দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ইতিহাস গড়েছে। পৃথিবীব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, যুদ্ধ পরিস্থিতি, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট, বন্যা সব মিলিয়ে নাজুক বছরে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনে রেকর্ড হচ্ছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর দিয়ে শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতি, বাণিজ্যিক পণ্য সবই আনা হয় কনটেইনারে। আবার সমুদ্রপথে রপ্তানি পণ্যের প্রায় পুরোটাই পাঠানো হয় কনটেইনারে। ফলে এই বন্দরের কনটেইনারের সংখ্যার হিসাব দিয়ে দেশের অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায়। দেশের সমুদ্রকেন্দ্রিক মোট আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনারবাহী পণ্যের ৯৮ শতাংশ পরিবাহিত হয়ে থাকে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এই বন্দরের মাধ্যমে যে পরিমাণ কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়, তা মূলত বাংলাদেশেরই অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন। চট্টগ্রাম বন্দর প্রথম ২০১৯ সালে ৩০ লাখ ৮৮ হাজারের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে থ্রি মিলিয়ন ক্লাবে প্রবেশ করে। এরপর ২০২১ সালে ৩২ লাখ ১৪ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল। আর এ বছর গত ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর ৩২ লাখ ২৩ হাজার ৭৮ একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শুক্রবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে, দেশের অভ্যন্তরে ও বিশ্বজুড়ে অস্থিরতার পরও কনটেইনার হ্যান্ডলিং বৃদ্ধিকে দেশের অর্থনীতির জন্য সুখবর বলে দেখছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। বছরের শুরু থেকে কয়েক মাস আগ পর্যন্তও আমাদের অর্থনীতি প্রায় নাজুক অবস্থায় ছিল। প্রায় ৮৭টি বিলাসবহুল পণ্য আমদানিতে এক ধরনের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল। ডলার সংকটে অনেক পণ্যের আমদানি কমে গিয়েছিল। ব্যবসায়ীরা এলসি (ঋণপত্র) খুলতে পারছিল না। তারপরও বছর শেষে কনটেইনার হ্যান্ডলিং বৃদ্ধিকে দেশের অর্থনীতির জন্য সুখবর বলে উল্লেখ করেন বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ।
দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে। আবার রপ্তানি পণ্যেও তারা শীর্ষে। এ বছরের হ্যান্ডলিং প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি রাকিবুল আলম বলেন, ‘পোশাকশিল্পের পাশাপাশি অন্যান্য আইটেমের আমদানি পণ্য যেমন ছিল, তেমনিভাবে রপ্তানি পণ্যও ছিল। আর এ কারণেই বছর শেষে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সংখ্যা বেড়েছে।’ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রাপ্ত উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে গত ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩২ লাখ ২৩ হাজার ৭৮ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। এর মধ্যে আমদানি পণ্য ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৭৫ ও রপ্তানি পণ্য ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার ২৪৩ একক কনটেইনার। এসব পণ্য পরিবহনে ৩ হাজার ৮২২টি জাহাজ এ পর্যন্ত ভিড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। এর আগে ২০২১ সালে ৪ হাজার ২০৯টি জাহাজ ভিড়েছিল চট্টগ্রাম বন্দরে এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল ৩২ লাখ ১৪ হাজার ১৮৭। চট্টগ্রাম বন্দর ২০০৭ সালে মাত্র ৯ লাখ ৫৮ হাজার ২০টি একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছিল। আর তা থেকেই বাড়তে বাড়তে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে। আর এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ব জুড়ে কনটেইনার পরিবহনে শীর্ষ বন্দরগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর ২০১৯ সালে ৫৮তম অবস্থানে ছিল। পরে তা ২০২০ সালে ৬৭তম, ২০২১ সালে ৬৪তম, ২০২২ সালে ৬৭তম ও ২০২৩ সালে ৬৭তম অবস্থানে উন্নীত হয়।
আমদানি-রপ্তানি সামগ্রিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ফলে, পণ্যমূল্যে এর প্রভাব কতটুকু পড়বে, তা বলা কঠিন। তবে অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী, চাহিদাকে স্থির ধরে জোগান বাড়লে পণ্যমূল্য কমার কথা। ধারণা করা যায়, বর্তমানে এলসি খুলতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ডলারের ক্ষেত্রেও কি সংকট আগের মতো তীব্র রয়েছে? যদি তা না হয়, তাহলে আশা করা যায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং আরও বাড়বে। এটা অর্থনীতির জন্য সুখবর। একই সঙ্গে এমন প্রত্যাশা করা অনুচিত হবে না রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই পারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে আরও এগিয়ে নিতে। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকুক। ব্যবসা-বাণিজ্যের সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে যাক, এই শুভ কামনা।
