রাজধানীর মগবাজার চৌরাস্তা। এদিক-ওদিক ছুটছে গাড়ি। কেউ উল্টো পথে, আবার কেউ পুলিশের হাতের ইশারা অমান্য করেই ছুটছে। দায়িত্বরত তিন পুলিশ সদস্য দুই হাত প্রসারিত করেও যানবাহন আটকাতে পারছে না। তবু তারা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের এ কাজে প্রাণের ঝুঁকি আছে।
রাজধানীর গুলিস্তান, পল্টন, উত্তরা, মিরপুর এবং অনেক ব্যস্ত জায়গায় একই পদ্ধতিতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা গেছে পুলিশকে। ঢাকা মহানগরে এভাবেই ট্রাফিক কন্ট্রোল করা হয়।
মোড়ে মোড়ে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি স্থাপনের নামে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু কাজে না লাগায় প্রকল্পের উদ্দেশ্য এবং খরচ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ট্রাফিক সিগন্যালের নামে যত প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে আলোচিত ছিল কেইস প্রকল্প। এ প্রকল্পের অধীনে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যালের নামে ৩৮ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে, যদিও ফল শূন্য।
২০১০-১১ অর্থবছরে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এ প্রকল্পের অধীনে ৩৮ কোটি টাকা খরচ করে ঢাকার প্রতিটি মোড়ে স্বয়ংক্রিয় স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে যার মনিটরিং করার কথা ছিল। কিন্তু ট্রাফিক সিগন্যালগুলো অকেজো। আর ডিএসসিসির নগর ভবনের ষোলোতলার নিয়ন্ত্রণকক্ষে আনসার সদস্যরা বাস করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকার বায়ুর মান ও পরিবেশ উন্নয়নের জন্য বিশ্বব্যাংকের সহায়তার এ প্রকল্পে লুটপাটের জন্য অদ্ভুত সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিবেশের উন্নয়নের এ প্রকল্পে ঢাকার সিগন্যালগুলোয় বাতি বসানোর নাম করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের পেছনে সদিচ্ছার বড় অভাব। তাই ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নে কিছু হয়নি। ট্রাফিক বাতিগুলো ঠিকমতো বসানো হয়েছিল কি না, তা নিয়েও সন্দেহ। এ নিয়ে তৎকালীন সরকারের সংসদীয় কমিটিও ক্ষোভ প্রকাশ করে। তবে প্রকল্প পরিচালক ও ডিএসসিসির প্রধান নগর-পরিকল্পনাবিদ ওই সরকার এবং মেয়রের আস্থাভাজন হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আগের ট্রাফিক পদ্ধতির ত্রুটি-বিচ্যুতি বিশ্লেষণ করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ত্রুটির কারণ নির্ণয় করতে না পারলে নতুন প্রকল্পও আলোর মুখ দেখবে না বলে তাদের অভিমত।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিম্ন মানের পরিকল্পনার জন্য সিগন্যাল বাতিগুলো আলোর মুখ দেখেনি। ঢাকার বাস্তবতায় অধিকসংখ্যক গাড়ির চাপ সামলাতে বাতিগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
জানা গেছে, নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পের আওতায় ঢাকার ৯৯টি পয়েন্টে সিগন্যাল বাতি বসানোর কথা বলেছিলেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ৫৩টি ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ৪৬টি মোড়ে সিগন্যাল বাতি বসানো হয়। ডিএসসিসির ৫৩টি মোড়ের ২৮টি মোড়ে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে সিগন্যাল পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল। বাকি বাতিগুলো ট্রাফিক বক্স থেকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা ছিল। কিন্তু ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং বাতি স্থাপনের কিছুদিন পরই শুরু হয় তীব্র যানজট। এখন পুলিশের হাতের ইশারাই ভরসা। গুলশান-২ গোলচত্বর ও বিজয়সরণি মোড় ছাড়া অন্য কোথাও ট্রাফিক বাতি দেখা যায় না।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) খোন্দকার নাজমুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকায় বর্তমানে শুধু গুলশানের একটি মোড়ে সিগন্যাল বাতি আছে। ১৫১টি মোড়ে কোনো বাতি নেই। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা হাত উঁচিয়ে গাড়ি থামান। এটা অমানবিক ও কঠোর পরিশ্রমের কাজ।’ তিনি বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টা অবগত আছেন। বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন। আশা করছি, দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।’
কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুমে আনসারদের মেস
ডিএসসিসি নগর ভবনের ছাদের ওপরের এক পাশে কেইস প্রকল্পের সিগন্যাল বাতি পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়। এখনো নগর ভবনের ষোলোতলায় সাইনবোর্ড ঝুলছে। সেখানে লেখা আছে, ‘সেন্ট্রাল মনিটরিং স্টেশন (সিএমএস), ইলেকট্রনিক ট্রাফিক সিগন্যাল’। সাইনবোর্ডের নিচে দিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে দেখা যায়, লুঙ্গি ও গামছা ঝুলছে। দুই পাশের দুটি রুমে সারিবদ্ধ চৌকির ওপর বিছানা পাতা। কক্ষ দুটির বাসিন্দারা বলছেন, তারা সবাই আনসার সদস্য। সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত। সিটি কর্তৃপক্ষই তাদের থাকার জন্য এ জায়গা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ষোলোতলা জুড়ে সাইনবোর্ড ছাড়া ট্রাফিক কন্ট্রোলের কোনো যন্ত্রপাতি চোখে পড়েনি।
গত সোমবার প্রকল্প পরিচালক সিরাজুল ইসলামের দপ্তরে গিয়ে সাক্ষাৎ মেলেনি। মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিলে তিনি ‘ও ধস হড়ঃ বহঃরঃষবফ’ উত্তর দেন।
আসছে নতুন প্রকল্প
ঢাকায় নতুন করে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনের কাজ শুরু হচ্ছে ডিসেম্বর মাসে। প্রাথমিকভাবে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলা মোটর, কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেট মোড়ে লাগানো হবে সিগন্যাল বাতি।
ঢাকার ২২টি মোড়ে দেশীয় প্রযুক্তির সিগন্যাল সিস্টেম এবং বাতি লাগানোর কথা ইতিমধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন ও অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। এ প্রকল্প চালু হলে ‘অকাজে’ ব্যয় বন্ধ হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘বিগত সময়ে ট্রাফিক-সংশ্লিষ্ট সব কাজ হয়েছে প্রকল্পভিত্তিক। যার ফলে প্রকল্পের টাকা খরচ হলেও কোনো কাজ হয়নি। আর এটা প্রকল্প নয়, এটা সমস্যাভিত্তিক সমাধান। এ ধরনের কাজে কোনো খরচ নেই।’
তিনি বলেন, ‘এই কাজে ট্রাফিক পুলিশ, দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সংযুক্ত থাকবেন। তাদের কাজের জন্য আলাদা করে কোনো বরাদ্দ বা খরচ নেই। বুয়েটের কয়েকজন শিক্ষার্থীর একটি টিম কাজ করছে। তারাও টাকার নয়, দেশের হয়ে সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন।’
পুরনো প্রকল্পের ব্যর্থতার কারণ সন্ধানের তাগিদ
কেইস প্রকল্প ছাড়াও বেশ কয়েকবার রাজধানীতে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি লাগানো হয়। অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে এসব প্রকল্প কাজে লাগেনি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ ক্যান্টনমেন্ট এলাকার সিগন্যাল বাতি ঠিকভাবে কাজ করছে। তাই আগের প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার কারণ জানা জরুরি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রাফিক সিগন্যালের যে প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়েছে, তা কাজ করার কথা না। সারা পৃথিবীতে গণপরিবহন এবং ট্রাফিক কন্ট্রোলের জন্য মেয়র অফিসে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকে। কনসালট্যান্ট দিয়ে এ কাজ হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে বারবার কনসালট্যান্ট দিয়ে ট্রাফিক সিগন্যালের কাজ করানো হয়েছে। কনসালট্যান্ট বেইজড প্রকল্প দিয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল উন্নত করার স্বপ্ন দেখলে আগের প্রকল্পগুলোর মতোই অবস্থা হবে।’ তিনি বলেন, ‘ট্রাফিক কন্ট্রোলের উদাহরণের জন্য দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম তারা নিজেরাই ডেভলপ করেছে। তারাই ব্যবস্থাটি কার্যকর করছে। একটি সুন্দর ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।’
বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পদের সদস্যদের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে
নয়াপল্টনে আসতে শুরু করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরই অভিবাসীদের তাড়ানো হুঙ্কার ট্রাম্পের
আসিফ নজরুলের সঙ্গে জেনেভা বিমানবন্দরে কী ঘটেছিল
আহত শিক্ষার্থীকে চিকিৎসার জন্য ব্যাংককের টিকেট দিল বিমান
ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করবেন কিনা, জানালেন পুতিন