শান্তি ও মানবতার কবিকে স্মরণ

আপডেট : ০৯ মে ২০২৬, ০৭:০১ এএম

রাজধানীসহ সারা দেশে সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বিশ্বকবির সৃষ্টিকর্ম নিয়ে চার দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এ ছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, নওগাঁর পতিসর ও খুলনার দক্ষিণডিহিতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি। এসব অনুষ্ঠানে নানা আয়োজনে স্মরণ করা হয় কবিগুরুকে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শান্তি ও মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ।’

একই সঙ্গে কবির ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমি বিশেষ স্মরণিকা, পোস্টার মুদ্রণ ও বিতরণ করে। বরাবরের মতো ছায়ানটও বিশেষ আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি উদযাপন করে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর

রবীন্দ্রনাথ আজও প্রাসঙ্গিক তথ্যমন্ত্রী :  বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে বিশ্বকবির ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত চার দিনব্যাপী উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গতকাল শুক্রবার প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ কেবল সাহিত্য বা শিল্পের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং সমাজ, অর্থনীতি ও বিজ্ঞান নিয়ে তার যে সতর্ক চিন্তা ছিল, তা আজও প্রাসঙ্গিক।’

তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি সবসময় রবীন্দ্র-সাহিত্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক দিকগুলো খোঁজার চেষ্টা করি। সমাজতান্ত্রিক দর্শনের যান্ত্রিকতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে পর্যবেক্ষণ ছিল, তা ‘রাশিয়ার চিঠি’র মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর যখন সারাবিশ্ব মার্ক্সবাদে উদ্বেলিত, তখনো তিনি মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে এই দর্শনের সম্ভাব্য বিরোধের বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন।’

জাতীয়তাবাদের সংকটের কথা উল্লেখ করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ‘ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় যখন জাতীয়তাবাদ তুঙ্গে, তখনো রবীন্দ্রনাথ এর মধ্যকার সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমসাময়িক নেতাদের সতর্ক করেছিলেন।’

শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল ও অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার বক্তব্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সত্যের প্রতি অবিচল এক নির্ভীক যোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ‘যখন সারা বিশ্ব জাতীয়তাবাদের পক্ষে উন্মাতাল, তখন রবীন্দ্রনাথই এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানবতার জয়গান গেয়েছিলেন।’

নির্ধারিত আলোচনা শেষে শুরু হয় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।  ‘হে নূতন, দেখা দিক আরবার’ সমবেত সংগীতের মধ্য দিয়ে শিল্পীরা কবিগুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর ‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছো জ্যোতির্ময়’ গানের সঙ্গে সমবেত নৃত্য পরিবেশিত হয়। সাংস্কৃতিক পর্বে অনিরুদ্ধ সেনগুপ্তের কণ্ঠে ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান’ এবং জীবন চৌধুরীর কণ্ঠে ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ গান দুটি দর্শকদের মুগ্ধ করে। এ ছাড়া ফারজানা তৃণা কবির বিখ্যাত ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সাঁওতালি নাচের মুদ্রা ও ‘গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গামাটির পথ’ গানের নান্দনিক উপস্থাপনা।

অনুষ্ঠানের শেষ ভাগে ছায়া কর্মকার ও নুসরাত বিনতে নুর একক সংগীত পরিবেশন করেন। সবশেষে ‘ঐ মহামানব আসে’ গানের সঙ্গে সমবেত নৃত্য ও সংগীতের মধ্য দিয়ে দেড় ঘণ্টার এ আয়োজনের পরিসমাপ্তি ঘটে।

শিলাইদহ কুঠিবাড়ি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে সংস্কৃতিমন্ত্রী : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়িকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এ লক্ষ্যে সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি। রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী জাতীয় উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। গতকাল দুপুরে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তিনি এ আয়োজনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে থাকা দেশের সব দর্শনীয় স্থান পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার কাজ করছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছারিবাড়ি ইতিমধ্যে সংস্কার করা হয়েছে। এতে প্রমাণ হয়, এই স্থাপনাগুলো প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কারকাজ অব্যাহত থাকবে।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা, কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান, পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন এবং অধ্যাপক ড. ওয়াকিল আহমেদ। আগামীকাল রবিবার মধ্যরাতে এ উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।

রবীন্দ্রনাথের কৃষি ভাবনা অনুসরণ করছে সরকার : মির্জা ফখরুল

নওগাঁর পতিসরে কৃষকদের উন্নয়নে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কৃষি ব্যাংকের কার্যক্রম চালু করেছিলেন এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার প্রচলন করেছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের সেই ভাবনাকে ধারণ করে বর্তমান সরকার কৃষি ও কৃষকদের উন্নয়নে কাজ করছে।’ গতকাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার পতিসরে রবীন্দ্র কাছারিবাড়িতে আলোচনা সভায় মির্জা ফখরুল এ কথা বলেন।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও নওগাঁ জেলা প্রশাসন আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শতবছর পরও রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ আজ থেকে শতবছর আগে যে ভাবনা ও উদ্যোগ নিয়েছিলেন, আমরা আজ সেগুলো নিয়ে ভাবছি। বিশ^কবি আজও প্রাসঙ্গিক। রবীন্দ্রনাথ পতিসরে যখন আসতেন, তিনি কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন। কৃষিকে আধুনিক করার জন্য আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ শুরু করেছিলেন।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশিদ। বিশেষ অতিথি ছিলেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান বাঙালির হৃদয়ে আজও জীবন্ত বিদ্যুৎমন্ত্রী : এদিকে গতকাল দুপুরে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাছারিবাড়ি অডিটরিয়ামে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান বাঙালির হৃদয়ে আজও জীবন্ত হয়ে আছে।’

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘কবি এখানে (শাহজাদপুর) বসেই বহু গান, কবিতা ও গল্প রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের গুরু। তাই এই দিনে আমরা বাংলা সাহিত্য ও রবীন্দ্রনাথকে স্মরণ করি।’ সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব করেন সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিত।

রবীন্দ্রনাথ নিরন্তর অনুপ্রেরণার উৎস আইনমন্ত্রী : আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের জন্য এক নিরন্তর অনুপ্রেরণার উৎস। রবীন্দ্রনাথকে ছাড়া বাঙালি জাতিসত্তা, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে পূর্ণাঙ্গভাবে কল্পনা করা যায় না।’গতকাল বিকেলে খুলনার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্সে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল বাংলারই সম্পদ নন, বরং সাহিত্যপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আজও বেঁচে আছেন। তার কালজয়ী সাহিত্যকর্ম যুগে যুগে মানুষের জীবনবোধ, মানবতা ও সৌন্দর্য চেতনার প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে।’

খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্মারক বক্তৃতা করেন শিক্ষাবিদ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার অধ্যাপক মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত