসকিন, নিকটতম প্রতিবেশী ও দূরবর্তী প্রতিবেশীর প্রতিও।’ (সুরা নিসা ৩৬)

ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা : ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা হলো উত্তম চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যে ধৈর্যধারণ ও ক্ষমা করল, নিশ্চয়ই এটা কাজের দৃঢ়তার অন্তর্ভুক্ত’। (সুরা শুরা ৪৩)

লজ্জা : লজ্জা এমন একটি চরিত্র, যা পরিপূর্ণতা ও মর্যাদাপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দিকে আহ্বান করে। লজ্জা অন্তরে ইমান থাকার প্রমাণ বহন করে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘লজ্জা কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসে না।’ (সহিহ মুসলিম)

ন্যায়পরায়ণতা : ন্যায়পরায়ণতা আত্মার প্রশান্তি সৃষ্টি করে। সমাজে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন প্রকার অপরাধ বিমোচন করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘ইনসাফ করো, এটা তাকওয়ার অতীব নিকটবর্তী।’ (সুরা মায়িদা ৮)

দয়া ও করুণা : এ চরিত্রটি অনেক মানুষের অন্তর থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে তাদের অন্তর পাথরের মতো কিংবা তার চেয়ে অধিক শক্ত হয়ে গেছে। আর প্রকৃত মুমিন হচ্ছে দয়াময়, পরোপকারী ও গভীর অনুভূতিসম্পন্ন উজ্জ্বল অনুগ্রহের অধিকারী। এ বিষয়ে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মুমিনদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য, করুণা ও অনুকম্পার উপমা হচ্ছে একটি শরীরের মতো। যখন তার একটি অঙ্গ অসুস্থ হয় তখন গোটা শরীর নিদ্রাহীনতা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়।’

চারিত্রিক পবিত্রতা : উত্তম চরিত্রের অন্যতম বিষয় হচ্ছে চারিত্রিক পবিত্রতা। আল্লাহতায়ালা এ বিষয়ে বলেন, ‘যাদের বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, তারা যেন চারিত্রিক পবিত্রতা গ্রহণ করে। যতক্ষণ না আল্লাহ তার অনুগ্রহে তাকে সম্পদশালী করেন।’ (সুরা নুর ৩৩)। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা আমার জন্য ছয়টি বিষয়ের জিম্মাদার হও। তাহলে আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব। যখন তোমাদের কেউ কথা বলে, সে যেন মিথ্যা না বলে। যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, তখন সে যেন তার খেয়ানত না করে। যখন প্রতিশ্রুতি দেয়, তা যেন ভঙ্গ না করে। তোমরা তোমাদের দৃষ্টি অবনত করো। তোমাদের হস্তদ্বয় সংযত করো। তোমাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করো।’

এসব চারিত্রিক গুণাবলি অর্জন করতে পারলেই উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়া যাবে। হওয়া যাবে পরিপূর্ণ ইমানদার। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে এসব চারিত্রিক গুণাবলি অর্জনের তওফিক দান করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত