মঞ্চে-নেপথ্যে

অনামী

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:১৪ এএম

১৯৪৭ সালে ছাত্রাবস্থায় তিনি ‘দৈনিক আজাদ’-এ সাংবাদিকতা শুরু করেন এবং পরে বার্তা সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালে ‘আজাদ’-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর সেই বছরই ‘ইত্তেফাক’-এর বার্তা সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৭০ সালে হন নির্বাহী সম্পাদক। ১৯৬৯-৭০ সালে ‘অনামী’ ছদ্মনামে লেখা অনবদ্য উপসম্পাদকীয় ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’ কলামে উঠে এসেছে তৎকালীন রাজনীতির তীক্ষè পর্যবেক্ষণ এবং বিচার-বিশ্লেষণ। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর তাকে শান্তিনগর, চামেলীবাগের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সৈন্য ও আলবদর-রাজাকাররা। এরপর এই সাংবাদিকের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে ছাপা হলো, পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের  জনপ্রিয় উপসম্পাদকীয় ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’

সমস্যার আমাদের অন্ত নাই। কোনটা রাখিয়া কোনটা লইয়া আলোচনা করিব, বুঝি না। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মোট কথা, জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে অবস্থাটা এমনই জট পাকাইয়া গিয়াছে যে, সে জট যে কেমনে কীভাবে কে খুলিবেন, কিছুই বুঝিবার উপায় নাই। বিশ্বের সেরা ধর্ম ইসলামের অনুসারী হিসাবে আমরা চাহিলাম ইসলামের শান্তি, সাম্য ও ন্যায়নীতির আদর্শের ভিত্তিতে একটি নিজস্ব আবাসভূমি কায়েম করিয়া দুই শতাব্দীর নিগৃহীত জীবনের কলঙ্ক ঘুচাইব। দেশ দেখিবে, দুনিয়া দেখিয়া শিখিবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি নির্দিষ্ট এলাকার মানুষ কী করিয়া শোষণহীন সাম্য, মৈত্রী ও ন্যায়নীতির রাজ্যে পরম সুখে দিন যাপন করিতে পারে। আন্দোলন হইল, সংগ্রাম চলিল, লাখো লাখো মানুষের রক্ত, ত্যাগ ও তিতিক্ষার ফলশ্রুতিস্বরূপ বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানও মানচিত্রে স্থান লইল। সে আজ তেইশ বছর আগেকার কথা।

পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের আজাদি-পূর্ব যুগের সংগ্রাম ও সাধনার সে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস কাহারও বিস্মৃত হইবার কথা নয়। তবু রাষ্ট্রীয় জীবনের বিগত বাইশটি বছরের ইতিহাসের আলোকে সমগ্র অবস্থার যখন খতিয়ান করিতে বসি, জাতীয় জীবনের ক্লেদাক্ত অধ্যায়গুলি যখন এক-এক করিয়া স্মৃতিপটে জাগরিত হইতে থাকে, তখন ব্যথা ও বেদনায়, ঘৃণা ও লজ্জায় মনে হয় মাটির নিচে মুখ লুকাই। ভাবি, দীর্ঘ বাইশ বৎসর পর আবার কেন আজ নতুন করিয়া আমাদের যাত্রা শুরুর প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে হইতেছে?

