রাজধানীর হাতিরঝিলের পশ্চিম উলন এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের লিফটের ফাঁকা জায়গায় জমে থাকা পানি থেকে ৬ বছর বয়েসী এক কন্যাশিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শিশুর নাম তাহেদী আক্তার। মঙ্গলবার দিবাগত রাত ১টার দিকে ওই শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়।
স্বজন ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিপীড়নের পর শিশুটিকে হত্যা করে নির্মাণাধীন ভবনের লিফটের ফাঁকা জায়গায় লাশ ফেলে রাখা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় মামলা করতে গেলে প্রথমে পুলিশ গড়িমসি করে। পরে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী হাতিরঝিল থানা ঘেরাও করলে রাত ১১টার দিকে মামলা নিতে বাধ্য হয় পুলিশ। ভুক্তভোগী শিশুটির বাবাবাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছেন। এলাকাবাসীর আন্দোলনের মুখে নির্মাণাধীন বাড়ির দারোয়ানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়েছে।
পরিবার ও স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, শিশুটির বাবা লিটন মিয়া টেইলার্সের দোকানে কাজ করেন। তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার তিতাস উপজেলার আলীরগাঁও এলাকায়। শিশুটি স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণিতে পড়ত। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে ছোট ছিল।
শিশুটির চাচা স্বপন মিয়া বলেন, মঙ্গলবার সন্ধার পর পরিবারের সঙ্গে ইফতার করে রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাসার বাইরে গিয়ে খেলতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একপর্যায়ে রাত ১টার দিকে বাসার পাশের নির্মাণাধীন একটি তিনতলা ভবনের লিফটের ফাঁকা জায়গার পানিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাৎক্ষণিক তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে হাতিরঝিল থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হলে রাত পৌনে ৩টার দিকে শিশুটির লাশ ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায় তারা।
চাচা আরও বলেন, লিফটের পানি থেকে উদ্ধারের পর তাহেদীর মুখে বিস্কুটের গুঁড়া দেখা গেছে। যদি পানিতে পড়ে মারা গিয়ে থাকে, তাহলে তার পেট ভর্তি পানি থাকবে। অথচ তার পেটে কোন পানি নেই। এই মৃত্যু নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখা গেলেই বুঝা যাবে, সে একা বাসা থেকে বের হয়েছে নাকি কেউ তাকে নিয়ে হত্যা করে সেখানে লাশ ফেলে দিয়েছে।
চাচা আরও বলেন, বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে শিশুটির লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গ্রামের বাড়ি তিতাস উপজেলায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করার কথা ছিল। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সহযোগিতা না পেয়ে গ্রামের বাড়িতে লাশ দাফন করতে যাননি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, তার ভাতিজি মৃত্যুর ঘটনায় হাতিরঝিল থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ গড়িমশি করে। পরে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী রাত ৯টার দিকে থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করে। পরে রাত ১১টার দিকে মামলা নিতে বাধ্য হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাত ৯টার দিকে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী থানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করে। তারা অভিযোগ করে বলেন, শিশুটি পানিতে পরে মারা গেলে পেটের ভেতরে পানি থাকবে। কিন্তু তাকে উদ্ধারের পর ঝাঁকি দেওয়া হলেও পেট থেকে কোন পানি বের হয়নি। মুখ দিয়ে বিস্কুটের গুড়ো বের হয়েছে। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে র্শিশুটির মুখে বিস্কুট চাপা দিয়ে হত্যা করা হতে পারে।
বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী শিশু হত্যার বিচার দাবি করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান। তারা ‘আমার বোন মরলো কেন, বিচার চাই বিচার চাই’, আমার মেয়ে মরলো কেন, বিচার চাই বিচার চাই’ এমন স্লোগান দেন। রাত সোয়া ১১টা পর্যন্ত এলাকাবাসী থানার সামনে বিক্ষোভ করছিলেন।
শিশুটির বাবা লিটন মিয়া বলেন, মেয়েটি সন্ধ্যার পর আমাদের সঙ্গে ইফতার করে খেলতে বের হয়। কেউ আমার মেয়েটিকে হত্যার পর লিফটের ফাঁকা জায়গার পানিতে ফেলে রাখতে পারে। কে বা কারা তাকে কেন হত্যা করেছে সেটি বলতে পারি না। এ ঘটনায় রাতে আমি হত্যা মামলা করেছি। পুলিশের উচিত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা।
এ বিষয়ে হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মর্তুজা বলেন, শিশুটির শরীরের কোথাও জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, খেলতে গিয়ে কোনভাবে লিফটের ফাঁকা জায়গায় জমে থাকা পানিতে পড়ে মারা গেছে। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।