কথায় বলে, সে রাম নেই, সে অযোধ্যাও নেই। দিল্লির রাজপাটে এখনো অরবিন্দ কেজরিওয়াল আছেন বটে, কিন্তু নামকাওয়াস্তে। ধারে-ভারে, ভাবমূর্তিতে পুরনো দিনের কেজরিওয়ালকে খুঁজে পাওয়া দুঃস্বপ্ন। পাঁচ বছরের জন্য কারা বসতে চলেছে। বিজেপি না অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি? এ লেখা যখন আপনি পড়ছেন, ততক্ষণে জেনে গেছেন কে বসছেন দিল্লির মসনদে। এমন একটিও সমীক্ষার ফলাফল পাওয়া যায়নি, যাতে বলা হয়েছে গত দুবছরের মতো এবারও হাসতে হাসতে কুর্সিতে যাচ্ছে আম আদমি পার্টি। বরং সবাই নিশ্চিত ছিল যে, দিল্লির ক্ষমতা এবার বিজেপির হাতে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র। অবশেষে তাই হলো। সত্যি কথা বলতে গেলে, ভারতের নির্বাচনে সবসময় জনগণের রায় প্রতিফলিত হয়, তা মোটেও নয়। ভারতের গণতন্ত্র সম্পর্কে যেভাবে প্রোজেক্ট করা হয় তার সঙ্গে বাস্তবের সম্পর্ক খুবই ক্ষীণ। এ দেশের ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা’ বেঁচে থাকে বিপুল পরিমাণ অর্থলগ্নি, করপোরেট দাক্ষিণ্য, মিডিয়া ম্যাজিক, জাত বা ধর্মীয় তাস সঠিকভাবে খেলতে পারা, ইত্যাদি বহু বিষয়ের ওপর। আমি সেই অর্থে আপ বা অরবিন্দ কেজরিওয়াল অনুরাগী না। তবুও এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, একদা আন্না হাজারের ভাবশিষ্য, আইআইটি খড়গপুরের মেধাবী ছাত্র কেজরিওয়ালের রাজনৈতিক উত্থান উল্কার গতিতে, নাটকীয়ভাবে।
বিজেপি তখন নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে সবে সবে কেন্দ্রে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়েছে, ২০১৪ সাল। ভারতীয় রাজনীতি সম্পূর্ণ নতুন এক রাস্তায় চলতে শুরু করেছে। আপনি পছন্দ করুন অথবা না করুন, বিজেপির থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আরএসএসের সারা জীবনের আকাক্সক্ষা, ভারত হবে এক হিন্দুরাষ্ট্র তাও বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা জনমনে উঁকিঝুঁকি মারছে, দেয়ালে দেয়ালে লেখা হচ্ছে গরব সে বলো, হাম হিন্দু হ্যায়। লেখা হচ্ছে হিন্দি, হিন্দু হিন্দুস্তান, দেশে বামপন্থি শ্রমিক কৃষক রাজনীতি ছন্নছাড়া। ঠিক ওই কঠিন সময়েই অন্য এক বিকল্পের কথা বলে রাজনীতিতে ঝড়ো হাওয়া তুলে, লোকসভা ভোটের কিছুদিন বাদেই দিল্লি বিধানসভায় ধুয়ে মুছে বিজেপিকে নিশ্চিহ্ন করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বাজিমাত করল কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি।
নির্বাচনী সাফল্যের সঙ্গে করপোরেট পুঁজি, মাসলপাওয়ার, শাসক-শাসিত মিডিয়া এ রকম অজস্র বিষয় জড়িত থাকে। তার পাশাপাশি ভারতের ইলেকশন মানেই বিপুল আর্থিক লেনদেন, জাতপাতের হিসাব-নিকাশ, সাম্প্রদায়িক উসকানি যা কোনোটাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে যথাযথ নয়। এবার দিল্লি নির্বাচনে আড়াই দশক পরে কুর্সি দখলে মরিয়া বিজেপি যাবতীয় অস্ত্র প্রয়োগ করেছে। আপের ভোট ব্যাংকে ধস নামাতে সে শুধু হাজারো প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি শোনা যায়, আপকে ভেতর থেকে ভাঙতে কোটি কোটি টাকা ছড়িয়েছে। আপের একাধিক বিধায়ক ভোটের ঠিক আগে আগে, দল ছেড়ে দেওয়ার পেছনেও নাকি ছিল কোটি কোটি টাকার লেনদেন। আপের মূল ভোট ব্যাংক ঝুপড়ি বসতির গরিব মানুষ। মুসলিম ভোটের বড় অংশ মোটের ওপর ছিল আপের কুক্ষিগত। ভোটের প্রথম দিকে যেটুকু খবর ছিল, তাতে পরিষ্কার যে, মুসলিম ভোট আপের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মজা হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের ভোট আপের থেকে সরে ফিরে গেছে তাদের চিরাচরিত পছন্দ, কংগ্রেসের দিকে। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে আপের গুরুত্ব ছিল মুসলিম দলিত ভোটের ভাগীদার হিসেবে। দিল্লির নির্বাচনে কংগ্রেস একটি সিট না পেলেও মুসলিম দলিত ভোটের সিংহভাগ নিজেদের বাক্সে টেনে আপকে বড় পরিসরে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলার কাজটি কিন্তু শুরু করে দিল। ফলে ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্ব নিয়ে কংগ্রেসের দাবি নতুনভাবে জোরালো হবেই। আপ বিকল্প রাজনীতির স্লোগান তুলে উল্কার গতিতে বিজেপির মতো মহাশক্তিধর দলকে কোণঠাসা করে প্রথমবার যেভাবে ক্ষমতায় এসেছিল তা নিঃসন্দেহে এদেশের রাজনীতিতে ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা। দিল্লির শাসনক্ষমতা কেজরিওয়ালের হাতে থাকলেও আসল চাবিটি ছিল অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। দিল্লি পুলিশ পুরোপুরি অমিত শাহ নিয়ন্ত্রণাধীন। বিজেপি কখনো আপকে স্বস্তিতে রাজত্ব করতে দেয়নি। সবসময় বিরক্ত করে গেছে। কখনো আপ নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে, কখনো তাদের জেলে ঢুকিয়ে, আবার কখনো জনগণের কাছে আপ নেতাদের নামে ‘কলঙ্ক’ রটিয়ে।
ক্ষমতায় এসে নিঃসন্দেহে আপ সরকার বেশ কিছু ইতিবাচক কাজ করেছিল। যা দিল্লিবাসীদের সুরাহা দিয়েছিল অনেক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইতিবাচক কাজ আপ করেছিল। এক, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রুগ্্ণ অবস্থা থেকে নীরোগ অবস্থায় ফিরিয়ে রাতারাতি সারা ভারতে সুধী সমাজের বাহবা কুড়িয়েছিল। দুই, ঝুগগি বস্তির গরিব জনতার জন্য বিদ্যুৎ বিলের কর মওকুব করা ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ইউনিট পিছু বিলের অঙ্ক উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে দেওয়া। কিন্তু ধর্মীয় মেরুকরণ, বিপুল পরিমাণ অর্থলগ্নি এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বিজেপি এবার যে ঝড় তুলেছিল, তাতে পপুলিজম পলিটিক্স কোনো রাজ্যেই বেশি দিন কায়েম থাকতে পারে না। ফলে আপকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বরং বিজেপির সর্বশক্তি দিয়ে লড়াইয়ের বিপক্ষে আপের হার না মানা লড়াই নিশ্চিত কুর্নিশযোগ্য। তবে প্রথম প্রথম যে আপ ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক, পরবর্তী সময় সেও ধীরে ধীরে মনুবাদী রাজনীতিতে, যা বিজেপির একান্ত নিজস্ব ট্রাম্পকার্ড, তার প্রতি ঝুঁকে পড়ে দলিত সংখ্যালঘুদের আস্থা খুইয়ে নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনল। ২৭ বছর পর দিল্লির মসনদে বসতে যাচ্ছে বিজেপি। দিল্লির নির্বাচন আরও প্রমাণ করল যে উগ্র জাতীয়তাবাদী, দক্ষিণপন্থি রাজনীতিকে পর্যুদস্ত করতে হলে বিরোধী ঐক্য একান্ত জরুরি। কংগ্রেস-আপ পরস্পরকে টেক্কা দিতে গিয়ে বিজেপির রাজনীতিকে চ্যাম্পিয়ন করে দিল। এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের পেছনে কংগ্রেসের ভূমিকা যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি দায় আপ নেতৃত্বের। বিজেপিবিরোধী রাজনীতিতে কংগ্রেস প্রধান নেতা। এই সত্য মানতে অনেকেই অদ্ভুত যুক্তিতে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যত বিষোদগার করে, তাতে সন্দেহ হয় তাদের সঙ্গে বিজেপির কোথাও যেন অদৃশ্য বোঝাপড়া আছে।
কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যে অভিযোগই উঠুক না কেন, কংগ্রেস জোট ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রতিনিধির তা স্বীকার না করা মূর্খামি। দিল্লির নির্বাচনী রাজনীতিতে ভরাডুবি হলেও একটা ইতিবাচক ঘটনা সন্দেহাতীতভাবে, কংগ্রেসের দিকে মুসলিম দলিতদের ফিরে আসা। মুসলমানদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, আপ ভোটের প্রয়োজন হলে ধর্মনিরপেক্ষ। আসলে সেও ছদ্ম সেক্যুলার। আগামী দিনে তৃণমূল কংগ্রেস সম্পর্কেও এই প্রশ্ন জোরালোভাবে উঠবে। বিজেপি ফেডারেল কাঠামোর বিরুদ্ধে। ফলে তার জয় একমাত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার পক্ষে জনতার রায় এই প্রোপাগান্ডা বাড়বে। কেন্দ্র-রাজ্যের টানাপড়েন আরও বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু মনুবাদী চিন্তা সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে ভারতের রাজনীতিতে। দিল্লির জয় আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে বিজেপিকে। ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে এই জয় নরেন্দ্র মোদিকে আরও অক্সিজেন জোগাবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে চাপে রাখবে এই জয়। কিন্তু জোট নিরপেক্ষ যে রাজনীতি ছিল ভারতের ইউএসপি, তা ক্রমশই হয়ে উঠবে ‘আভিধানিক’ শব্দ মাত্র।
এবারের ভোটে, অনেকে বলছেন সবচেয়ে বড় ঘটনা মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়ালের পরাজয়। আমি তা মনে করি না। ধস নামলে সব জায়গায় এ রকম হেভিওয়েট প্রার্থী হেরে যান। মূল সমস্যা বিজেপির এগিয়ে দেওয়া পায়ে পা ঢোকালে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। এটাই এবারের নির্বাচনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। আরএসএসের গেম প্ল্যান মূলত হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির শক্তি বৃদ্ধি। তা সে তার ঘোষিত মিত্র বিজেপি হোক বা ছদ্ম শত্রু কেজরিওয়াল বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হোন, তাতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কিছু যায়-আসে না। সেক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভোট বৃদ্ধি আশা জোগায়। এবার ভোটে বাংলাদেশ একটা বড় ইস্যু ছিল। পড়শি দেশের ছবি দেখিয়ে হিন্দু ভোট সংহত করা বিজেপির পক্ষে সহজ হয়ে যায়। এখন আত্মবিশ্বাসী বিজেপি বাংলাদেশি ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে সোচ্চার হবে। সব মিলিয়ে দিল্লির নির্বাচন একাধিক সমস্যার জন্ম দেবে। এমনিতেই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তারপর বিজেপির এই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা মনুবাদী রাজনীতির পালে জোয়ার আনবে। বাংলাদেশের অস্থিরতার সঙ্গে বিজেপির দিল্লি জয়ের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা তা এখনই বলা না গেলেও দুই দেশেই মৌলবাদ মাথা চাড়া দিলে যে বিপদ বাড়বে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা যারা উগ্র দক্ষিণপন্থি রাজনীতির বিরোধী তাদের পক্ষে কংগ্রেসের দিকে তাকিয়ে ছাড়া বাদ দিয়ে আর কোনো বিকল্প পথ এই মুহূর্তে দেখছি না।
কংগ্রেসকে মনে রাখতে হবে যে, নতুন যুগের রাজনীতি শুধু বাণী দিয়ে বা নেহরু, ইন্দিরা গান্ধীর পথের অন্ধ অনুসরণ করলেই চলবে না, তাকে যুগোপযোগী, আধুনিক হতে হবে। মনুবাদী রাজনীতির বিকল্প হিসেবে জোরের সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকে সামনে আনতে হবে। আঞ্চলিক দলগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া মসৃণ করতে অহংবোধ বিসর্জন দিতে না পারলে যথার্থ নেতা হতে পারা অসম্ভব। দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘুদের সত্যিকারের বন্ধু হতে না পারলে মনুবাদকে হঠানো কঠিন, বড্ড কঠিন। দিল্লির নির্বাচনী ফলাফল অনেক দিক দিয়ে অশনিসংকেত হলেও আমি হতাশের দলে নেই। এ বড় দীর্ঘ পথ। দীর্ঘ লড়াই। আর কে না জানে রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। ধ্বংসাবশেষ থেকেই জন্ম নেয় নতুন এক পৃথিবী। তবে কংগ্রেসের সমস্যা হচ্ছে তাদের সংগঠনের ভিত বড় দুর্বল। গোষ্ঠী কোন্দলে জেরবার সংগঠনকে চাঙা করার মতো নেতা এই মুহূর্তে শতাব্দী প্রাচীন দলটির নেই। রাহুল বা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এখন আগের তুলনায় পরিণত, এটা ঠিক। কিন্তু তাদের তো আর শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর মতো ক্যারিশমেটিক ব্যক্তিত্ব নেই যে, শক্তিশালী বিজেপিকে ভারতের রাজনীতি থেকে পুরোপুরি উৎখাত করবে।
লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও কলাম লেখক
