আজ ১০ ডিসেম্বর। গৌরবময় এই দিনে ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত হয় মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা। দীর্ঘ ৯ মাসের নির্যাতন, গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাটের অবসান ঘটিয়ে এই দিনেই গজারিয়ায় উড়ে স্বাধীনতার পতাকা।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ১৯৭১ সালের মে মাসে পাকবাহিনী নৌপথ ও স্থলপথে গজারিয়া এলাকায় প্রবেশ করে হামলা চালায়। নৌপথে যাতায়াত জটিল হওয়ায় তারা কৌশলগত ভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে যুদ্ধের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেয়। পাকিস্তানি সামরিক ভাষায় ‘মেইন সাপ্লাই রোড’ (এমএসআর) খ্যাত এই মহাসড়ক দিয়েই চট্টগ্রাম বন্দর থেকে হানাদার বাহিনীর অস্ত্র ও রসদ সরবরাহ হতো।
পাকবাহিনী তৎকালীন মেঘনা ও বাউশিয়া ফেরিঘাটে প্রধান ক্যাম্প স্থাপন করে এবং মহাসড়কের প্রতিটি সেতু ও কালভার্টের পাশে ব্যাংকার নির্মাণ করে অবস্থান নেয়। এখান থেকে তারা রাজাকারদের সহযোগিতায় এলাকায় ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, লুটপাট ও বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ চালায়।
একাধিক মুক্তিযোদ্ধা জানান, ১৯৭১ সালের ৯ মে গজারিয়া থানার গজারিয়া ইউনিয়নের একাধিক গ্রামে পাকবাহিনী আক্রমণ শুরু করে। ওই দিন ফুলদী নদীর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে গণহত্যা অভিযান চালানো হয়। একই সময় মুন্সীগঞ্জে ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্টের মেজর আব্দুস সালামের নেতৃত্বে এলআইসি এলাকা দখলের চেষ্টা হলে শুরু হয় মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধ যুদ্ধ।
মুক্তিযুদ্ধে গজারিয়ার অনন্য অবদানের প্রধান কারণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। উপজেলার ওপর দিয়ে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক অতিক্রম করায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সড়কের ব্রিজ ও কালভার্ট গুলো ধ্বংস করে পাকবাহিনীর রসদ সরবরাহ বন্ধ করা। যখনই মুক্তিবাহিনী কোনো ব্রিজ ভেঙে দিত, তখনই হানাদার বাহিনী প্রতিশোধ হিসেবে গজারিয়ার মানুষজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত।
গজারিয়ায় পাকবাহিনীর ছিল ৩টি প্রধান ক্যাম্প ও ৪টি সেমি ক্যাম্প। মেঘনা ও গোমতী নদীর তীর এবং মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ঘিরে এসব ক্যাম্প স্থাপন করায় পুরো উপজেলাই পরিণত হয় নির্যাতনের জনপদে। তবে এই নির্যাতনের মাঝেই গজারিয়ার মানুষ পেয়েছে বীরত্বের ইতিহাস গড়ার সুযোগ।
বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) কমান্ডার একেএম নজরুল ইসলাম কিরণ, এফএফ কমান্ডার রফিকুল ইসলাম (বীর প্রতীক), বিএফ কমান্ডার আব্দুল খালেক আলো ও থানা কমান্ডার তানেস উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর ওপর একের পর এক চোরাগোপ্তা হামলা চালান।
৭ ডিসেম্বর থেকে পাকসেনাদের প্রতিটি ব্যাংকারে আক্রমণ শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় মহাসড়কের ভাটেরচর সেতু মাইনের বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিয়ে পাকবাহিনীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।
চূড়ান্ত লড়াই হয় ৯ ডিসেম্বর প্রত্যুষে। বাউশিয়া ফেরিঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল আক্রমণে পাকবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং জীবন বাঁচাতে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। কিছু পাকসেনা মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তাদের হত্যা করা হয়। এর মধ্য দিয়েই ১০ ডিসেম্বর গজারিয়া হানাদার মুক্ত হয়।
আজ হানাদার মুক্ত দিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হচ্ছে শহীদদের। একই সঙ্গে গর্বের সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে সেই সব বীর মুক্তিযোদ্ধাকে যাদের সাহস ও আত্মত্যাগে স্বাধীনতার আলোয় আলোকিত হয়েছিল গজারিয়া।
