বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে, পাকিস্তান আমলে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখা এবং স্বাধীন দেশে স্বৈরাচার এরশাদের পতনে ছাত্ররাজনীতি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। এই কারণে ছাত্র-জনতা শব্দটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যরকম দ্যোতনা পেয়েছে। এর প্রমাণ দেখা গেছে ২০২৪ সালেও। ছাত্র-জনতার নেতৃত্বেই আরও একবার বাংলাদেশের মানুষ স্বৈরাচারমুক্ত হতে পেরেছে। কিন্তু, গত কয়েক দশকে এদেশের মানুষ ছাত্ররাজনীতির উলটোপিঠও দেখেছে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো দলের পেটোয়া বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। শিক্ষাঙ্গন তো বটেই, গোটা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। নিরস্ত্র মানুষকে হাতুড়িপেটা করা, প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে হত্যাকা- হয়ে উঠেছিল ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনগুলোর কাজ। টেন্ডারবাজি, ফাও খাওয়া, হলের ছাত্রদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার হয়ে উঠেছিল নৈমিত্তিক চিত্র। আর তাই, ছাত্রদের দলীয় রাজনীতির ওপর দেশের একটা বড় অংশের মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন জরিপে তারা ছাত্রদের রাজনীতি বন্ধের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। ছাত্রদের নেতৃত্বে আন্দোলন হলেও, জুলাই আন্দোলনের পর অনেক ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তবে, বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে দেশের অন্তত ১৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ৪টি সরকারি কলেজ ও ১০টি সরকারি মেডিকেল কলেজে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ হয়। এর মধ্যে ২৭টিতে ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাজনীতিও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, রাজশাহী কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ।
সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনীতি বন্ধ রাখার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। তবে ওই সিদ্ধান্তের কোনো কার্যকারিতা এখন নেই বললেই চলে। ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ একাধিক ছাত্র সংগঠন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১৩ আগস্ট ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে জবি ক্যাম্পাসে সব ধরনের রাজনীতি চলমান এবং ছাত্র সংগঠনগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সরেজমিনে দেখা যায় ক্যাম্পাসে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদসহ বেশ কিছু ছাত্র সংগঠন তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছে, নতুন করে কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তাছাড়া শিক্ষক রাজনীতিও চলছে প্রকাশ্যে।
আগস্টের শুরুর দিকে ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে জনমতের চাপ থাকলেও ধীরে ধীরে ছাত্র সংগঠন ও প্রশাসন পুরোপুরি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ না করার কথা বলছে। তারা এর বদলে ছাত্ররাজনীতি সংস্কারের কথা বলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন ক্রিয়াশীল ১০টি ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে নেতারা ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ না করে তা সংস্কারের পক্ষে মত দেন। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনীতিচর্চার প্রকৃতি ও ধরন বিষয়ে প্রধান অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সুপারিশ করতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাতে আহ্বায়ক হিসেবে আছেন সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। বিভিন্ন ক্রিয়াশীল সংগঠনের ছাত্রনেতারা বলছেন ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা কোনো সমাধান না। এতে, ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলোই শক্তিশালী হবে। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ না করে বরং এটিকে শিক্ষার্থীবান্ধব করতে হবে বলে মতামত দিয়েছেন। ছাত্র সংসদগুলোতে জাতীয় রাজনীতি নয় বরং ছাত্রকল্যাণ এবং হলভিত্তিক সমস্যা নিয়ে ভোটাভুটির ওপর জোর দেন তারা। অতীত তো বটেই, বর্তমান বিবেচনা করলেও অগ্রগ্রামী অংশ হিসেবে রাজনীতিতে ছাত্রদের অংশ নেওয়া জরুরি। একইসঙ্গে তা যেন শাসকের শোষণের অস্ত্র না হয় সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। অন্যান্য দেশে যেভাবে করেÑ ছাত্র অধিকার বিষয়ক ক্যাম্পাস রাজনীতি ছাত্রদের ভবিষ্যৎ নেতা হতে সাহায্য করে, রাজনীতির আঁতুড়ঘর হয়ে ওঠে, তা এদেশেও নিশ্চিত করতে হবে।