হইবেই-বা না কেন? ‘বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র’ পত্তনের পর হইতেই সুবিধাভোগী ক্ষমতাসীনচক্রের যোগসাজশে কায়েমি স্বার্থ এমন করিয়া এদেশের মাটিতে শিকড় গাড়িয়া বসে যে, বাইশ বছরের সংগ্রাম ও সাধনা সত্ত্বেও এদেশের আপামর মানুষ জাতীয় পর্যায়ে একবারও ভোটকেন্দ্রে যাইবার অবকাশ পাইল না। জনগণের ভয়ে ভীত প্রথম যুগের ক্ষমতাসীনরা ন্যায়নীতি ও প্রচলিত আইনের মাথা খাইয়া পরিষদের বহু আসন শূন্য থাকিলেও উপনির্বাচন দেওয়ার সকল দাবি সর্ব প্রযত্নে এড়াইয়া গেলেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার প্রথম নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিরা যখন প্রদেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের অধিকার পাইলেন, তখনই কেন্দ্রের অবিবেকী ক্ষমতাসীনচক্র কায়েমি স্বার্থের যোগসাজশে জনগণের সেই জয়যাত্রাকে প্রতিহত করার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন, শুরু হইল শাঠ্য ও ষড়যন্ত্র। বাংলার ৫ কোটি মানুষের প্রিয় নেতা শেরেবাংলা ফজলুল হক ক্ষমতাচ্যুত হইয়া স্বগৃহে অন্তরীণ হইলেন, পূর্ব বাংলায় জারি হইল ৯২-ক ধারার শাসন। ইহাতেও স্বস্তিবোধ করিতে না পারিয়া তলে তলে চক্রান্ত চলিল প্রদেশের জনজোট ‘যুক্তফ্রন্টে’ ভাঙন ধরাইবার। একশ্রেণির সুবিধা-শিকারির সৌজন্যে বাংলার সংগ্রামী মানুষের ঐক্যজোট ভাঙিয়া পড়িল। কেন্দ্রীয় চক্রও আশ্বস্ত বোধ করিলেন। জনতা কিন্তু আশ্বস্ত হইল না। রাষ্ট্রীয় জীবন হইতে অনিয়ম-অনাচারের অবসান ঘটাইয়া একটি নিয়মের মধ্য দিয়া দেশকে আগাইয়া লওয়ার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য চাপ পড়িল শাসনতন্ত্র প্রণয়নের। হাজার মাইলের ব্যবধানে দেশের দুই অংশের মধ্যে একটা সমঝোতা প্রতিষ্ঠার জন্য এবার চেষ্টা চলিল। দেশ ও দেশের মানুষকে যাঁহারা ভালোবাসিতেন, দেশের মানুষের প্রতি যাঁহাদের অবিচল আস্থা ছিল, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ক্ষেত্রবিশেষে গণতান্ত্রিক নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাইয়া হইলেও দেশের দুই অংশের মধ্যে তাঁহারা একটি প্রীতির সম্পর্ক গড়িয়া তুলিতে চাহিলেন। ৫-দফা সুস্পষ্ট শর্তে মারিতে দেশের দুই অংশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে সম্পাদিত হইল একটি চুক্তি, যে চুক্তিতে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর নয়া রূপরেখা নির্দেশ করা হইল। কথা ছিল, এই চুক্তির ভিত্তিতেই দেশের শাসনতন্ত্র রচিত হইবে। সময়কালে দেখা গেল, সবই ফুসফাঁস হইয়া গিয়াছে। এই বাংলারই ১৭ জন সদস্যের সমর্থনে ১৯৫৬ সালে যে শাসনতন্ত্র রচিত হইল, তাহাতে মারি-চুক্তির সংখ্যাসাম্য ও স্বায়ত্তশাসনের অধ্যায়টির বিকৃতি ঘটানো হইল। তৎসত্ত্বেও যে নিয়মে দেশ চলিতেছিল সে নিয়মে যদি আন্তরিকতার অভাব না থাকিত, তাহা হইলে পরবর্তী আমলের বহু বিপর্যয় রোধ করা যাইত নিঃসন্দেহে। শাসনতন্ত্র প্রণীত হওয়ার পর নিজ দলের মাত্র ১৩ জন সদস্যকে লইয়া পশ্চিম পাকিস্তানের রিপাবলিকান দলের সমর্থনে ক্ষমতা গ্রহণ করিয়া আওয়ামী লীগ নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী যেদিন দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচনকে তাঁহার সরকারের প্রধান কর্মসূচি বলিয়া ঘোষণা করিলেন, সেদিন হইতেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেই পুরাতন নিয়মেই প্যালেস ক্লিক ও কায়েমিস্বার্থের যোগসাজশে কঠিন চক্রান্ত শুরু হইল। আমলাতন্ত্রও সে চক্রান্ত হইতে দূরে থাকিল না। সাধারণ নির্বাচন হইলেই দেশে জনগণের সত্যিকার প্রতিনিধিত্বশীল সরকার কায়েম হইবে এবং সে অবস্থায় ষড়যন্ত্রী ও কায়েমি স্বার্থী মহলের ভাগ্যবিপর্যয় অনিবার্য, এ কথা তাহারা ভালোভাবেই জানিতেন। নির্বাচন দিলে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগকে কোনোক্রমে রুখা যাইবে না এবং প্রকৃত ক্ষমতা সংগ্রামী সংগঠন আওয়ামী লীগের হাতে গেলে কায়েমি স্বার্থের সমাধির ওপর দেশের আপামর মানুষের বিজয়কেতন উড়িবে, এ অবস্থা শোষণ ও ক্ষমতালিঙ্গু মহল কোনোক্রমেই মানিয়া লইতে পারে না। ফলে প্যালেসক্লিক, কায়েমি স্বার্থ ও আমলাতন্ত্রের যোগসাজশে সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভাকে ক্ষমতার আসন হইতে অপসারণ করা হইল।

জনাব চুন্দ্রিগড়ের ‘অনিচ্ছুক স্কন্ধে’ দেশের শাসনভার চাপানো হইল, কিন্তু প্রবল চাপের মুখে তিনিও যখন পূর্ববর্তী সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া দেশের সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণে উদ্যত হইলেন, তখনই তাঁহার দুই মাসের মন্ত্রিসভার পতন ঘটানো হইল। অতঃপর মালিক ফিরোজ খান নুন মন্ত্রিসভা গঠন করিলেন। সোহরাওয়ার্দীর দল তাঁহার প্রতি সমর্থন জোগাইয়া যখন নয়া মন্ত্রিসভাকে দিয়া সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করাইলেন, তখন কুচক্রীদের চক্রান্ত চরমে পৌঁছিল। নেপথ্যে বসিয়া সুচতুর উপায়ে কুচক্রীর দল পূর্ব পাকিস্তানকে লক্ষ্য করিয়া তৃণ নিক্ষেপ করিলেন। সে তৃণে পূর্ব পাকিস্তান ঘায়েল হইল।

প্রাদেশিক পরিষদের এক অপ্রীতিকর ঘটনার মধ্য দিয়া ডেপুটি স্পিকার জনাব শাহেদ আলী মৃত্যুবরণ করিলেন। আইন অনুযায়ী ঘটনার কিনারা করিবার ব্যবস্থা হইল। তৎসত্ত্বেও প্রাদেশিক পরিষদের সেই ঘটনাটিকে অজুহাত করিয়া দেশে সামরিক শাসন জারি হইল। মামলা তুলিয়া লওয়া হইল; শাহেদ আলী হত্যার আর বিচার হইল না। ১৯৫৪ সালের এক সন্ধিক্ষণে শহীদ সোহরাওয়ার্দী দেশে সামরিক শাসন জারির যে আশঙ্কা প্রকাশ করিয়া সমালোচনার সম্মুখীন হইয়াছিলেন, চার বছর না-যাইতেই সে আশঙ্কাই বাস্তবে রূপায়িত হইল। নেপথ্যে বসিয়া পাকিস্তানের রাজনীতিতে ব্যক্তিবিশেষ* যে কলকাঠি ঘুরাইতেন, এতদিনে তাহা সপ্রকাশ হইল। এমনকি পরবর্তী পর্যায়ে নেপথ্যের সেই সুচতুর মানুষটি প্রকাশ্যে আসিয়া স্বীকারও করিলেন যে, ১৯৫৪ সাল হইতেই তিনি পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ছক কাটিয়া আসিতেছিলেন। শেষোক্ত ক্ষমতাধর পুরুষটি দীর্ঘ ১০ বৎসর যাবৎ দেশের ১২ কোটি মানুষের অধিকার ছিনাইয়া লইয়া দেশবাসীর ওপর নিজ খেয়ালখুশির যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাইয়া গেলেন, তাহা কাহারও অজানা নয়, বরং ১২ কোটি মানুষের স্মৃতিপটে আজও তা সমানে ভাস্বর।

* ব্যক্তিবিশেষ : জেনারেল আইয়ুব খান

লেখক: সিরাজুদ্দীন হোসেন নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক আগস্ট ২৭, ১৯৬৯

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত