জুলাই গণহত্যা: মানবতাবিরোধী অপরাধে ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড

আসামিরা আত্মগোপনে থাকায় ধাপে ধাপে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে হাজির হওয়ার নির্দেশ এবং তাদের পক্ষে আইনগত অধিকার রক্ষায় স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ করা হয়।

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজন শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন—আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।

ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার আন্দোলন নির্মমভাবে দমনের উদ্দেশ্যে আসামিরা পারস্পরিক যোগসাজশে প্ররোচনা, উসকানিমূলক বক্তব্য প্রদান এবং গণহত্যার নির্দেশ দেন। তারা নেতাকর্মীদের সশস্ত্র অবস্থায় রাজপথে নামিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান এবং একাধিক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনা তৈরি করেন।

এছাড়া রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অপব্যবহার, কোথাও কোথাও প্রত্যক্ষ সশস্ত্র হামলা পরিচালনা ও সত্য গোপনের লক্ষ্যে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন তারা। তাদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশজুড়ে ব্যাপক হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও মর্মান্তিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার বিবরণীতে দেখা যায়, এ মামলার মূল তদন্তকাজ শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৮ জুন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শেষে একই বছরের ৭ ডিসেম্বর চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন। পরবর্তীতে প্রসিকিউশন টিমের ব্যাপক যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় এবং সেদিনই আদালত তা আমলে নেন।

আসামিরা আত্মগোপনে থাকায় ধাপে ধাপে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে হাজির হওয়ার নির্দেশ এবং তাদের পক্ষে আইনগত অধিকার রক্ষায় স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ করা হয়। যাবতীয় শুনানি শেষে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন বিচারিক প্যানেল। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য ও প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দির মধ্য দিয়ে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব।

বিচারিক কার্যক্রমে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৯ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য প্রদান করেন। সাক্ষীদের তালিকার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল শহীদ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পূর্বে দেওয়া লিখিত জবানবন্দি। সাক্ষ্যগ্রহণের পাশাপাশি মামলায় আলামত ও প্রমাণের পক্ষে মোট ১২৩ সিরিজের নথি ও ডিজিটাল প্রমাণাদি প্রদর্শন করা হয়।

গত ২ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব সমাপ্ত হলে ৪ আগস্ট থেকে শুরু হয় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন। টানা ৯ কার্যদিবস প্রসিকিউশন ও স্টেট ডিফেন্সের মধ্যকার যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে ১৭ আগস্ট মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয় এবং ১৫ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়। অবশেষে দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ শেষে আজ এই বহুল আলোচিত মামলার চূড়ান্ত ও ঐতিহাসিক রায় ঘোষিত হলো।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত