আদালতের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে আইনজীবীর সদস্যপদ বাতিল

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম

কুষ্টিয়ায় পেশাদারী নীতিমালা ও শিষ্টাচার লংঘনসহ আদালতের সাথে অসদাচরনের অভিযোগে এ্যাড. সিরাজ প্রামাণিকের জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্যপদ বাতিল করেছেন কুষ্টিয়া বার।

এর আগে গত ৭ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুষ্টিয়া যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালতের বিচারককে অসত্য তথ্য মানতে চাপ প্রয়োগের চেষ্টাকালে ‘ওই আইনজীবী কর্তৃক সৃষ্ট পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচার’ বিধি লংঘনের ঘটনা ঘটে। এর কারন ব্যাখ্যা চেয়ে ওই আইনজীবীকে নোটিশ দেয় আইনজীবী সমিতি। অভিযুক্ত আইনজীবীর দেওয়া জবাব যৌক্তিক ও সন্তোষজনক নয় বলে মনে করে সমিতি। সমিতির তদন্ত কমিটির কাছে ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা প্রমানিত হওয়ায় বৃহষ্পতিবার বিকেলে ৯০ দিন বা ৩ মাসের জন্য সমিতির সদস্যপদ বাতিলের চুড়ান্ত নোটিশ দিয়ে জানানো হয়েছে আইনজীবী সিরাজ প্রামাণিককে। তবে সমিতির সদস্যপদ খোয়ানো ওই আইনজীবী নিজেকে নির্দোষ দাবি করে পরিস্থিতি আইনগত ভাবে মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান।

বিষয়টি নিশ্চিত করে কুষ্টিয়া আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এসএম শাতিল মাহমুদ বলেন, কুষ্টিয়া বারের নেতৃবৃন্দ ঘটনাটি অবহিত হওয়ার পর বিষয়টির শান্তিপূর্ন সুরাহার জন্য সমিতির সদস্য সিরাজ প্রামাণিককে কৃতকর্মের ব্যাখ্যা চেয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তার দেওয়া জবাব সমিতির কাছে সন্তোষজনক তো নয়ই বরং সেখানেও তার ঔদ্ধত্যের ইঙ্গিত রয়েছে যা পেশাদারী নৈতিকতার সাথে সম্পূর্নরূপে সাংঘর্ষিক।

বিষয়টি পারিপার্শ্বিক বিবেচনায় সমিতি গঠিত জুড়ি বোর্ডের সিদ্ধান্তে সমিতির সদস্য বাতিলের চুড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে নোটিশের অনুলিপি সদয় অবগতির জন্য চেয়ারম্যান বাংলাদেশ বার কাউন্সিল এবং রেজিষ্ট্রার সুপ্রীম কোর্ট বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে।

সদস্যপদ বাতিল নোটিশে যা বলা হয়েছে, একজন বিচারিক কর্মকর্তা কেবলমাত্র বিচারিক কাজে অধিষ্ঠিত সময়েই নয় বরং বিচারিক আদালতের সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার বিষয় বিবেচনায় আদালতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা একজন আইনজীবী দায়িত্ব ও কর্তব্য। কোন বিচারিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তিসংগত কোন অভিযোগ থাকলে আইনী প্রক্রিয়ায় তার প্রতিকার পাওয়ার বিধিসম্মত নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও আপনি সেই পথে না গিয়ে ‘Seraj Pramanik’ নামে আপনার ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ পোর্টালে পাবলিকলি প্রচার করে পেশগত আচরণ ও শিষ্টাচার বিধিমালার ৩য় অধ্যায়ে উল্লেখিত আদালতের প্রতি দায়িত্ব পাঠের ১নং ধারার সুস্পষ্ট লংঘন করেছেন। একই সাথে আদালত অঙ্গনে সৎ যোগ্য ও
কর্মশীল বিচারক হিসেবে সর্বজন জ্ঞাত বিচারক দম্পতির পারিবারিক ও ধর্মীয় বিষয়াদি ভিত্তিক আপত্তিকর উক্তি করে কার্যত: সাম্প্রদায়িক উস্কানীর ইঙ্গিত দিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনজীবী সমিতির এক নেতা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, কুষ্টিয়া বারের সদস্য পিএম সিরাজের মতো লোকজন নানা অপকর্মের কারণে সমিতির সম্মানহানি ঘটছে। কুষ্টিয়ায় আদালত চত্বরে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে শত শত স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের বিয়েতে সহযোগিতা করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এসব অপকর্মের প্রতিকার চেয়ে অসংখ্য অভিভাবক সমিতি এবং জেলা প্রশাসকের দপ্তরে দরখাস্ত করেছেন। তার দপ্তরে সম্পন্ন হওয়া নোটারি পাবলিকের রেজিষ্টার বই চেক করলেই এসব অভিযোগের অকাট্য সত্যতা পাওয়া যাবে। এসব ব্যক্তিদের সমিতির সদস্যত্ব না থাকায় উত্তম। তারা এই পদের অপব্যবহার করে জনস্বার্থ বিরোধী কাজ করেন।

