ক্ষুধার দহনে রোজার শিক্ষা

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৫ এএম

দুপুরের তপ্ত রোদে যখন পিপাসায় বুক ফেটে যায়, তখন রোজাদার অনুভব করেন সেই চিরন্তন সত্যকে, যা সাধারণ সময়ে অবহেলিত থাকে। রমজান মাস মূলত একটি দর্পণ, যেখানে মানুষ তার নশ্বরতার প্রতিফলন দেখতে পায়। এই মাসটি আমাদের যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততাকে থামিয়ে দিয়ে একটু থমকে দাঁড়াতে বলে, যেন আমরা নিজেদের আত্মার খোরাক নিয়ে ভাবতে পারি। ক্ষুধার তীব্রতা যখন আমাদের পাকস্থলীতে আঘাত হানে, তখন সেটি কেবল শারীরিক কষ্ট থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে পৃথিবীর কোটি কোটি অনাহারী মানুষের আর্তনাদের প্রতিধ্বনি। এই দহন আমাদের শেখায়, বিলাসিতার আড়ালে ঢাকা পড়া মানুষের মৌলিক অধিকারের কথা।

পবিত্র রমজানের গুরুত্বপূর্ণ একটি লক্ষ্য হলো, অভাবগ্রস্ত ও ক্ষুধার্ত দরিদ্রদের কষ্ট উপলব্ধি করা। যে মুসলমান পেট পুরে খেলো, অথচ তার প্রতিবেশী দরিদ্র কেউ অনাহারে রইল, হাদিসে তাকে মুসলমান নয় বলেই উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়াও মহানবীর বক্তব্য অনুযায়ী রমজানের রোজার আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো, রোজার ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করে কেয়ামতের দিনের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা স্মরণ করা। পৃথিবীর এই জীবনের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্টের সঙ্গে কেয়ামতের দিনের ক্ষুধা-তৃষ্ণার কোনো তুলনা হয় না। সেদিনটি হবে অনেক বেশি দীর্ঘ ও অনেক বেশি গরম।

রোজা পালনকে আমরা যেন ভয় না পাই, সেজন্য মহান আল্লাহ বলেছেন, অতীতের জাতিগুলোর জন্যও রোজা ফরজ করা হয়েছিল। তাই রোজা কোনো নতুন বিষয় নয়। আর রোজার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো খোদাভীতি অর্জন, এটাও মহান আল্লাহ কোরআনে উল্লেখ করেছেন। তবে গ্যারান্টি দেননি, আল্লাহতায়ালা বলেছেন, রোজা রাখলে মুমিনরা সম্ভবত খোদাভীতি অর্জন করবে। এখানে সম্ভবত বলার কারণ হলো, প্রকৃত রোজাদার হওয়া অনেক কঠিন কাজ, সাধনাসাপেক্ষ বিষয়। সাধারণ মানের রোজা রাখলেই তাকওয়া বিষয়ে সদা-সচেতনতা অর্জন সম্ভব নয়। চোখসহ পঞ্চেন্দ্রিয়ের রোজা, মনের রোজা, এসব সাধনাসাপেক্ষ ব্যাপার। রোজা রেখে গিবত করা, হিংসা করা, কৃপণতা বজায় রাখা ইত্যাদি হারাম কাজ রোজার উদ্দেশ্যকে বানচাল করে দেয়। অনেকেই রোজা রেখে আসলে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট ভোগ ছাড়া আর কিছুই অর্জন করেন না বলে নবী কারিম (সা.) সতর্ক করে দিয়েছেন। রোজা পালনের সময় এসব বিষয় মাথায় রাখা দরকার।

তাকওয়া অর্জন এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ২৩৭ বার তাকওয়া শব্দ উল্লেখ করেছেন। তাকওয়া বলতে আমরা সাদামাটা অর্থে খোদাভীতির কথা উল্লেখ করে থাকি। কিন্তু তাকওয়ার সবচেয়ে ভালো বাংলা প্রতিশব্দ খোদা সচেতনতা হওয়া উচিত। কারণ মহান আল্লাহ যেমন দয়ালু ও ক্ষমাশীল তেমনি তিনি ন্যায়বিচারক এবং অন্যায়ের শাস্তিদাতাও বটে। তাই আমরা যেন আল্লাহর দয়া ও ক্ষমাশীলতার কথা ভেবে কাজেকর্মে অবিবেচক না হয়ে পড়ি। প্রতিটি কাজ ও আচরণের ক্ষেত্রে আল্লাহকে স্মরণ করা এবং আল্লাহ আমার এ কথায় ও কাজে সন্তুষ্ট হবেন কি না, তা ভেবে দেখা হলো তাকওয়ার দাবি। অন্য কথায়, তাকওয়া মানে আল্লাহকে ভয় করা, আবার তার দয়া ও ক্ষমার আশা রাখা। তাকওয়া অনেক বড় সম্পদ। কিন্তু ব্যাপক প্রচেষ্টা ও সাধনা ছাড়া এটা অর্জন করা যায় না। রোজা হচ্ছে, এই তাকওয়ার অনুশীলন।

তাকওয়ার অধিকারীর বৈশিষ্ট্য হলো, আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে জাকাত, সদকা ও নানা ধরনের দান-খয়রাত করা। এ জাতীয় লোকেরা রমজান মাসকে ভালো কাজ করার মৌসুম মনে করেন। তারা সমাজের অসহায়, হতদরিদ্র, দুর্বল, পীড়িত, অসুস্থ, অনাথ, ছিন্নমূল ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত নিরন্ন মানুষের খোঁজখবর রাখেন, প্রয়োজন অনুসারে তাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করেন, সাহরি-ইফতারের আয়োজন করেন, যথাসম্ভব সাধ্য অনুযায়ী পরোপকারে ব্যস্ত থাকেন। মাসব্যাপী রোজাদার ধনী লোকেরা গরিবের দুঃখ-কষ্ট এবং অনাহারের জ্বালা মর্মে মর্মে অনুভব করে সমাজের অসহায়, হতদরিদ্র ও দুস্থদের প্রতি অত্যন্ত সদয় আচরণ করেন। ফলে দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কশাঘাতে নিপতিত অনেক অনাহারী মানুষ ক্ষুধা-তৃষ্ণার অসহনীয় দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পান। প্রকৃত রোজাদার ও ইমানদাররা সবসময় বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষের প্রতি পারস্পরিক সহানুভূতি প্রকাশ করেন। চলতি রমজানেও যেন এটা অব্যাহত থাকে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত।

লেখক : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত