ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেদিন মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সরকারের ১৪ উপদেষ্টা দায়িত্ব নেন। পরে দুই দফায় বাড়ে এ সংখ্যা। সর্বশেষ গত রবিবার নতুন তিনজন যুক্ত হয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪ জনে।
কিন্তু দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে এখন পর্যন্ত কোনো উপদেষ্টা নিয়োগ না হওয়ায় ফের উপদেষ্টা নিয়োগের দাবি উঠেছে। উত্তরবঙ্গ থেকে ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনকে উপদেষ্টা করার দাবি জানিয়েছে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।
তবে আপাতত উপদেষ্টা পরিষদের সংখ্যা আর বাড়ানোর চিন্তাভাবনা নেই বলে সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বুধবার রাতে দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে। সূত্রটি আরও জানিয়েছে, পরে যদি উপদেষ্টা পরিষদে নতুন সদস্য যোগ করা হয়, সে ক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে তরুণ ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানসম্পৃক্ত ব্যক্তিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এমন ব্যক্তিদের মধ্যে ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন কিংবা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম আলোচনায় থাকতে পারেন।
গতকাল বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) টিএসসিতে ‘উত্তরবঙ্গের ছাত্র ও জনসমাজ’র ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন থেকে ‘আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণে’ আখতার হোসেনকে উপদেষ্টা নিয়োগের দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া গত সোমবার বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা আখতার হোসেনকে উপদেষ্টা করতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মহল থেকে এ দাবি উত্থাপন করা হয়।
আখতার হোসেনের বাড়ি রংপুরের কাউনিয়ায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে অনার্স এবং মাস্টার্স শেষ করেছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন।
তাকে উপদেষ্টা নিয়োগের দাবি ওঠার বিষয়ে আখতার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথমত উত্তরবঙ্গ থেকে অন্তত একজন হলেও প্রতিনিধি থাকা উচিত। আমি ডাকসুতে দায়িত্ব পালন করেছি, সংগঠন এবং বিভিন্ন আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছি। উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে এত এত মানুষের চাওয়াকে, সুযোগ আসলে পূরণ করতে চাই।’
টিএসসিতে বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে ঢাবি শিক্ষার্থী নাজমুল হোসাইন সোহাগ বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই উত্তরবঙ্গ বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। উত্তরবঙ্গের মানুষ সঠিক প্রতিনিধিত্বের অভাবে বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, উত্তরবঙ্গের সূর্যসন্তান শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জুলাই বিপ্লবের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, যা উত্তরবঙ্গের জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নতুন প্রেরণা জোগায়। উত্তরবঙ্গের এই বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে এবং এ অঞ্চলের মানুষের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য আমরা একটি সমন্বিত ও সঠিক উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, উত্তরবঙ্গের জনগণের জন্য একটি ন্যায্য, সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে, সেখানে প্রকৃত নেতৃত্বের প্রয়োজন।’
অন্তর্বর্তী সরকারে উত্তরবঙ্গ থেকে উপদেষ্টা নিয়োগের দাবিতে জোর আন্দোলন চলছে রংপুর নগরীতে। এই দাবিতে গতকালও ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ হয়েছে। এদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রংপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা লালবাগের সামনে জড়ো হন। সেখান থেকে তারা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে মডার্ন মোড়ে যান। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করে মডার্ন মোড়ে বসে পড়েন আন্দোলনকারীরা।
সেখানে পথসভায় বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের সঙ্গে বৈষম্য করছে। সরকারে উপদেষ্টাদের ১৩ জন চট্টগ্রাম বিভাগের হলেও উত্তরাঞ্চল থেকে কাউকে নেওয়া হয়নি। এভাবে চললে আঞ্চলিক বৈষম্য আরও বাড়বে। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, রংপুরের অন্যতম সমন্বয়ক ইমরান আহমেদ বলেন, ‘রংপুর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সূতিকাগার। আবু সাঈদের রক্তের মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শুরু হয়েছিল। ১০ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস রংপুরে এসে বলেছিলেন, রংপুর হবে দেশের এক নম্বর জেলা। কিন্তু রংপুর অঞ্চলের জনগণের হয়ে কথা বলার মতো সরকারে একজন উপদেষ্টাও নেই। আবু সাঈদের জন্মভূমি রংপুরকে চরম অবহেলা করা হচ্ছে।’
বর্তমান সরকারে উত্তরাঞ্চলের যোগ্য একাধিক ব্যক্তিকে উপদেষ্টা করার দাবি জানান তিনি। দাবি মানা না হলে সড়ক ও রেলপথ অবরোধসহ রংপুর বিভাগ অচল করার মতো কর্মসূচি ঘোষণার হুমকি দিয়ে আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণে ‘উত্তরবঙ্গের ছাত্র-জনতার’ পক্ষে তিন দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
দাবিগুলো হলো- সুষম উন্নয়ন অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নে উত্তরবঙ্গের দুই বিভাগ থেকে কমপক্ষে দুজন করে চারজন উপদেষ্টা নিয়োগ, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আমলা ও কর্মকর্তা নিয়োগে আঞ্চলিক বৈষম্য না করা; সেই সঙ্গে প্রত্যেক উপদেষ্টাকে কার্যক্রমের অগ্রগতি সাপ্তাহিকভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং বিতর্কিত ও জুলাই বিপ্লবকে ধারণ করেন না, এমন কোনো উপদেষ্টাকে অন্তর্বর্তী সরকারে না রাখা। এ ছাড়া নীতি প্রণয়নে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তরবঙ্গের নেতাদের পরামর্শ নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নিয়োগের ব্যাপারে গতকাল সকালে ঠাকুরগাঁওয়ের কালীবাড়ি এলাকার নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টা নিয়োগে সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। দেশের সংস্কারের জন্য তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী উপদেষ্টা নিয়োগ দিতেই পারে এবং এ বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমন্বয় করার দরকার নেই। কাকে উপদেষ্টা বানাবেন, কীভাবে ও কতজনকে নেবেন, এটির সম্পূর্ণ দায়িত্ব হলো প্রধান উপদেষ্টার।
বিএনপি মহাসচিব আরও বলেন, ‘এখন আমাদের চিন্তা হচ্ছে, আগামী নির্বাচন নিয়ে, সেটাই আমরা এখনো নিশ্চিত নই। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আছে। তারা এখনো নির্বাচনের কোনো রোডম্যাপ দেয়নি। তারা নির্বাচনব্যবস্থাকে সংস্কার করার জন্য একটি কমিটি করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে মতামত জানানোর জন্য।’
( প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন রংপুর প্রতিনিধি)
শ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধে ইন্ধন, টিএনজেডের পরিচালক গ্রেপ্তার
উপদেষ্টারা জনগণের আকাঙ্ক্ষার পক্ষেই থাকবে: মাহফুজ আলম