সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যায় যেভাবে

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬, ০৭:৫৬ এএম

রমজান মুসলমানদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এই মাসে রোজা, তারাবি, কোরআন তেলাওয়াত ও দান-সদকার মাধ্যমে মুমিন তার জীবনকে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা করে। সংযম, ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের যে শিক্ষা রমজান মানুষকে দেয়, তা কেবল একটি মাসের জন্য সীমাবদ্ধ থাকার জন্য নয়, বরং এই শিক্ষাই হওয়া উচিত সারা বছরের জীবন চলার ভিত্তি। কারণ, রমজান মূলত মানুষের অন্তরকে জাগ্রত করে এবং তাকে নৈতিক শুদ্ধতার পথে পরিচালিত করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক সময় রমজান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সেই ইবাদতের গতি ও আধ্যাত্মিক পরিবেশও ধীরে ধীরে কমে আসে। অথচ একজন সচেতন মুমিনের জন্য প্রয়োজন হলো, রমজানে অর্জিত ইমানি শক্তিকে ধরে রাখা এবং তা বছরের অন্যান্য সময়েও অব্যাহত রাখা। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার অন্যতম সহজ ও গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো নফল ইবাদতে মনোযোগ দেওয়া। বিশেষ করে, রমজানের পর শাওয়াল মাসে ছয়টি নফল রোজা রাখার মাধ্যমে একজন মুসলমান তার ইবাদতের ধারাকে অব্যাহত রাখতে পারে। এতে যেমন বাড়ে সওয়াব, তেমনি রমজানের শিক্ষা জীবনের অন্য সময়েও কার্যকর হয়ে ওঠে। তাই শাওয়ালের ছয় রোজা মুমিনের ইবাদতপূর্ণ জীবনের এক সুন্দর ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করে।

রমজানের ফরজ রোজার পর শাওয়াল মাসের ছয় রোজার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, যা বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। যারা রমজানের রোজা রেখেছেন, তারা পরবর্তী মাস শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখলে সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাবেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত উবাইদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘একদিন হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি সারা বছর রোজা রাখতে পারব? তখন হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার ওপর তোমার পরিবারের হক রয়েছে। তাই সারা বছর রোজা না রেখে রমজানের রোজা রাখো এবং রমজানের পরবর্তী মাস শাওয়ালের ছয় রোজা রাখো। তাহলেই তুমি সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাবে।’ (সুনানে তিরমিজি ১৫৩৪)

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসের ফরজ রোজাগুলো রাখল, অতঃপর শাওয়াল মাসে আরও ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছর ধরেই রোজা রাখল।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ ১৭৯)

রমজানের ত্রিশ এবং শাওয়ালের ছয় রোজা রাখার দ্বারা সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাওয়া যায়, বিষয়টি কোরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। কেউ নেক কাজ করলে মহান আল্লাহ তার প্রতিদান দশ গুণ বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘কেউ কোনো সৎকাজ করলে সে তার দশ গুণ পাবে।’ (সুরা আনআম ১৬০) এ মর্মে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘রমজানের রোজা ১০ মাস রোজা রাখার সমতুল্য। আর শাওয়ালের ছয় রোজা দুই মাসের সমতুল্য। এই হলো মোট এক বছরের রোজা।’ (সুনানে নাসায়ি ২৮৬০)

এ বিষয়টির বিশ্লেষণ হলো, রমজানের ৩০ দিন আর শাওয়ালের ৬ দিন মিলে মোট রোজা হয় ৩৬ দিন। ৩৬ এর দশ গুণ হলো ৩৬০ দিন। আরবি দিনপঞ্জির হিসাবে ৩৬০ দিনে এক বছর পূর্ণ হয়।

শাওয়ালের ছয় রোজা রাখা যাবে ঈদুল ফিতরের দিন ছাড়া মাসের অন্য যে কোনো দিনে। এই ছয় রোজা একনাগাড়ে রাখা উত্তম। তবে সুবিধামতো দু-এক দিন বিরতি দিয়েও রাখা যাবে। কারও যদি রমজানের রোজা কাজা হয়ে থাকে এবং শাওয়ালের নফল রোজাও রাখতে চায় তাহলে উত্তম হলো প্রথমে রমজানের কাজা রোজা আদায় করা। এরপর শাওয়ালের নফল ছয় রোজা রাখা। তবে রমজানের কাজা রোজা থাকা অবস্থায় শাওয়ালের ছয় রোজা রাখলে তা আদায় হয়ে যাবে। (দারুল ইফতা, দারুল উলুম দেওবন্দ ১৬৩৫৬৮)

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত