মহান ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ থেকে শুরু হতে যাচ্ছে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬। আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বইমেলা উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ প্রদান করবেন তিনি। এবারের বইমেলায় মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে।
ইতিমধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও একাডেমির সামনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার প্রস্তুতি শেষের দিকে রয়েছে। গত মঙ্গলবার বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে বইমেলার সর্বশেষ প্রস্তুতি তুলে ধরেন মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. মো. সেলিম রেজা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তৃতা করবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, শুভেচ্ছা বক্তৃতা করবেন বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা, সংস্কৃতি সচিব মো. মফিদুর রহমান।
অমর একুশে বইমেলা ১৫ মার্চ পর্যন্ত ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কেউ মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারবেন না। ছুটির দিন বইমেলা চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।
এবারের বইমেলায় মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি, মোট ইউনিট থাকবে ১ হাজার ১৮টি। গত বছর প্রতিষ্ঠান ছিল ৭০৮টি এবং ইউনিট ছিল ১ হাজার ৮৪টি।
অন্যদিকে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চের কাছাকাছি গাছতলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বরের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে ৮৭টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া, প্রতিদিন নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা থাকবে।
বইমেলায় বাংলা একাডেমি এবং মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের নির্ধারিত কমিশনে বই বিক্রি করবে। বাংলা একাডেমির বই ও পত্র-পত্রিকা বিক্রির জন্য মেলার দুই অংশেই স্টল থাকবে। এবারের অমর একুশে বইমেলার আয়োজনকে পরিবেশ-সুরক্ষা সচেতন এবং ‘জিরো ওয়েস্ট বইমেলা’য় পরিণত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে বইমেলা পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত থাকবে। মেলায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নিয়মিত ধূলিবালি-নিবারক পানি ছিটানো এবং নিয়মিত মশক নিধনের সার্বিক ব্যবস্থা থাকবে।
আয়োজনস্থল ও পার্শ¦বর্তী এলাকায় স্থাপিত সব স্টল, দোকান, মঞ্চ, ব্যানার, লিফলেট, প্রচারপত্র, ফাস্ট ফুড, কফি শপ, খাবার দোকান ইত্যাদি প্রস্তুতে পুনঃব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব উপকরণ, যেমন পাট, কাপড়, কাগজ ইত্যাদির ব্যবহার করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতা প্রত্যাশিত।
বইমেলায় শিশুদের উপস্থিতি বাড়াতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঝে রাখা হয়েছে শিশুচত্বর। শিশুচত্বরে মোট ৬৩টি প্রতিষ্ঠান এবং ১০৭টি ইউনিট থাকবে। প্রতি শুক্র ও শনিবার মেলায় বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ‘শিশুপ্রহর’ থাকবে।
প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বইমেলার মূল মঞ্চে বিষয়ভিত্তিক সেমিনার এবং বিকেল ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত চলবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অমর একুশে উদযাপনের অংশ হিসেবে শিশুকিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি এবং সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকছে।
এবার বইমেলার বিন্যাস গতবারের মতো অক্ষুণœ রাখা হয়েছে। তবে কিছু আঙ্গিকগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। মেট্রোরেল স্টেশন-এর অবস্থানগত কারণে গতবারের মেলার বাইরের-পথ এবার একটু সরিয়ে মন্দির-গেটের কাছাকাছি স্থানান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া টিএসসি, দোয়েল চত্বর, এমআরটি বেসিং প্লান্ট এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশন অংশে মোট চারটি প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ থাকবে।
খাবারের স্টলগুলো ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউশনের সীমানা-ঘেঁষে বিন্যস্ত করা হয়েছে। রমজান মাসের কথা বিবেচনায় রেখে পবিত্র রমজান উপলক্ষে বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে মেলায় আগত মুসল্লিদের জন্য সুরা তারাবি নামাজের সুব্যবস্থা থাকবে। নামাজের স্থান, ওয়াশরুমসহ অন্যান্য পরিষেবা অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া খাবারের স্টলগুলোকে এবার বিশেষভাবে সুবিন্যস্ত করা হয়েছে।
বইমেলার প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে পর্যাপ্তসংখ্যক আর্চওয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলার নিিদ্র নিরাপত্তার জন্য এলাকা জুড়ে পর্যাপ্ত ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে বাংলাদেশ পুলিশ, র্যাব, আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।
মেলাপ্রাঙ্গণ ও পার্শ্ববর্তী দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি হয়ে শাহবাগ, মৎস্য ভবন, ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট হয়ে শাহবাগ পর্যন্ত এবং দোয়েল চত্বর থেকে শহীদ মিনার হয়ে টিএসসি, দোয়েল চত্বর থেকে চানখাঁরপুল, টিএসসি থেকে নীলক্ষেত পর্যন্ত নিরাপত্তার স্বার্থে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকবে।
এদিকে অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ২০২৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থ থেকে গুণগত মানের ভিত্তিতে প্রকাশককে প্রদান করা হবে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’। শৈল্পিক মানে সেরা বইয়ের জন্য তিনটি প্রতিষ্ঠান পাবে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’। শিশুতোষ গ্রন্থে বিশেষ অবদানের জন্য থাকবে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’। স্টলের নান্দনিক সাজসজ্জায় শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হবে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’। এ ছাড়া এ বছর নতুনভাবে প্রবর্তন করা হয়েছে ‘সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার’। নতুন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অনুযায়ী এ পুরস্কার দেওয়া হবে।
মবের আশঙ্কা নেই তবুও প্রস্তুত ডিএমপি : বইমেলায় মবের কোনো আশঙ্কা নেই, তবুও প্রস্তুতি রাখবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন) মো. সরওয়ার। গতকাল বুধবার সকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলায় নিরাপত্তা উপলক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন তিনি।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. সরওয়ার বলেন, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণসহ আশপাশের এলাকায় বাংলা একাডেমি এ মেলার আয়োজন করছে। প্রতিবারের মতো এবারও বইমেলাকে ঘিরে সার্বিক নিরাপত্তার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণে স্থাপিত পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তা ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হবে। রাতে কন্ট্রোল রুমের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকিতে থাকবে। বইমেলা সার্বিক নিরাপত্তায় পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, ধারালো বস্তু, বিস্ফোরকদ্রব্য কিংবা দাহ্য পদার্থ নিয়ে বইমেলায় কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। ৩০০ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার মাধ্যমে মেলার ভেতরে এবং চারপাশে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। ডগ স্কোয়াড দিয়ে মেলা প্রাঙ্গণ এবং আশপাশের এলাকা সুইপিং করা হবে। হকার, ছিনতাইকারী ও পকেটমারের তৎপরতা রোধে বিশেষ টিমের ব্যবস্থা থাকবে। মেলায় আগত নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। বইমেলাকেন্দ্রিক বিভিন্ন প্রবেশ পথে নিরাপত্তা ব্যারিকেড স্থাপন করা হবে।
বইমেলা উপলক্ষে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ থেকে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ট্রাফিক বিভাগ থেকে কয়েকটি ডাইভারশন করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দিনে এবং রাতে কোনো বাড়িতে গাড়ি প্রবেশ করবে না। আগের মতো দোয়েল চত্বর এবং টিএসসি এলাকায় রাস্তা সবসময় বন্ধ থাকবে না। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য এটিকে মাঝেমধ্যে খুলে দেওয়া হবে।