বিশ্বে ইন্টারনেটের গতি ও সেবার মানে তলানিতে বাংলাদেশ

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম

বিশ্বে ইন্টারনেটের গতি ও সেবার মানে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশ নিচে এবং তলানির দিকে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গতি পরিমাপক সংস্থা ওকলা (Ookla)-এর সর্বশেষ সূচকে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর এই দুর্বল চিত্রটি আবারও সামনে এসেছে। দেশে ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়লেও সেবার গুণগত মান এবং গতি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

সম্প্রতি দেশের ইন্টারনেট সেবার মানের এমনই করুণ চিত্র উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে বিশ্বের ১০৩টি দেশের মধ্যে ৯১তম আর ফিক্সড ব্রডব্যান্ডে ১৪১টি দেশের মধ্যে ৯৩তম অবস্থানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ।

বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘দি আনফিনিশড ডিজিটাল রেভল্যুশন: এক্সপান্ডিং ইন্টারনেট অ্যাকসেস’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চগতির ইন্টারনেট এখন আর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি একটি দেশের উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। পুরো বাংলাদেশে ইন্টারনেটে সংযোগের আওতায় এলেও এখনো ব্যক্তিগত ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। 

বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন, নেটওয়ার্ক দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছলেও উচ্চমূল্যের ডিভাইস, ডেটা প্যাকেজ ও ডিজিটাল সাক্ষরতার ঘাটতির কারণে অনেক মানুষ এখনো ইন্টারনেট ব্যবহারের বাইরে রয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ফোরজি মোবাইল নেটওয়ার্ক দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠীর আওতায় পৌঁছলেও বাস্তবে ইন্টারনেট ব্যবহার করত মাত্র ৫৩ শতাংশ মানুষ। অর্থাৎ, নেটওয়ার্ক কাভারেজ থাকা সত্ত্বেও প্রতি নয়জনের মধ্যে তিনজন এখনো অনলাইনে নেই। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, কেবল অবকাঠামো নির্মাণ করলেই প্রকৃত ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয় না। নেটওয়ার্ক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও মানুষ কেন ইন্টারনেট ব্যবহার করছে না, সে কারণগুলো বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কার্যকর ও ন্যায়সংগত নীতি ও উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের জন্য অর্থবহ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে এ প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত ও দূর করা প্রয়োজন। 

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ২৭টি দেশে অর্ধেকের বেশি মানুষ জীবনে কখনো মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠায়নি; বাংলাদেশও রয়েছে এ তালিকায়।

অবশ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) দাবি, দেশে এখন ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশ, যা এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৫ শতাংশ। একই সঙ্গে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বেড়েছে। দেশে এখন ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮৯ দশমিক ৫ শতাংশ।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্টারনেট সংযোগ ও গতির নাজুক অবস্থা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর দুর্বলতা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ, রফতানি, প্রযুক্তিনির্ভর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণেও। এমন পরিস্থিতিতে সরকার যখন নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ক্যাশলেস সমাজ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন ধীরগতির ইন্টারনেট বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। 

তাদের মতে, ডিজিটাল পেমেন্ট, মোবাইল আর্থিক সেবা, অনলাইন ব্যাংকিং, পয়েন্ট অব সেল ও কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন নিরবচ্ছিন্ন সংযোগের ওপর নির্ভরশীল। ইন্টারনেটের গতি কম থাকলে লেনদেন সম্পন্ন হতে দেরি, সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, পেমেন্ট ব্যর্থ হওয়া ও একই লেনদেন একাধিকবার সম্পন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের আস্থা কমে যায়।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দেশে এখনই ডিজিটাল অর্থনীতিতে বড় ধরনের রূপান্তর ঘটানো প্রয়োজন।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের মতো নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোয় ইন্টারনেটের আওতা বাড়লেও সে অনুপাতে ইন্টারনেটের গতি বাড়ছে না। বিপরীতে উন্নত ও দ্রুত অগ্রসরমাণ অর্থনীতির দেশগুলোয় ইন্টারনেট ব্যবহারের পাশাপাশি সংযোগের গতিও দ্রুত বাড়ছে। সিঙ্গাপুর, আরব আমিরাত, হংকং, কুয়েত, কাতারের মতো দেশগুলোয় ইন্টারনেটের গতি সবচেয়ে বেশি। 

প্রতিবেদনে দেশভিত্তিক মধ্যম ডাউনলোড গতির (মেগাবিট প্রতি সেকেন্ড) তথ্য দেয়া হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, মোবাইল ইন্টারনেট গতিতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির ইন্টারনেট গতি সেকেন্ডে ৬৮১ মেগাবিট। সিঙ্গাপুরে ইন্টারনেট গতি ৪২১ এমবিপিএস। এমনকি নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ ভিয়েতনামে প্রায় ১৮৮ এমবিপিএস। অথচ, বাংলাদেশের মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ৪৩ মেগাবিট। অন্যদিকে ব্রডব্যান্ডে গতি ৬৬ মেগাবিট। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডেও ব্রডব্যান্ডের গতি বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি।

বিশ্বব্যাংক বলছে, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্তরের সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। উচ্চ আয়ের দেশগুলোয় প্রায় ৯৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। বিপরীতে নিম্ন আয়ের দেশগুলোয় মাত্র ২৩ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। অর্থাৎ প্রতি চারজনে একজনেরও কম মানুষ অনলাইনে যুক্ত। 

নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোয় ইন্টারনেট ব্যবহার ও গতি কম থাকার অন্যতম কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ আয় ও নিম্ন আয়—উভয় ধরনের দেশেই গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারের হার শহরের তুলনায় পিছিয়ে। এর প্রধান কারণ হলো অবকাঠামোগত ঘাটতি ও তুলনামূলক কম আয়। বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকাগুলোয় ইন্টারনেট সংযোগ ও গতি কমের কারণে মানুষ বাজারসংক্রান্ত তথ্য, কৃষিসহায়তা, ডিজিটাল পেমেন্ট, টেলিহেলথ এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা ও কর্মসূচিতে সহজে প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোতেও গ্রামীণ এলাকার প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনো ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে। দরিদ্র দেশগুলোতে এ বৈষম্য আরও প্রকট।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধীরগতির মোবাইল ইন্টারনেট শুধু ব্যবহারকারীদের ভোগান্তিই বাড়ায় না; এটি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগপ্রবাহকেও বাধাগ্রস্ত করে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোয়ে ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতা ও ধীরগতি তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত