তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে আমাদের দেশে রয়েছে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণœ হয়, একসময় কথা ছিল আইনে সেই ধারাগুলো থাকবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট (ডিএসএ) পরিবর্তন করে, ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে পাস করেছিল ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’। ওই আইনের ৪২ ধারায় বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয় পুলিশকে। একই সঙ্গে এই আইনের মাধ্যমে ডিজিটাল মাধ্যম থেকে তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার মতো ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে। এর বাইরে সংযোজিত গুরুত্বপূর্ণ বিধান ছিল কেউ মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ দায়ের করলে তাকে ‘অপরাধ’ হিসেবে বিবেচনা করে শাস্তির বিধান থাকা। এ ছাড়া আগের আইনে অ-জামিনযোগ্য ধারা ছিল চৌদ্দটি। কিন্তু সাইবার নিরাপত্তা আইনে সেটি কমিয়ে চারটি করা হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, তখন আইন সংশোধন করে গ্রহণযোগ্য করার জন্য কয়েক মাস সময় ব্যয় হলেও খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি বরং ভীতি সৃষ্টির মতো ধারাগুলো আইনে রয়েই গেছে। দেশের সাংবাদিক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিরোধিতার মধ্যেই হয় সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট। আসলে এই আইনটি পুরনো আইনই নতুন নামে করা হয়েছিল।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একসময় সাংবাদিক, রাজনীতিক, শিল্পী, লেখক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, গার্মেন্টসকর্মী থেকে শুরু করে শিক্ষক-ছাত্র পর্যন্ত জেল খেটেছেন। কারাগারে কারও মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় লেখক মুশতাক আহমেদ ২০২১ সালে কারাগারে মারা যান। এ ছাড়া কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর, সাংবাদিক তাসনিম খলিল, সাংবাদিক শাহেদ আলমসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ‘গুজব ছড়ানো ও সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার’ অভিযোগ আনা হয়েছিল। এখন জানা গেল, সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিলে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। একইসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আইন মন্ত্রণালয়ের আইনি যাচাই (ভেটিং) শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পুনরায় উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে তোলা হবে। এর বদলে সাইবার স্পেসে ‘সেইফটি ও সিকিউরিটি’ নিশ্চিত করার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সহায়তায় একটি পৃথক আইনের খসড়া আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করবে। আমাদের বিশ্বাস, নতুন খসড়া দল-মত নির্বিশেষে শান্তিপ্রিয় সব নাগরিকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে। এ বিষয়ে শুক্রবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে সাইবার নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া স্পিচ অফেন্স-সম্পর্কিত মামলাগুলো (মুক্তমত প্রকাশের কারণে মামলা) প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ছাড়া এসব মামলায় কেউ গ্রেপ্তার থাকলে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে সেই ব্যক্তি মুক্তি পাবেন বলেও জানানো হয়েছে।
গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সব মানুষ প্রত্যাশা করেন ভিন্নমতের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ‘ব্যাপকভাবে খর্ব’ করার সুযোগ নতুন আইনে থাকবে না। পুলিশ বাহিনীকে যে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা নতুন আইনে বাদ দিতে হবে। একইসঙ্গে কোনো সাংবাদিককে অযথা হয়রানি করার কোনো বিধান যেন না থাকে। সাইবার নিরাপত্তার বদলে এ আইন সাইবার নিরাপত্তাহীনতা যেন তৈরি না করে, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। তবে তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুগোপযোগী আইনের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান আইনটি ঢেলে সাজানো হোক বা নতুন আইন হোক, বিষয়গুলো ভাবনার মধ্যে রাখতে হবে। কোনোভাবেই যেন নিরপরাধ মানুষ নতুন আইনের বেড়াজালে আটকে না যায়। কোনো সাংবাদিকের কণ্ঠরোধ করতে এই আইনের আশ্রয় যেন নেওয়া না হয়। আইনের ৪২ ধারায় বিনা পরোয়ানায় পুলিশকে তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া দ্রুত বন্ধ করতে হবে। শাসকের শাসন হবে জনগণবান্ধব, নতুন আইন অথবা সংস্কারে যেন তার স্পষ্ট বর্ণনা থাকে। আমরা বরাবরই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন, জনকল্যাণমূলক আইনের পক্ষপাতী। তবে যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের বিচার হোক, সেখানে কারও কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।