বাউফলে টানা বৃষ্টিতে কৃষি ও মৎস্য খাত বিপর্যস্ত

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৫, ০৩:৩৮ পিএম

পটুয়াখালীর বাউফলে টানা ৪ দিনের ভারী বর্ষণে উপজেলার কৃষি ও মৎস্য খাতে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। লাগাতার বৃষ্টির কারণে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে রোপা আমনের বীজতলা, আউশ ধানের খেত, মাছের ঘের ও সবজির জমি। হুমকির মুখে পড়েছে অনেক মুরগির খামারও।

বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত কৃষি খাত

উপজেলা কৃষি দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে ১ হাজার ২০২ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের বীজতলা প্রস্তুত করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৫৪০ হেক্টরই পানিতে ডুবে গেছে। রোপা আউশের আবাদ করা হয়েছিল ২ হাজার ৮২১ হেক্টরে, যার মধ্যে ৮৪৬ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছে। সবজির ২৫০ হেক্টরের মধ্যে ১৮৮ হেক্টরেই পানির ক্ষতির প্রভাব পড়েছে। একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৮ হেক্টর পানের বরজ, ১৭ হেক্টর কলা, ১০ হেক্টর পেপে। এছাড়া অনেক মাছের ঘের ও পুকুর তলিয়ে গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দুই শতাধিক মৎস্য খামারি।

মুরগির খামারে রোগবালাইয়ের আশঙ্কা

টানা বর্ষণে পানি ঢুকে যাওয়ায় মুরগির খামারগুলোতেও দেখা দিয়েছে সংকট। খামারিরা আশঙ্কা করছেন, বর্ষণ অব্যাহত থাকলে রোগবালাই ছড়িয়ে পড়তে পারে। দাসপাড়া ইউনিয়নের মৎস্যচাষি রিপন জানান, তাঁর তিন একরের মাছের ঘের ও মুরগির খামার বৃষ্টিতে হুমকির মুখে পড়েছে। কয়েকটি পুকুর তলিয়ে যাওয়ায় মাছ চলে যাওয়ার শঙ্কায় তিনি রাতজেগে ঘের পাহারা দিচ্ছেন এবং নিজ খরচে পুকুরপাড় উঁচু করছেন, জাল দিচ্ছেন মাছ রক্ষায়।

বীজতলা বিলীন, আমন বীজ সংকটের শঙ্কা

বাউফলের কৃষকেরা বলছেন, প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যে বীজতলা প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে এসব বীজতলার অর্ধেকের বেশি এখন নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকে বলছেন, এই হার আরও বাড়তে পারে। ফলে আমন ধানের বীজে সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছেন সবাই।

জলাবদ্ধতায় গ্রাম প্লাবিত, রাস্তা তলিয়ে বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ

বর্ষণে অন্তত ২০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। স্থানীয় খাল ও নদীর পানিপ্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় জোয়ারের উচ্চতাও ১–২ ফুট বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বেশ কিছু গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় কোথাও কোথাও ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় লোকজন সেচ্ছাশ্রমে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামতের চেষ্টা করছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন বলেন, “টানা বর্ষণে কৃষি খাতে অনেক ক্ষতি হয়েছে, বিশেষ করে বীজতলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি না কমলে সঠিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দেওয়া সম্ভব নয়। তবে বীজ সংকট তৈরি হতে পারে।”

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান ঝান্টা বলেন, “বৃষ্টি এখনও চলছে। ফলে ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখন বলা যাচ্ছে না। তবে অনেক মৎস্যচাষি ইতিমধ্যে ক্ষতির তথ্য জানাচ্ছেন।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম জানান, উপজেলার চরাঞ্চলের অন্তত আটটি ইউনিয়নের ধানক্ষেত, বীজতলা, সবজি ও মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টি থেমে গেলে ক্ষতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হবে এবং তখনই শুরু হবে ত্রাণ কার্যক্রম।

সার্বিকভাবে বলা যায়, বাউফলের কৃষক ও খামারিরা টানা বর্ষণে দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন। প্রশাসনের দাবি, বৃষ্টিপাত বন্ধ হলেই শুরু হবে প্রয়োজনীয় সহায়তা কার্যক্রম। তবে প্রকৃতির এই বৈরী আচরণ মোকাবিলায় কৃষকদের সহনশীলতা ও সরকারি উদ্যোগের সমন্বয় জরুরি হয়ে উঠেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত