বিভিন্ন সমস্যা কবলিত স্থান পরিদর্শনে ‘সিটিজেনস্ ফর হিউম্যান রাইটস’

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ১২:৫৭ পিএম

পটুয়াখালীর কুয়াকাটা ও কলাপাড়া অঞ্চলে রাখাইন সম্প্রদায়ের ভূমি বেদখল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব সংকট এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারের পুনর্বাসন না হওয়ার মতো গুরুতর বিষয়গুলো সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছে মানবাধিকার সংগঠন ‘সিটিজেনস্ ফর হিউম্যান রাইটস’। গত ১২ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত সংগঠনটির একটি প্রতিনিধি দল অঞ্চলটি পরিদর্শন করে স্থানীয় রাখাইন নেতৃবৃন্দ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

প্রতিনিধি দলে ছিলেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, সাংবাদিক এহসান মাহমুদ, রান-এর নির্বাহী পরিচালক রফিকুল আলম, গবেষক ড. ঈশিতা দস্তিদার, মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা এবং ল্যান্ড ইজ লাইফ-এর এশিয়া প্রোগ্রাম ডিরেক্টর সতেজ চাকমা।

পরিদর্শনের শুরুতে ১২ জুন প্রতিনিধি দলটি শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারে স্থানীয় আদিবাসী নেতৃবৃন্দ ও ভিক্ষুদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। বিহারের অধ্যক্ষ ইন্দ্রবংশ ভিক্ষু জানান, ১৯৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ২ একর ৪৪ শতাংশ জমির এই বিহার বর্তমানে মাত্র ৬৫ শতাংশ জমিতে টিকে আছে। ১৯৬২ সালে বেরিবাঁধ নির্মাণের সময় জায়গা হারানোর পর থেকেই পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বাকি জমি দখলের চেষ্টা করছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই বিহারে অবস্থিত ‘সীমাঘর’ বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপসম্পদা গ্রহণের জন্য অপরিহার্য, যা হারিয়ে গেলে রাখাইনদের ধর্মীয় জীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে।

এদিকে মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ বিহারের অধ্যক্ষ উত্তমা মহাথেরো জানান, প্রভাবশালীরা তাদের প্রাচীন বিহারের জমি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে এবং অনেক জমি এখনো রেকর্ডভুক্ত হয়নি। রাখাইন বুদ্ধিস্ট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মং হ্লা সেইন রাখাইন অভিযোগ করেন, রেজিস্ট্রেশন অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারীর সহায়তায় জাল দলিলের মাধ্যমে আদিবাসীদের জমি বেদখল করা হচ্ছে। এছাড়া নয়াপাড়া গ্রামের রাখাইনদের শশ্মানভূমির একটি অংশ বেদখল করে গাছ লাগানো হয়েছে, যা নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিরোধ চলছে।

পায়রা বন্দর প্রকল্পের কারণে ২০২১ সালে উচ্ছেদ হওয়া ছ-আনি পাড়া গ্রামের ছয়টি রাখাইন পরিবারের পুনর্বাসন সংকট নিয়েও প্রতিনিধি দল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। উচ্ছেদ হওয়া পরিবারের প্রতিনিধি চিং দামো রাখাইন জানান, ঘরভাড়া বাবদ প্রতিশ্রুত সহায়তা ছয় মাস পর থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যদিও ২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকল্প পরিচালক ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ নাজমুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সোনাপাড়া মৌজায় ৪০ শতাংশ জমি কিনে পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের কথা জানানো হয়, কিন্তু জুন মাস শেষ হতে চললেও সেই প্রকল্পের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ।

পরবর্তীতে প্রতিনিধি দল কলাপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক ইয়াসিন সাদিকের সাথে মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। সভায় বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের আদিবাসী ফোরামের সভাপতি মং চৌথিন তালুকদার রাখাইনদের ভূমি পুনরুদ্ধার, শশ্মানের জায়গা বরাদ্দ, কালচারাল একাডেমি সংস্কার, তাঁত শিল্পের বিকাশ এবং উচ্ছেদ হওয়া ছয় পরিবারের দ্রুত পুনর্বাসনসহ ৫ দফা দাবি উত্থাপন করেন।

আলোচনা শেষে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদিক উত্থাপিত দাবিগুলোর সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি রাখাইনদের ভূমি রক্ষায় প্রশাসনের আন্তরিকতার কথা পুনর্ব্যক্ত করে জানান, প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে জাল দলিলের প্রবণতা রোধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এছাড়া কালচারাল একাডেমি চালু ও রাখাইনদের ঐতিহ্য রক্ষায় সহায়তার আশ্বাস দেন তিনি। সবশেষে, ১৪ জুন প্রতিনিধি দল পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথে দেখা করে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত