বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সুপারিশ করেছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)। ২১ জুলাই ইকোসকের বৈঠকে সদস্য রাষ্ট্রগুলো সর্বসম্মতিক্রমে আগামী ২৪ নভেম্বর (২০২৬) এর আগে এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণ পরিষদকে সুপারিশ করেছে।
বুধবার (২২ জুলাই) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন জানায়, ইকোসকের বৈঠকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধের পটভূমি, প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এলডিসি থেকে মসৃণ, টেকসই ও স্থিতিশীল উত্তরণ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত প্রস্তুতিকাল অপরিহার্য।
এর আগে কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) উভয় দেশের আবেদন পর্যালোচনা করে প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উপস্থাপন করতে মত দেয়। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে ইকোসক সাধারণ পরিষদকে আগামী ২৪ নভেম্বর ২০২৬-এর আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুপারিশ করল। ওই তারিখেই বাংলাদেশ ও নেপালের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের বিদ্যমান সময় নির্ধারিত রয়েছে।
রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী এলডিসি থেকে বাংলাদেশের টেকসই উত্তরণের প্রতি সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সাধারণ পরিষদ প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ ও সংস্কার বাস্তবায়নের পাশাপাশি এলডিসি-উত্তর পর্যায়ে দেশের প্রস্তুতি আরও সুসংহত করবে।
উল্লেখ্য, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে। সরকারের যুক্তি, সময়সীমা বাড়ানো হলে সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, চলমান সংস্কার সংহত করা ও স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজির (এসটিএস) অধীন অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সুযোগ পাওয়া যাবে।
ওই আবেদনে বলা হয়, এলডিসি উত্তরণে পূর্বে বেঁধে দেওয়া মেয়াদ চলাকালে যুদ্ধসহ একের পর এক অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি কার্যক্রম ‘গুরুতরভাবে ব্যাহত’ হয়েছে। বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধীরগতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও তার প্রভাবে জ্বালানি ও খাদ্যবাজারে অস্থিরতা, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার কড়াকড়ি, বাণিজ্য পুনরুদ্ধারে বিলম্ব, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা। অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে আছে আর্থিক খাতে অনিয়ম, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন।
১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকাভুক্ত হয়। এলডিসিভুক্ত থাকার সুবাদে দেশটি পণ্য রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাসহ নানা সুযোগ পেয়ে এসেছে।
এলডিসি থেকে কোন দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে সিডিপি। প্রতি তিন বছর পর এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর ত্রি-বার্ষিক মূল্যায়ন হয়। কোনো দেশ উত্তরণের যোগ্য কি না তা নির্ধারিত হয় মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি -এই তিন সূচকের ভিত্তিতে। যেকোনো দুটি সূচকে উত্তীর্ণ হতে হয়, অথবা মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমার দ্বিগুণ হতে হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব মানদণ্ড পরিবর্তনও করা হয়।
বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সালের ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছে। সেগুলো হলো মোট জাতীয় আয় (জিএনআই), মানবসম্পদ সূচক (এইচএআই) ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক (ইভিআই)। ২০২১ সালেই চূড়ান্তভাবে সুপারিশ করা হয়েছিল, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হবে। কিন্ত করোনার কারণে সেই উত্তরণ দুই বছর পিছিয়েছে। পরে আরও দুটি যুদ্ধ; রাশিয়া-ইউক্রেন এবং ইরান বনাম ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র।
এর আগে এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় পেছানোর আবেদন করে সফল হয়েছে সলোমন দ্বীপপুঞ্জ। ২০২৩ সালে দেশটির সরকার গৃহযুদ্ধ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ দেখিয়ে বাড়তি সময় চেয়ে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) কাছে আবেদন করে। তা মূল্যায়ন করে দেশটিকে তিন বছর সময় বাড়িয়ে দেয় সিডিপি। এ ছাড়া সুনামির কারণে মালদ্বীপ ও ভূমিকম্পের কারণে নেপালের এলডিসি উত্তরণও নির্ধারিত সময়ে হয়নি।