ঘাম ঝরানো প্রতিজ্ঞায় প্রতি ভোরে শুরু হয় তাসকিনের প্রত্যাবর্তনের মিশন

আপডেট : ২৮ মে ২০২৫, ০১:৫৬ পিএম

সকাল সাড়ে সাতটা। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম তখনো ঘুম ভাঙাতে ব্যস্ত। একে একে ঢুকছেন নিরাপত্তাকর্মীরা, মাঠের প্রাণ তখনো জাগেনি। কিন্তু এরই মধ্যে হাজির হয়ে গেছেন তাসকিন আহমেদ। সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ফিটনেস ট্রেনার নাথান কিলি এবং বিসিবির ইয়াকুব ডালিম।

প্রথম গন্তব্য—বিসিবির জিম। সেখানে প্রায় চল্লিশ মিনিট চলে পুনর্বাসন সেশন। নাথান ও ডালিমের নজরদারিতে প্রতিটি ব্যায়াম, প্রতিটি টান যেন একেকটি পরীক্ষা। এরপর সরাসরি ইনডোর নেটে। ধীরে শুরু, এরপর বাড়তে থাকে বোলিংয়ের গতি ও তীব্রতা।

ততক্ষণে মাঠের ওপর চেপে বসেছে গ্রীষ্মের চড়া রোদ। মে মাসের ঢাকায় যা স্বাভাবিক, কিন্তু নাথান কিলির অনুশীলনের তুলনায় তা কিছুই নয়। খেলোয়াড়দের সীমানার শেষপ্রান্ত পর্যন্ত ঠেলে দেন যিনি—তাসকিনের জন্যও দিনটি তার ব্যতিক্রম ছিল না।

নেট সেশনের পর মাঠের মাঝখানে শুরু হয় কঠোর ফিটনেস ড্রিল—দৌড়, স্ট্রেংথ ও রিহ্যাব মিলিয়ে ধাপে ধাপে সাজানো পরিশ্রমের অনুশীলন। যে কোনো ধাপে ব্যর্থতা মানেই ‘শাস্তি’। আর নাথানের শাস্তি মানে আরও বেশি ঘাম ঝরানো। দুর্ভাগ্যবশত, সেদিন সেটিই জুটেছিল তাসকিনের কপালে।

শেষে ক্লান্ত শরীরে একটুখানি হাসি নিয়ে বললেন, 'দেখেছেন, নাথান আমার সঙ্গে কী করল?' — তবে ক্লান্তির ভেতরেও ছিল কৃতজ্ঞতার আভাস, 'ও খুব ভালো। গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আমি ওর জন্যই খেলতে পেরেছিলাম।'

ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে চোট পেয়েছিলেন অ্যাকিলিস টেন্ডনে। সেই চোট কাটিয়ে ওঠার লড়াই এখনো চলছে। সামনে শ্রীলঙ্কা সফর—টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি—তিন ফরম্যাটেই ফেরার লক্ষ্য তার।

২০২৪ সালটি যেন তাসকিনের ক্যারিয়ারের নতুন সংজ্ঞা। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক বছরে ৬৩ উইকেট—যা তাঁর ক্যারিয়ারের মোট উইকেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। অভিষেকের এক দশক পেরিয়ে এসে এমন একটি বছর, যা তিনি গর্ব করে মনে রাখবেন।

২০১৪ সালের অভিষেকের পর ২০১৮ ছিল হয়তো সবচেয়ে হতাশাজনক। কিন্তু ২০২১ থেকে শুরু হয় নতুন পথচলা—ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলা। আর ২০২৪? সেটি যেন পুরোদস্তুর ঘুরে দাঁড়ানোর বছর।

এই সাফল্যের স্বীকৃতিও এসেছে বিসিবি’র কাছ থেকে—২০২৫ সালের জন্য একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে পেয়েছেন ‘এ-প্লাস’ কেন্দ্রীয় চুক্তি।

তবুও চোট যেন তার জীবনের চিরন্তন সঙ্গী। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে শেষবার খেলেছেন, সেটিও চোট নিয়েই। এরপর থেকে জাতীয় দলের বাইরে। তবে এখন আবার ছন্দে ফেরার প্রস্তুতি।

'আমার একটাই প্রেরণা—দেশের জন্য উইকেট নেওয়া, দেশের হয়ে ম্যাচ জেতানো,' বলেন তাসকিন। 'না হলে কে সকাল সকাল এসে এতটা কষ্ট করে?'

মাত্র কয়েক বছর আগেও হাঁটুর চোটে টেস্ট ক্রিকেট থেকে ছিটকে পড়ার ভয় ছিল। আজ তিনি টেস্টে ৫০ উইকেটের দোরগোড়ায়। সামনে তাকিয়ে আছেন আরও বড় স্বপ্নের দিকে—প্রথম বাংলাদেশি পেসার হিসেবে ১০০ টেস্ট উইকেট, আর ৫০০ আন্তর্জাতিক উইকেটের মাইলফলক ছোঁয়ার লক্ষ্য।

'আমি আবার তিন ফরম্যাটেই খেলতে চাই। সব কিছু নির্ভর করছে শরীরের প্রতিক্রিয়ার ওপর। শ্রীলঙ্কা সিরিজের আগে কিছু দিন সময় আছে। চেষ্টা করছি। শুধু দোয়া করবেন।'

প্রতিদিনের সকাল শুরু হচ্ছে ভোরে, শেষ হচ্ছে ক্লান্ত শরীরে। কিন্তু তাসকিন জানেন, এই কষ্ট বৃথা যাবে না। আরেকটি উইকেট, আরেকটি জয়—এই স্বপ্নই তাঁকে টেনে আনে বারবার। তাসকিনের গল্প কেবল এক পেসারের ফিটনেস লড়াই নয়, এটি এক অবিচল হৃদয়ের সাহসী প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত