দক্ষ জনশক্তির অভাব রূপপুরে

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:০৫ এএম

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের মূল নির্মাণকাজ শেষ। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও এগিয়েছে অনেকটা। এখন রাশিয়ানদের কাছ থেকে প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে বুঝে নেওয়া ও পরে কেন্দ্রটি পরিচালনায় দক্ষ জনবলের সংকট রয়েছে। প্রকল্পটি স্পর্শকাতর ও উচ্চ কারিগরি দক্ষতার। প্রকল্পটিতে নানা অব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণে অনিয়ম ও নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে শীর্ষ কর্মকর্তাদের অদক্ষতা এবং প্রকল্পের নানা অব্যবস্থাপনার বিষয়টি উঠেছে। সংস্থাটি বলেছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পরমাণু নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়াবলি গুরুতর ঝুঁকির সম্মুখীন হবে।

শুরুতে ২০২২ সালে কেন্দ্রটিতে জ্বালানি লোডিংয়ের কথা থাকলেও সময় পিছিয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারণ করা হয়। পরে আরেক দফা পিছিয়ে এ বছর জ¦ালানি লোডিংয়ের কথা বলা হলেও কবে নাগাদ হবে তা অনিশ্চিত। নির্মাণকাজের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান মো. মজিবুর রহমান এবং প্রকল্প পরিচালক মো. কবীর হোসেনকে একাধিকবার ফোন দিয়েও এবং তাদের দপ্তরে গিয়ে বক্তব্য জানা যায়নি।

আইএইএর পর্যবেক্ষণ : রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের কার্যক্রম পরিদর্শন করে নানা অসংগতির বিষয় তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বিশেষজ্ঞ দল। প্রকল্পের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও নানা অব্যবস্থাপনার কথাও এসেছে তাদের পর্যবেক্ষণে।

সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রটিতে পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত ব্যবস্থাপনা (আইএমএস) প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। মূল ঘাটতির মধ্যে রয়েছে ঝুঁকি মূল্যায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ক্রয় এবং সরবরাহশৃঙ্খল তদারকি প্রভৃতি। রয়েছে অসম্পূর্ণ, অসংগতিপূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ আইএমএস নথিপত্র। কিছু সাংগঠনিক প্রক্রিয়া তৈরি ও বাস্তবায়িত হয়নি। সব নিরাপত্তা কমিটি কার্যকর না নয়, তাদের ভূমিকা এবং দায়িত্ব পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত হয়নি। সামগ্রিক নিরাপত্তার বিষয়ে ব্যবস্থাপনার সচেতনতা সীমিত। অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও স্বাধীন মূল্যায়ন শুরু হয়নি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলোর দায়িত্ব প্ল্যান্ট ও ঠিকাদারদের মধ্যে বিভক্ত, অতিমাত্রায় ঠিকাদারদের ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। এসবই সুসংগঠিত ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার কার্যকর বাস্তবায়নকে দুর্বল করে দিয়েছে।

এ প্রকল্পে পারমাণবিক নিরাপত্তা কমিটিসহ যেসব নিরাপত্তা কমিটি থাকার কথা, তা নেই। যে কয়েকটি কমিটি আছে, তাদের কোনো বৈঠক হয়নি এবং কিছু কমিটির সদস্যরা তাদের কমিটির উদ্দেশ্য ও কার্যাবলি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না। বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তার কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও যথেষ্ট শক্তিশালী নয় বলে জানিয়েছে আইএইএ।

সংস্থাটি বলছে, কিছু প্ল্যান্ট ম্যানেজারের প্ল্যান্টের সামগ্রিক নিরাপত্তা বিষয়ে ধারণা খুবই অল্প। তাদের কেউ প্ল্যান্টের ‘ইনজুরি রেট’ সম্পর্কে জানাতে পারেননি। মানবসম্পদ সম্পর্কিত বিষয়গুলোর কার্যক্রম খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞ দলটির মতে, প্রকল্পটিতে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলি ও আকাক্সক্ষাগুলোকে সবসময় নির্ধারিত ও জোরালো করা হয়নি। অনেক ব্যবস্থাপনাবিষয়ক কার্যক্রম নিয়ে সেখানকার কর্মীদের ঠিকমতো জানানো বা শেখানো হয় না।

রিঅ্যাকটিভিটি ম্যানেজমেন্ট-সংক্রান্ত কাজের আগে উপযুক্ত রিঅ্যাকটিভিটি ব্রিফিংয়ের অনুপস্থিতি এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ চলাকালে (যেমন ফুল-স্কোপ সিমুলেটর, রিফুয়েলিং মেশিন মক-আপ বা মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ) মানবিক কর্মদক্ষতার নিয়মিত ও কঠোর প্রয়োগের অনুপস্থিতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেছে বিশেষজ্ঞ দলটি।

সংস্থাটি জানিয়েছে, প্রথম ও দ্বিতীয় সারির ব্যবস্থাপকদের তদারকি, পর্যবেক্ষণ এবং পরিচালন মানদন্ড ও অনুশীলনের কার্যকারিতা পরিমাপের ব্যবস্থা ও তার প্রয়োগ অনুপস্থিত। আইএইএ বলেছে, যথাযথ তদারকি এবং প্ল্যান্ট পরিচালনার মানদন্ড নিশ্চিত না করলে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্যারামিটারের যথেষ্ট সুরক্ষা মার্জিন ছাড়াই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালিত হতে পারে, যা কেন্দ্রটিকে নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলবে।

আইএইএর পর্যবেক্ষণ হলো, রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ এখনো পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচি প্রণয়ন করেনি। কেন্দ্রীয় কম্পিউটারভিত্তিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা সিস্টেম (সিএমএমএস), যা সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার (আইএমএস) সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, সেটিও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্ল্যান্টে অনুমোদিত রক্ষণাবেক্ষণ কর্ম নির্দেশনা না থাকায় কার্যক্রম পরিচালনায় নির্দেশনার ঘাটতি দেখা গেছে। রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম বহিরাগত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।

গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দক্ষ লোকের অভাব : এ প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দুটো পদ প্রকল্প পরিচালক ও চিফ সুপারিনটেনডেন্ট। মাঠপর্যায়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কাজ বুঝে নেওয়া ও ভবিষ্যতে কেন্দ্র পরিচলনার জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ কারিগরি বিষয়গুলোর দেখভালের দায়িত্ব চিফ সুপারিনটেন্টের। সেফটি, সিকিউরিটি দেখা এবং ডকুমেন্ট তৈরি ও অনুমোদনের কাজ করতে হয় তাকে। আর এ কাজগুলো ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তা দেখার পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ, আইএইএ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার দায়িত্ব প্রকল্প পরিচালকের। পদ দুটিতে যে দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে।

তিনজন জ্যেষ্ঠ এবং অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে গত ২৫ মে মো. কবীর হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক বাছাই তালিকাতেই তার নাম ছিল না।

সূত্রমতে, নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের জন্য তিন কর্মকর্তার জীবন বৃত্তান্ত চেয়ে গত ৭ মে পরমাণু শক্তি কমিশনকে চিঠি দেয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। এ তিনজনই রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পের উপপরিচালক, যাদের দুজন কমিশনের প্রধান প্রকৌশলী এবং একজন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। চিঠি পাওয়ার পর তিনজনের সঙ্গে কবীর হোসেনের নাম যুক্ত করে চারজনের তালিকা পাঠায় কমিশন। কবীর হোসেন কমিশনের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা। শেষ পর্যন্ত তাকেই নিয়োগ দেয় সরকার।

গত বছর আগস্টে কবীর হোসেনকে প্রকল্প থেকে সরিয়ে কমিশনে পাঠানো হয়। নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রশিক্ষণসংক্রান্ত নানা অনিয়মের অভিযোগে কবীর হোসেনকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে গুঞ্জন রয়েছে। কনিষ্ঠদের প্রশিক্ষণে পাঠিয়ে পরে জ্যেষ্ঠদের ওপর পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

পরিচয় গোপন রাখার শর্তে প্রকল্পের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, কারিগরি অনেক জটিল বিষয় রয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে। পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া এসব বিষয় ঠিকমতো সামলানো সম্ভব নয়। মানবসম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা রাতারাতি এসব রপ্ত করবেন কীভাবে? তাই ঠিকাদারদের কথায় সায় দিতে হয়। তাই হচ্ছে। ঠিকাদাররা যেভাবে বোঝাচ্ছে সেভাবেই চলছে। কখনো অন্য লোকের কথা শুনে কাজ করার চেষ্টা চলছে।

প্রকল্প পরিচালকের পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো চিফ সুপারিনটেনডেন্ট। যিনি পুরো প্রকল্পের কারিগরি বিষয়ের প্রধান। ওই পদেও একজন দক্ষ প্রকৌশলীকে সরিয়ে তার চেয়ে কনিষ্ঠ ও অনভিজ্ঞ মুশফিকা আহমেদ নামে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যিনি পদার্থবিজ্ঞান থেকে পাস করেছেন। অথচ কাজগুলো প্রকৌশল-সংক্রান্ত। তাছাড়া এ পদে কাজ করার যে অভিজ্ঞতা দরকার, তা নেই ওই কর্মকর্তার। তার চাকরির নিয়োগের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে গত ২৭ মে পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে রসাটম জানিয়েছে, মুশফিকাকে ওই পদে দায়িত্ব পালনের জন্য তাত্ত্বিক, ব্যবহারিক এবং অন্যান্য বিষয়ে অবশ্যই ১২ মাসের প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এরপরই তিনি চিফ সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

মুশফিকা ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে এনপিসিবিএলে ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগদান করেন। ওই পদে নিয়োগের শর্তে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি ন্যূনতম ৯ বছর বিদ্যুৎকেন্দ্রে অথবা একই ধরনের ক্ষেত্রে পরমাণুবিষয়ক কাজের অভিজ্ঞতা থাকার কথা উল্লেখ করা ছিল। এই ৯ বছরের মধ্যে রেডিয়েশন মনিটরিং অথবা রেডিওঅ্যাকটিভ হ্যান্ডলিংয়ে ন্যূনতম দুই বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু মুশফিকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডেল্টা হসপিটাল লিমিটেডে চাকরির অভিজ্ঞতা দেখিয়ে রূপপুর প্রকল্পে চাকরিতে যোগদান করেছেন। তিনি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের আত্মীয় হিসেবে পরিচিত। প্রকল্পটিতে মুশফিকার মতো আরও আটজন ডেপুটি চিফ সুপারিনটেনডেন্ট রয়েছেন, যাদের অনেকেই তার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ বলে জানা গেছে।

প্রকল্পের বিভিন্ন পদে দক্ষ জনবলের ঘাটতির পাশাপাশি অনেকের নিয়োগের বৈধতা ও পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শীর্ষ ও মধ্যমসারির বহু কর্মকর্তা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত পূরণ না করেই নিয়োগ পেয়েছেন। পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়াই চাকরি পেয়েছেন কেউ কেউ। এসব অনিয়ম বেশি হয়েছে ২০১৯ ও ২০২১ সালে, যখন মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন বর্তমান প্রকল্প পরিচালক কবির হোসেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো উচ্চ কারিগরি ও স্পর্শকাতর প্রকল্পে অবশ্যই অভিজ্ঞ এবং দক্ষ প্রকৌশলী দরকার। কারণ রাশিয়ার কাছ থেকে কেন্দ্রের বিভিন্ন যন্ত্রপাতির মান এবং সেফটি, সিকিউরিটি ও সেফগার্ডের বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝে নেওয়া তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। দক্ষ জনবল নিয়োগ দেওয়া না হলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পটি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞ ও স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে এ প্রকল্পের কিছুই করা হয়নি। সেখানে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করছে। তৈরি হয়েছে বৈষম্য। কর্মীদের অনেক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত