আহসান মনসুরকে সরিয়ে নতুন গভর্নর মোস্তাকুর

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৪২ এএম

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরের। নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মোস্তাকুর রহমানকে। তিনি পেশায় ব্যবসায়ী ও একজন কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউনট্যান্ট (সিএমএ)। তাকে চার বছরের জন্য গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়ে গতকাল বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। জারিকৃত এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৪তম গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে তার যোগদানের তারিখ থেকে চার বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে তাকে অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগ করতে হবে। এতে আরও বলা হয়, গভর্নর পদে দায়িত্ব পালনকালে সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তিনি বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গ্রহণ করবেন। নিয়োগের অন্যান্য বিষয়াদি চুক্তিপত্রের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

এদিকে, দুপুর ২টার দিকে আহসান এইচ মনসুরকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। এ সময় তিনি পদত্যাগ করেছেন কি-না জানতে চাইলে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি পদত্যাগ করিনি, আমাকে অপসারণও করা হয়নি। গণমাধ্যমে দেখেছি, তাই আমি বাসায় চলে যাচ্ছি।’

তবে পুরনো গভর্নর নিজে থেকে চলে গেলেও অভিযোগ উঠেছে তার উপদেষ্টাকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বের করে দেওয়ার। নতুন গভর্র্নর নিয়োগের ঘোষণা আসার পর বাংলাদেশ ব্যাংকে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একদল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। গতকাল বুধবার গভর্নরের বিদায়ের পর বাংলাদেশ ব্যাংকে এ ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে কিছু কর্মকর্তা সকাল থেকেই প্রধান কার্যালয়ে জড়ো হন। নতুন গভর্নরের ঘোষণা আসার পর একপর্যায়ে তারা গভর্নরের উপদেষ্টার কক্ষে অবস্থান নিয়ে উচ্চ স্বরে সেøাগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আহসান উল্লাহকে নিরাপত্তার স্বার্থে কার্যালয় ত্যাগ করতে বলা হয়। পরে কর্মকর্তাদের চাপের মুখে তিনি ভবন ত্যাগ করেন বলে জানা যায়। এ সময় কিছু কিছু কর্মকর্তাকে এই উপদেষ্টার গায়ে হাত দিতে উদ্যোত হতে দেখা গেছে। তবে তাকে ধাক্কা দিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এ ঘটনার সময় ভবনের ভেতরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং সাময়িকভাবে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। নিরাপত্তাকর্মীরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।

কর্মকর্তাদের একটি অংশ দাবি করেছেন, সাম্প্রতিক কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পদোন্নতি ও নিয়োগ-সংক্রান্ত ইস্যুতে অসন্তোষ থেকেই এ কর্মসূচি। দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।

কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ সভায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা চেয়েছি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন, কিন্তু পেয়েছি স্বৈরশাসন। এই স্বৈরশাসনে আমরা থাকতে চাই না। আমাদের কিছু ন্যায্য দাবি নিয়ে বারবার গভর্নরের কাছে গিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি সেগুলো আমলে নেননি। বরং উনি দমন-নিপীড়নের আশ্রয় নিয়েছেন।’

শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে ভরিয়ে ফেলা হয়েছে। ওনার (গভর্নর) অনেক উপদেষ্টা ও পরামর্শক প্রয়োজন, কিন্তু এখন পর্যন্ত অর্থনীতির জন্য কোনো কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে দেখি না। উনি ক্রমাগতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে মনোবল ভেঙে দিচ্ছেন। এ ছাড়া ব্যাংক খাত নিয়ে যে ধরনের মন্তব্য করে যাচ্ছেন, তাতে ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। গভর্নরের ইচ্ছেমতো কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলবে না। সবকিছু নিয়ে ওনাকে জবাবদিহি করতে হবে।’

জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর তৎকালীন গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারের জায়গায় ড. আহসান এইচ মনসুরকে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হলো।

এদিকে, গভর্নরের পদ থেকে আহসান এইচ মনসুরকে সরানোর জন্য সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলন ও প্রতিবাদ সভা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরই ধারাবাহিকতায় আহসান এইচ মনসুরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দেওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তিন কর্মকর্তাকে শোকজ ও বদলি করা হয়।

এ সবের প্রতিবাদে গতকাল প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন ব্যাংকের কর্মীরা। সভায় ৩ কর্মকর্তার শোকজ নোটিস ও বদলি প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন দাবি না মানা হলে আজ থেকে থেকে গভর্নরের পদত্যাগের দাবিতে কলম-বিরতিতে যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, মোস্তাকুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে বি.কম (অনার্স) এবং মাষ্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। 

তিনি একজন শিল্প উদ্যোক্তা। হেরা সোয়েটার্স নামে একটি পোশাক কারখানার মালিক। তিনি বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সদস্য। আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব, ঢাকা চেম্বার, আটাবেরও সদস্য। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত