ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা

আপডেট : ০৯ মে ২০২৬, ০৮:১৩ এএম

একবিংশ শতাব্দীতে এসে, বিশ্বরাজনীতি আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল রূপ নিয়েছে। একসময় বিশ্ব ছিল দুই মেরুতে বিভক্ত একদিকে আমেরিকা, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে সেই সরল সমীকরণ আর নেই। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, চীন ও রাশিয়া আলাদাভাবে তাদের শক্তি নিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে। আর সবাই তাদের মতো শক্তি দিয়ে, নিজের মতো করে বিশ্বে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। বৈশ্বিক রাজনীতির এই কাঠামো প্রতিনিয়ত তৈরি ও পরিবর্তন হচ্ছে আঞ্চলিক রাজনীতি ও ভূ-কৌশলগত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। দেশের অবস্থান ও পাশর্^বর্তী দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, ওই  অঞ্চলে কার কতটা প্রভাব এই হিসাবের ওপরেই নির্ভর করছে বৈশ্বিক রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ। ক্ষমতাধর দেশগুলো এখন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং আফ্রিকায় নিজেদের ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য নানা কৌশল নিচ্ছে। কখনো বাণিজ্যে বাধা দিচ্ছে, কখনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে, আবার কখনো সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ হোক বা গাজায় ইসরায়েলের অভিযান বা ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ অভিযান সংঘাতগুলো আসলে শুধু দুটি পক্ষের লড়াই নয়, এগুলো বৃহত্তর ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রতিফলন। এমনকি কোন দেশ, কার কাছ থেকে তেল কিনবে তাও নির্ধারিত হচ্ছে শক্তিশালী দেশের ইচ্ছা অনুযায়ী।

আজকের বিশ্বে যুদ্ধ কেবল অস্ত্র দিয়ে হয় না। আমেরিকার শুল্ক কৌশল বা ট্যারিফ যুদ্ধ, তেলের দাম ডলারে নির্ধারণ কিংবা ৫-জি প্রযুক্তিসহ অন্য রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা অথবা তেল কোন দেশ থেকে কিনতে পারবে, তার অনুমতিপ্রাপ্তি এগুলো এখন সমান কার্যকর অস্ত্র। চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার চিপ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা, বা রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক অবরোধ এর সাম্প্রতিক উদাহরণ। এসব কৌশল মিলিয়ে বৈশ্বিক শৃঙ্খলা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে। জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হচ্ছে, নিরাপত্তা জোটগুলো ভাঙছে এবং নতুন রূপে গড়ে উঠছে। বিশ্বের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কগুলো ভিন্ন আঙ্গিকে বিন্যস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য, এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতা বোঝা কেবল একাডেমিক বিষয় নয় এটি জাতীয় স্বার্থরক্ষার অপরিহার্য শর্ত। আঞ্চলিক রাজনীতি বলতে একটি নির্দিষ্ট এলাকার দেশগুলো নিজেদের মধ্যে কীভাবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে সম্পর্ক রাখে তা বোঝায়। সহজ কথায়, প্রতিবেশী দেশগুলো একে অপরের সঙ্গে কীভাবে মিলেমিশে চলে বা দ্বন্দ্বে জড়ায়, সেটাই আঞ্চলিক রাজনীতির মূল বিষয়। বাংলাদেশের কথা যদি বলি, তাহলে ভারত, মিয়ানমার এবং চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কই এই রাজনীতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

প্রতিটি অঞ্চলের রাজনীতিতে সেই এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ভৌগোলিক বাস্তবতার ছাপ থাকে। যেমন, তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে দীর্ঘদিনের টানাপড়েন, সেটি কেবল দুটি দেশের বিষয় নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এবং দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক।  তবে বর্তমান বৈশি^ক ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা শুধু প্রতিবেশীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। রোহিঙ্গা সংকটকে যদি উদাহরণ হিসেবে নেওয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে যে মিয়ানমারের একটি অভ্যন্তরীণ সমস্যা কীভাবে বাংলাদেশের ঘাড়ে বিশাল বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে এবং একই সঙ্গে আমেরিকা, চীন ও জাতিসংঘসহ বড় বড় বিশ্বশক্তিকে এই অঞ্চলে টেনে এনেছে। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানকে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে, একই সঙ্গে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা রাখতে দেখেছি সাম্প্রতিক সময়ে। এভাবেই আঞ্চলিক সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে বৈশ্বিক শক্তি নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রে পরিণত হয়। কারণ বড় শক্তিগুলো সবসময় এই সুযোগে নিজেদের কৌশলগত সুবিধা খোঁজে। তাই বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য আঞ্চলিক রাজনীতি বোঝা এখন আর শুধু পণ্ডিতদের তত্ত্ব বিশ্লেষণের বিষয় নয়, এটি আমাদের জাতীয় স্বার্থ সংক্রান্ত বাস্তব এক কর্মভার। ভূ-কৌশলগত অবস্থানে একটি দেশ তার ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন করে। বড় শক্তিগুলো সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, বাণিজ্যপথ দখল এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এই প্রতিযোগিতা এখন শুধু যুদ্ধজাহাজ বা সামরিক ঘাঁটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অবকাঠামো নির্মাণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল সংযোগও এখন কৌশলগত অস্ত্র হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর বা সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে চীন ও ভারতের আগ্রহ এর উদাহরণ এখানে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ আর কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যে পার্থক্য করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।  বিশ্বের এই শক্তির প্রতিযোগিতার মূলত যে বিষয়গুলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সেগুলো হলো বাণিজ্যপথ ও সংকীর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্যতা, সামরিক অবস্থান ও নিরাপত্তা বলয় তৈরি এবং মতাদর্শগত প্রভাব ও রাজনৈতিক জোট গঠন। শীতল যুদ্ধের সময় প্রতিযোগিতা ছিল মূলত দুই পক্ষের মধ্যে। কিন্তু আজকের দুনিয়ায় এই প্রতিযোগিতা অনেক বেশি জটিল এতে সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং তথ্যগত সব মাত্রাই একসঙ্গে সক্রিয়।  ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সমুদ্রপথের আধিপত্য ও আঞ্চলিক নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে, যা বিশ্বের স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সম্পদ ও কৌশলগত জলপথ এবং চলমান সংঘাতগুলো বাইরের শক্তিগুলোকে ক্রমাগত টেনে আনছে। ইউরোপে নিরাপত্তা উদ্বেগ ও ভূখণ্ড নিয়ে বিরোধ মহাশক্তির প্রতিযোগিতাকে আবার উসকে দিয়েছে। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও সম্পদ আহরণ এই অঞ্চলগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব দিন দিন বাড়িয়ে তুলছে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই অঞ্চলগুলোর দেশগুলো কিন্তু নিষ্ক্রিয় দর্শক নয়। তারা নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে দর কষাকষি করছে, জোট বাঁধছে বা প্রতিরোধ করছে। আমেরিকা, চীন ও রাশিয়ার ত্রিভুজ প্রতিযোগিতায় একটি চমকপ্রদ বিষয় ঘটছে। আমেরিকার কথা ধরা যাক। দেশটি চীন ও রাশিয়াকে একসঙ্গে চাপে রাখতে গিয়ে, উল্টো এই দুই দেশকে একে অপরের আরও নিকটবর্তী করে দিচ্ছে। এতে বিশ্ব ক্রমেই বহুমেরু হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে, গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো এখন আর চুপ করে বসে নেই। ব্রিকস বা সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) মতো মঞ্চ ব্যবহার করে তারা পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। বাংলাদেশও এই উদ্যোগের অংশ। পদ্মা সেতু রেলসংযোগ, কর্ণফুলী টানেলসহ বেশ কিছু প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ রয়েছে। কিন্তু এই ‘উন্নয়ন সহায়তা’ আসলে কতটা অর্থনৈতিক আর কতটা কৌশলগত সেই প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে আলোচিত। এশিয়ার দেশগুলো এখন একটি কঠিন অবস্থানে নতুন একটি ‘ঠা-া যুদ্ধে’ কোনো একপক্ষ বেছে নেবে, নাকি সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে? দক্ষিণ চীন সাগর ও ভারত-চীন সীমান্তে উত্তেজনা এই বাছাই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে।  দক্ষিণ এশিয়া এখন মার্কিন-চীন কৌশলগত প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ রণক্ষেত্র। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো এই প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেদের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। বিষয়টা এভাবে বোঝা যায় আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা থেকে নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়, সেখান থেকে জন্ম নেয় জোট ও অর্থনৈতিক বলয়। সবশেষে রূপান্তরিত হয় বৈশ্বিক শৃঙ্খলা।

ছোট একটি আঞ্চলিক বিরোধও, একসময় বিশ্বব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারে। এই প্রতিযোগিতার ফলে জাতিসংঘসহ ঐতিহ্যবাহী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। দেশগুলো এখন বহুপাক্ষিক চুক্তির চেয়ে দ্বিপাক্ষিক বা আঞ্চলিক সমঝোতাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। বিশ্বে আমেরিকার একক আধিপত্যের যুগ শেষ হচ্ছে এবং মহাশক্তির প্রতিযোগিতার নতুন একটি অধ্যায় শুরু হচ্ছে। উদীয়মান শক্তিগুলো বৈশ্বিক শাসনে আরও বড় ভূমিকা দাবি করছে। ফলে বিশ্বব্যবস্থা হয়তো আগের চেয়ে বেশি বিভক্ত, কিন্তু একই সঙ্গে আরও গতিশীলও হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন আঞ্চলিক ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতার দ্বারা ক্রমেই নির্ধারিত হচ্ছে। বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়মকানুন এখনো গুরুত্বপূর্ণ, তবে আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্বই এখন বিশ্বব্যবস্থা পুনর্গঠনে মুখ্য ভূমিকা রাখছে। অর্থাৎ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির মিথস্ক্রিয়া এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, বরং একটি পারস্পরিক নির্ভরশীল প্রক্রিয়া। এই দুই শক্তির মধ্যে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতার সংমিশ্রণই বর্তমান বিশ্বরাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য, এই বাস্তবতা বোঝা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান একদিকে যেমন সুযোগ, অন্যদিকে তেমনি চ্যালেঞ্জও। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করা সময়ের দাবি।

লেখক: উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত