চট্টগ্রাম নগরীর ব্যস্ততম নিউ মার্কেট এলাকায় স্থাপিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ এখন অবহেলা ও অযত্নের এক নির্মম চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) ট্রাফিক পুলিশ বক্স সংলগ্ন রেলস্টেশনের বাউন্ডারির ভেতরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও স্থাপনের পর থেকে এর কোনও কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ বা তদারকি চোখে পড়েনি। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি তার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্মৃতিস্তম্ভটির চারপাশজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। সন্ধ্যার পর বসে মাদকের আড্ডা এবং রাতে বসে পতিতাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড।স্থানীয়দের অভিযোগ, আশপাশের মানুষ এবং ট্রাকস্ট্যান্ডের কিছু ড্রাইভার ও শ্রমিক নিয়মিত এখানে বর্জ্য ফেলে যাচ্ছেন। এতে করে পুরো এলাকা দুর্গন্ধে ভরে উঠেছে এবং পরিবেশও মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। কোনও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম বা নজরদারির অভাবে দিন দিন পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। অপরদিকে পচে যাওয়া খাবারগুলো স্তম্ভের আশপাশে ফেলে রাখায় গরু ছাগল সেসব জায়গায় চড়ে বেড়ায়।
সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিস্তম্ভ এলাকা পরিণত হয় মাদকসেবীদের আড্ডাখানায়। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পথচারীদের অভিযোগ, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সেখানে মাদকের আসর বসে। শুধু তাই নয়, গভীর রাতে সেখানে নানা অনৈতিক কার্যকলাপও সংঘটিত হচ্ছে। এতে করে আশপাশের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মাঝে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্মৃতিস্তম্ভ থাকার পরও অধিকাংশ মানুষ এর অস্তিত্ব সম্পর্কেই অবগত নন। রেলস্টেশনের ভেতরে, উঁচু দেয়ালবেষ্টিত স্থানে এটি নির্মাণ করায় বাইরে থেকে এর কোনও দৃশ্যমানতা নেই। নিউ মার্কেট মোড়সহ আশপাশের প্রধান সড়ক থেকেও এটি দেখা যায় না। প্রায় ১৫ ফুট উঁচু দেয়ালের আড়ালে থাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই এলাকা দিয়ে যাতায়াত করলেও কেউ বুঝতে পারেন না যে ভেতরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।
এ ছাড়া দিনের বেলায় স্মৃতিস্তম্ভ সংলগ্ন জায়গাটি ট্রাক পার্কিং হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ট্রাকের ধোঁয়া, শব্দ এবং এলোমেলো পার্কিংয়ের কারণে পুরো এলাকাটির পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এতে স্মৃতিস্তম্ভের মর্যাদা যেমন ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তেমনি এর মূল উদ্দেশ্যও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এ ব্যাপারে নিউমার্কেট মোড়ের এক ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ২৮ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। ঠিক আমার পেছনের দেয়ালে রেলের কিছু খালি জায়গা আছে। এখানে মাদকসেবীরা মাদক নেয় এর বাইরে ট্রাকের স্ট্যান্ড আছে। কিন্তু এখানে জুলাই অভ্যুথানে শহীদ ওয়াসিম আকরাম সহ অন্যদের সম্মানে জুলাই স্মৃতি স্তম্ভ আছে তা আজকেই জানতে পারলাম।
ছাত্রদল নেতা শহীদ ওয়াসিম আকরামের পিতা মো. শফি আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিউমার্কেট এলাকায় জেলা প্রশাসন স্মৃতিস্তম্ভ করেছে সেটি আমি আজকেই জানতে পারলাম। এ ছাড়া এ বিষয়ে আমাদের সাথে কেউ যোগাযোগ করেনি।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সারা চট্টগ্রামেও যদি সব কিছুতে আমার ছেলের নাম বসানো হয় তাতে আমার ছেলের বা আমাদের কিছু হবে না।
স্মৃতিস্তম্ভের ব্যাপারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চট্টগ্রাম মহানগরের আহ্ববায়ক রিজাউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই জুলাই স্মৃতিস্তম্ভটি শহীদ ওয়াসিম, শহীদ মুগ্ধসহ সারা বাংলাদেশের শহীদ ও আহতদের সম্মানে করা হলেও এটি এখন সবার চোখের আড়ালে মাদকসেবীদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। এই স্মৃতিস্তম্ভ নিউমার্কেট মোড় থেকে সাধারণ মানুষ দেখবে জানবে সে সুযোগ নেই। এখন দেখতে হলে রেলস্টেশনের ভেতরে দিয়ে যেতে হয়। যা সবার জন্য সব সময় সম্ভব না। এটিকে আমরা একধনের ষড়যন্ত্র হিসেবেই দেখছে। জেলা প্রশাসক বলেছিলেন এখানে মূল সড়কের পাশ থেক দেয়াল ভেঙে একটি রাস্তা করে দেবেন কিন্তু সেটি এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম নগর কমিটির যুগ্ম সমন্বয়কারী ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নগরীর সাবেক আহ্বায়ক আরিফ মঈনুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমান ডিসি এই স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে কি ভাবছেন তা আমার জানা নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, গণপূর্তের সচিবসহ অন্য দলের সকলের সঙ্গে বসে ফাইনাল আলোচনা হয় এটি নিউমার্কেট মোড়ের এখানে হবে। এরপর এটিকে কমপ্লেক্স হিসেবে বানানোর পরিকল্পনার কথাও বলা হয়। কিন্তু স্মৃতিস্তম্ভ করে দেওয়ার পর আর এটি নিয়ে আর কিছু করা হয়নি।
চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব ওয়মর ফারুক সাগর দেশ রূপান্তরকে বলন, এই স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে উপদেষ্টা ফারুক ই আজমের সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছিলাম। যেন এটিকে অন্য কোথাও করা গেলে ভালো হয়। কারণ যে জায়গায় এটি করার চিন্তা করা হচ্ছে সেখানে মাদকের হাট বসে, সব ধরনের অবৈধ কাজ হয়। এখানে শহীদদের সম্মানে স্মৃতিস্তম্ভ হলে শহীদদের অমার্যাদা হবে। কিন্তু তৎকালীন সরকারের উপদেষ্টা এনসিপি নেতাদের কথাকে গুরুত্ব দিয়ে আমাদের কথা আর শোনেননি।
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলামকে কল দেওয়া হলেও মুঠফোনে সাড়া দেননি।
স্থানীয় পথচারীরা জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটিকে রেলওয়ের পরিত্যক্ত খালি স্থান হিসেবেই জানতেন। এখানে যে কোনও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে—তা সম্পর্কে তাদের অনেকেই অবগত নন। ফলে জায়গাটি এখনো অনিয়ন্ত্রিতভাবেই ব্যবহৃত হচ্ছে এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ছে।