তিনি কুষ্টিয়া আদালতের বিচারক দম্পতি সম্পর্কে যেভাবে উস্কানীমূলক বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছেন তাতে আইন শৃংখলার অবনতিসহ মব সৃষ্টিরও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সেদিন কি ঘটেছিলো আদালতে ? ঘটনার সময় আদালতে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী কৌসুলি খোন্দকার নাজমুল হক জানান, ২০২০ সালে হওয়া কুষ্টিয়া সদর থানার একটি মাদক মামলার এজাহার নামীয় ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি, সদর উপজেলার বারখাদা ত্রিমোহিনী কাচারীপাড়ার বাসিন্দা মৃত রামচন্দ্র রাজবংশী ছেলে অচীন্ত কুমার রাজবংশী (২৮) আদালত থেকে সর্বশেষ জামিনে ছিলেন ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর। এরপর গত ৭ জুলাই ২০২৬ সময়কালের মধ্যে আদালত নির্ধারিত পৃথক ভাবে ৭টি হাজিরা দিবসে আদালতে অনুপস্থিত থাকায় ২০২৪ সালের ২১ মে আসামি অচীন্ত’র বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করেন আদালত।

আইনানুযায়ী এই আসামি আদালতে আত্মসর্পন পূর্বক জামিন আবেদন করার কথা। কিন্তু আসামির আইনজীবী এ্যাড. পিএম সিরাজুল ইসলাম তার জামিন না নিয়ে সরাসরি স্বাক্ষ্য শুনানীর জন্য সংশ্লিস্ট যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ ৩য় আদালতের এজলাসে তুলেন।

এসময় আদালত নথি পর্যালোচনা করে বলেন, আসামি অচীন্ত প্রায় ২৬ মাস পূর্ব হতে পলাতক এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। আদালত আসামির আইনজীবীকে আদালতে আত্মসমর্পন পূর্বক জমিনাবেদন করার পরামর্শ দেন। এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন আসামির কৌশুলি এ্যাড. পিএম সিরাজুল ইসলাম।

তিনি দাবি করেন তার আসামি অচীন্ত ওয়ারেন্টভুক্ত এবং পলাতক আসামি নন। অথচ মামলার নথিতে প্রায় আড়াই বছর ধরে আসামি পলাতক আছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদালতের সাথে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং কটুক্তি করতে থাকেন। যা সাবজুডিস ম্যাটার হয়ে যায়। চলমান আদালতে সাথে এটা উনি করতে পারেন না। তাছাড়া আদালতের অভ্যন্তরীন বিষয়গুলি প্রকাশ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়াটা জনসমুখে আদালতকে হেয় করার সামিল। এটা আমাদের
কারো জন্যই শুভকর নয়।

অভিযুক্ত আইনজীবী পিএম সিরাজুল ইসলাম দাবি করেন, একজন আইনজীবী এবং সাংবাদিক হিসেবে জজ সাহেবের বিরুদ্ধে নিউজ করেছিলাম। সে বিষয়ে ওই জজ সাহেব সমিতির উপর দায়িত্ব দেন বিষয়টি সুরাহার জন্য। সমিতির নেতৃবৃন্দ যেহেতু ওই সব শিব ঠাকুরদের কাছ থেকে নানাভাবে সুবিধা নিয়ে থাকেন সে কারনে উনারা জজ সাহেবদের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন এবং আমার দেওয়া জবাব তাদের কাছে সন্তোষ জনক হয়নি বলে সমিতি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এঘটনায় আমি গ্রেপ্তারও হতে পারি বা আরও কোন আইনী জটিলতায় পড়তে পারি সেগুলি আমি মাথায় নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার প্রস্তুতি নিয়েছি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত