খুলনার কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ কলেজের অধ্যক্ষ অদ্রীস আদিত্য মণ্ডলের জীবনে ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট যেন এক বাঁকবদলের দিন। ওই দিন কলেজে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আন্দোলনকারীদের একটি দল তাঁর পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করে। তাঁকে কলেজে না পেয়ে দলটি তাঁর বাড়ির দিকে যায়। পরে স্থানীয় একটি বাড়িতে তাঁকে খুঁজে পেয়ে সেখানে ঘিরে ধরে পদত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাঁর।
অদ্রীস আদিত্যের ভাষ্য, ওই সময় শুধু তাঁকেই নয়, তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও ভয়ভীতি দেখানো হয়। একপর্যায়ে জীবননাশের হুমকি ও শারীরিক হেনস্তার মুখে তাঁকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। পরে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ ও নৌবাহিনীর সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করেন বলে জানান তিনি।
এরপর কেটে গেছে দুই বছর। কিন্তু সেই ঘটনার পর আর কপোতাক্ষ কলেজের অধ্যক্ষের পদে ফিরতে পারেননি অদ্রীস আদিত্য। বর্তমানে কয়রায় না থেকে খুলনায় অবস্থান করছেন তিনি। সেখান থেকেই নিজের পদ ফিরে পেতে খুলনা ও ঢাকার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আবেদন-নিবেদন করছেন। তাঁর ভাষায়, চাকরি ফিরে পাওয়ার লড়াইটিই এখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াই।
অদ্রীসের দাবি, পরবর্তী সময়ে খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে তাঁকে তিন দফা কলেজে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে স্থানীয় কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের বাধার কারণে তিনি যোগ দিতে পারেননি। তাঁর অভিযোগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর থেকেও বিধি অনুযায়ী বিষয়টি আইনগতভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর বেতন-ভাতা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই নির্দেশও কার্যকর হয়নি।
২০২৪ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনার বর্ণনায় অদ্রীস আদিত্য বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে একদল লোক কলেজে প্রবেশ করে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে পদত্যাগ দাবি করে। তিনি তখন কলেজে ছিলেন না। দীর্ঘ সময় তাঁকে খুঁজে না পেয়ে আন্দোলনকারীরা তাঁর বাড়ির দিকে যায় বলে তাঁর দাবি।
অদ্রীসের অভিযোগ, বাড়িতে তাঁকে না পেয়ে তাঁর সন্তান ও কাকাকে হুমকি দেওয়া হয়। এরপর আশপাশের কয়েকটি বাড়িতেও তাঁকে খোঁজা হয়। একপর্যায়ে স্থানীয় আজিজুল ইসলামের বাড়িতে তাঁকে পাওয়া যায়। সেখানে তাঁকে পদত্যাগ করতে বলা হয়। তিনি রাজি না হওয়ায় গালিগালাজ, শারীরিক হেনস্তা ও জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অদ্রীস আদিত্য বলেন, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পরিস্থিতির চাপে লিখিত পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তাঁর আরও দাবি, প্রশাসনের লোকজন তাঁকে উদ্ধারের পরও মাঝপথে আবার কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে নিজ হাতে পদত্যাগপত্র লেখার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। তিনি নিজ হাতে লিখতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে বলা হয়, ওই পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারীদের কাছ থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। পরে পারিবারিক কারণ দেখিয়ে লেখা পদত্যাগপত্রে তিনি স্বাক্ষর করেন বলে জানান।
ওই ঘটনায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাম ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। কয়রা উপজেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল গালিব বলেন, কপোতাক্ষ কলেজের অধ্যক্ষের পদত্যাগের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানার ব্যবহার না করলেও কয়েকজন বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতা সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে তিনি শুনেছেন।
আবদুল্লাহ আল গালিবের দাবি, স্থানীয় একটি পক্ষ ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্য কয়েকজন শিক্ষার্থীকে সামনে রেখে ওই কর্মসূচির মাধ্যমে মব সংগঠিত করেছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাংগঠনিক কর্মসূচি ছিল না।
অধ্যক্ষের পদ হারানোর পর অদ্রীস আদিত্যের জীবনযাপনেও বড় পরিবর্তন এসেছে। কর্মস্থল কয়রা ছেড়ে এখন খুলনায় অবস্থান করছেন তিনি। সেখান থেকেই চাকরি ফিরে পেতে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আবেদন করছেন। এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে আবেদন, কাগজপত্র নিয়ে ছুটে চলা এবং সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা—এভাবেই সময় পার করছেন তিনি।
অদ্রীসের প্রশ্ন, যদি তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে থাকেন, তাহলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর কেন বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। আর যদি তাঁর পদত্যাগ আইনগতভাবে বৈধ হয়ে থাকে, তাহলে এত দপ্তরে আবেদন করার পরও বিষয়টির সুস্পষ্ট নিষ্পত্তি কেন হচ্ছে না।
বেতন-ভাতা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে অদ্রীসের। তাঁর দাবি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর থেকে বিধি অনুযায়ী এবং বিষয়টি আইনগতভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁর বেতন-ভাতা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এমনকি আঞ্চলিক পরিচালক কলেজ কর্তৃপক্ষকে মুঠোফোনে বেতন-ভাতা ছাড় করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। তবে এরপরও তিনি বেতন-ভাতা পাননি বলে অভিযোগ তাঁর।
অদ্রীস আদিত্য বলেন, তিনি কোনো অন্যায় সুবিধা চান না। বিধি অনুযায়ী তাঁর বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হওয়ার, সেটিই চান তিনি। একই সঙ্গে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়া এবং যে সময়ের বেতন-ভাতা পাওয়ার কথা, তা পাওয়ার দাবি জানান।
অদ্রীস সরে যাওয়ার পর কপোতাক্ষ কলেজে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাওলানা অলি উল্লাহ। তাঁর বক্তব্য, ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট অদ্রীস আদিত্য ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে চলে যান। পরে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তারিকুজ্জামান সভা করে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেন।
ফলে কলেজে প্রশাসনিকভাবে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হলেও অদ্রীস আদিত্যের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর পদত্যাগ স্বেচ্ছায় হয়েছিল কি না এবং এর আইনগত অবস্থান কী—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
দুই বছর পরও তাই অদ্রীস আদিত্যের সামনে রয়ে গেছে একাধিক প্রশ্ন। তিনি কি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলেন, নাকি ভয়ভীতি ও চাপের মুখে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন? যদি পদত্যাগ স্বেচ্ছায় না হয়ে থাকে, তাহলে এর আইনগত অবস্থান কী? সরকারি বিভিন্ন দপ্তর থেকে যোগদানের নির্দেশ দেওয়ার পরও তিনি কেন কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না? আর বেতন-ভাতা দেওয়ার নির্দেশ থাকার পরও কেন তা বাস্তবায়িত হয়নি?
অদ্রীস আদিত্যের দাবি, তিনি কোনো রাজনৈতিক পক্ষের অনুগ্রহ চান না। তিনি চান তাঁর বিষয়ে একটি সুষ্ঠু ও বিধিসম্মত সিদ্ধান্ত। তাঁর ভাষায়, তিনি অপরাধ করে থাকলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক, আর অপরাধ না করে থাকলে তাঁকে তাঁর কর্মস্থলে ফিরিয়ে দেওয়া হোক।