জয়ে রাঙা হোক হামজার অভিষেক

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৫, ১২:১১ পিএম

রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা উপন্যাসের প্রধান চরিত্র অমিত রায়ের সঙ্গে আবার হামজা চৌধুরীকে মেলাতে যাবেন না। শিলং পাহাড়ে বেড়াতে এসে এক মোটর দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে বিলেত ফেরত তুখোড় তরুণ অমিত পেয়েছিলেন লাবণ্যের দেখা। সেই পরিচয় এক সময় গড়ায় প্রণয়ে। তবে দুই আত্মার এক হওয়ার আগেই কালো মেঘ নেমে আসে অমিত-লাবণ্যের জীবনে। ভেঙে যায় পরিণয়ের সব আয়োজন। অমিত বুঝতে পারেন, লাবণ্য দীঘির জল; যা ঘরে তোলা যায় না, দীঘিতেই রাখতে হয়। ভাঙা মন নিয়ে তাই অমিতকে ফিরতে হয় কঠোর বাস্তবতায়।

হামজাও সুদূর বিলেত থেকে এ জনপদে পা রেখেছেন হাজারো হৃদয় জয়ের বাসনায়। সেটা করতে শেষের কবিতার ট্র্যাজিক নায়কের মতো হলে চলবে না। হামজাকে আজ হতে হবে এক দিগি¦জয়ী সেনাপতি। সদলবলে তাকে বিস্ফোরিত হতে হবে জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে। যে বিস্ফোরণে স্বাগতিক ভারতকে ছারখার করে মাথা উঁচু করে ফিরতে হবে দেশে।

২০২৭ সালে সৌদি আরবে হতে যাওয়া এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের চূড়ান্ত পর্বের ‘সি’ গ্রুপে ভারত ফেভারিট। আর আছে সিঙ্গাপুর, হংকং এবং তলানিতে বাংলাদেশ। র‌্যাংকিংয়ে ৫৯ ধাপ এগিয়ে থাকা ভারতকে ২২ বছর হয় হারাতে পারেনি বাংলাদেশ। ২২ বছরে অবশ্য একজনও মহাতারকার দেখা মেলেনি নদীবিধৌত ব-দ্বীপে। এবার মিলেছে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ তারকা হামজার অভিষেক হতে যাচ্ছে আজ। আর শুরুতেই প্রতিপক্ষ দক্ষিণ এশিয়ার তর্কাতীত সেরা ভারত। অবসর ভেঙে সুনীল ছেত্রী ফিরলেও এই ভারতকে ঠিক সর্বজয়ী ঠেকছে না। তাই শুরুটা জয়ের বর্ণিল রঙে রাঙানোর দারুণ সুযোগ ২৭ বছরের মিডফিল্ডারের।

শিলংয়ে বিকেল গড়াতেই ঠান্ডা নামে। ব্যস্ত শহর ঢেকে যায় কুয়াশার চাদরে। চার দিকের পাহাড়গুলো চলে যায় দৃষ্টিসীমার বাইরে। তবে শিলংয়ের মঙ্গলবার সন্ধ্যাটা হবে অন্যরকম। শীতল সন্ধ্যায় ছড়াবে ফুটবলের উত্তাপ। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের দুই ফুটবলপ্রিয় দলের লড়াইয়ের সাক্ষী হতে আগ্রহীর কমতি নেই। জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ থাকবে, টিকিট ফুরিয়ে যাওয়ার খবরে তা পরিষ্কার। এই ম্যাচ কেবল মেঘালয় নয়, উত্তাপ ছড়াচ্ছে পাশের রাজ্য আসামেও। বাংলাদেশের সীমানাঘেঁষা বলেই দুই রাজ্যে বৈধ-অবৈধ অনেক বাংলাদেশির বাস। হামজার কথাটা জেনে গেছেন তারাও। গ্যালারিতে তাই কিছু ভক্ত-সমর্থকের আশা করতেই পারে বাংলাদেশ।

র‌্যাংকিংয়ের হিসাবে ১৮৫তম বাংলাদেশ এই গ্রুপের তলানির দল। ১২৬-এর ভারত সবার ওপরে। প্রতি গ্রুপ থেকে কেবল সেরা দলটাই যাবে চূড়ান্ত পর্বে, ভারতের জন্য এটা তাই অনেক পাওয়ার ম্যাচ। আবার একই কারণে এই ম্যাচে আছে সম্ভ্রমহানির শঙ্কাও। ইগর স্টিমাচ অধ্যায় শেষে গত জুলাই থেকে ভারতের দায়িত্বে স্প্যানিশ মানোলো মার্কেজ। শুরুটা একেবারেই ভালো হয়নি মধ্যবয়সী কোচের। ডাগআউট থেকে টানা পাঁচ ম্যাচ জয়শূন্য থাকতে দেখেছেন দলকে। বাধ্য হয়েই চল্লিশের সুনীল ছেত্রীকে অবসর থেকে ফিরে আসার অনুরোধ জানান। দলের দুর্দশার কথা ভেবে মন পরিবর্তন করে ফিরেছেন ৯৫ গোলে বিশ্বের চতুর্থ সর্বাধিক গোলদাতা। ফিরেই ঘুরিয়েছেন দলের ভাগ্যের চাকা। ১৯ মার্চ শিলংয়ে প্রীতি ম্যাচে ভারত মালদ্বীপকে হারিয়েছে ৩-০ ব্যবধানে। এরপরও যখন প্রাক-ম্যাচ সংবাদ সম্মেলনে ভারতের দুর্দশার কথা শুনতে হলো, তখন খানিকটা বিরক্তই হলেন মানোলো। স্বর কঠিন করে জবাবটা যা দিলেন তাতে বাংলাদেশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরাকে নড়েচড়ে বসতেই হচ্ছে, ‘আমি জানি না কেন আমাকে এই প্রশ্ন এখন শুনতে হবে। আমি নিশ্চিত নই, প্রায় ৪০০ দিনের বেশি সময় পর আমরা একটা জয় পেয়েছি (মালদ্বীপের বিপক্ষে)। তারপরও আপনি আমাকে এই প্রশ্ন করছেন। আমার ধারণা চূড়ান্তভাবে এই প্রশ্নটাকে আমরা বন্ধ করতে পারব, যখন আপনারাই বলবেন, যাক, তাহলে পরপর দুই ম্যাচ আপনার দল জিততে পেরেছে! সাফ কথা হলো দুদলে ১১জন করে খেলোয়াড় খেলবে। যারা পরিকল্পনার পুরোটা বাস্তবায়ন করবে ফল তাদের দিকেই যাবে। বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি একজন কোচের অধীনে ভালো করে পরিণত হয়েছে। তাদের একজন গ্রেট খেলোয়াড়ও আছে। তারপরও আমি মনে করি এই ম্যাচটা আমরাই জিতব।’ এক জয়ে ঘোচেনি। এ কথাতেই পরিষ্কার, দুর্নাম ঘোচাতে কতটা মুখিয়ে মানোলো।

গেল ২২ বছরে বাংলাদেশের দায়িত্ব নেওয়া দেশি-বিদেশি অনেক কোচকেই শুনতে হয়েছে এমন ধারার প্রশ্ন। কবে ভারতকে হারানো যাবে? কাবরেরার কাছেও গেছে এ রকম প্রশ্ন। অন্য সবার মতো আশার কথাই শুনিয়েছেন স্প্যানিশ কোচ। এটা নিশ্চিত হামজাকে কেন্দ্র করেই তিনি সাজাবেন রণকৌশল। তবে এক হামজায় ভারতকে হারানো তার কাছে অসম্ভব। সেজন্য ঝাঁপাতে হবে গোটা দলকে। বাংলাদেশের হামজা আর ভারতের সুনীলকে নিয়ে প্রশ্ন পেয়ে কাবরেরা বলেন, ‘আমার মনে হয় হামজার যোগদান আর সুনীলের ফিরে আসায় এ ম্যাচ ভীষণ রোমাঞ্চকর হতে চলেছে। তবে এটা নিশ্চিতভাবে শুধু তাদের কারণেই হবে না। আমরা যদি আগামীকাল (আজ) জিতি, তবে সেটা শুধু হামজার জন্য হবে না। হামজা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য ভালো। সুনীলের ফিরে আসাও ভারতকে শক্তিশালী করেছে। যেই জিতুক, সেটা দলের জন্যই হবে। ভারতের প্রতি, মানোলো এবং তার স্টাফদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, সত্যিই মনে করি আমরা কালকের জন্য প্রস্তুত।’

কাবরেরা শতভাগ প্রস্তুত থাকার দাবি জানালেও প্রশ্ন থেকেই যায়। লিগ বন্ধ করে ঢাকা, সৌদি আরব ও শিলংয়ে চলেছে তার প্রস্তুতি। তবে খেলা হয়নি বলার মতো কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ। শিলং আসার পর কিছু ঝক্কি-ঝামেলাও সামলাতে হয়েছে। প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে না পারার বিষয়টা তার হাতে নেই জানালেন তিনি। তবে ভারতের শেষ চার দিনের তেতো অভিজ্ঞতাগুলো কোনো অজুহাত হিসেবে দাঁড় না করিয়ে তিনি চাচ্ছেন মনোযোগটা পুরোপুরি ম্যাচে দিতে। সিনিয়র দলের কোচ হিসেবে ভারতের বিপক্ষে কাবরেরারও এটা প্রথম ম্যাচ। তবে এশিয়ান গেমসে ভারতকে ডাগআউট থেকে দেখার অভিজ্ঞতা আছে তার। তাই হামজার মতো কাবরেরাও চান ভারতের বিপক্ষে শুরুটা জয়ে রাঙাতে।

সংবাদ সম্মেলনে কাবরেরা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন জামাল ভূঁইয়াকে। নিয়মিত অধিনায়ক অবশ্য ফুটবলে এখন বেশ অনিয়মিত। সুবাদে একাদশে জায়গা পাওয়াটা নিশ্চিত নয় তার। তারপরও ভারতকে হারানোর মূল লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। ভারতকে বড় ভাই উপাধি দিয়ে জামাল বলেন, ‘আপনি যখন আপনার বড় ভাইয়ের সঙ্গে খেলেন, আপনি সবসময় জিততে চান। আমরাও সেইম। আমরা ভারতের বিপক্ষে জিততে চাই। চাপ তো আছেই। সব ম্যাচেই চাপ থাকে। তবে এই ম্যাচ নিয়ে আমরা একটু বেশিই মনোযোগী। কারণ প্রতিপক্ষ ভারত। আর আপনারা জানেন কী হয়েছে শেষ এক বছর। আমরা চাপ অনুভব করছি, একই সঙ্গে ধীরস্থিরও আছি।’

দলের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পর থেকে হামজাকে আগলেই রাখছেন কাবরেরা। মিডিয়ার সামনে আসতে দিচ্ছেন না। ফলে দলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া হলো কি না, এ নিয়ে তার ব্যাখ্যাটা অজানাই থেকে যাচ্ছে। আজ মাঠেই বোঝা যাবে হামজা কতটা শক্তিশালী করে তুলতে পেরেছেন দলকে। সত্যিই কি ভারতকে হারানোর মতো দল এখন বাংলাদেশ? সেটা সময়ই বলবে। আর জয়ের বিকল্প নেই বলেই ভারত তাকিয়ে তাদের প্রাণভোমরা সুনীলের দিকে। ঘরোর ফুটবলের ফর্মটা নিল জার্সিতে ফিরিয়ে আনতে পারলে হামজার বাংলাদেশের অপেক্ষাটা বাড়তেই পারে। এই সুনীল যে বারবার হন্তারক হয়ে বাংলাদেশের মুঠো থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন জয়। শেষবার ২০২১ সালে দোহাতে ২-০ গোলের জয়ের দুটোই করেছেন তিনি। অবসর ভেঙে ফেরার ম্যাচেও গোল পেয়েছেন। তাই ভারতকে হারাতে হামজাসহ সবার সেরাটা আদায়ের পাশাপাশি সুনীলকে থামানোর চ্যালেঞ্জও নিতে হবে কাবরেরাকে।

হামজা যুক্তরাজ্য থেকে আসার পর থেকেই হাসছেন, হাসাচ্ছেনও। সেই হাসিটা অটুট রাখতে হামজাকে জ্বলতে হবে সবাইকে নিয়ে, তবেই ঘুচতে পারে ২২ বছরের আক্ষেপ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত