ই-গভর্নেন্সে পিছিয়ে স্থানীয় সরকার দপ্তর

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩২ এএম

স্থানীয় পর্যায়ে ই-গভর্নেন্স বা ডিজিটাল সেবা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এক্ষেত্রে সেবাদানকারী স্থানীয় সরকার দপ্তরগুলো অবকাঠামো, দক্ষ জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল সোমবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে ‘ই-গভর্নেন্স অ্যাট দ্য লোকাল গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউশনস : কারেন্ট স্টেট অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক সংলাপে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ও সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে এতে মূল্য প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার রিসার্চ ফেলো তামিম আহমেদ ও গবেষণা সহকারী সাবিনা শারমিন।

জরিপটি দেশের বিভিন্ন শ্রেণি ও জনগোষ্ঠীর মোট ২ হাজার ৬১১ জন মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ-যুবক রয়েছেন ১ হাজার ৩৮২ জন এবং নারী রয়েছেন ৯৫৭ জন। এ ছাড়া জরিপে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের মতামতও নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ৮১ জন, চরাঞ্চলের ৫৯ জন, হাওরাঞ্চলের ৫৬ জন, বস্তিবাসী ৩৩ জন এবং প্রতিবন্ধী ৪৩ জন রয়েছেন। এ ছাড়া স্থানিয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ২৯৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী জরিপে অংশগ্রহণ করেন।

সংলাপে আইসোশ্যালের চেয়ারম্যান ড. অনন্য রায়হান, পাবলিক ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্টের এমআইএস বিশেষজ্ঞ আমিনুল মোহাইমেন, অ্যাস্পায়ার টু ইনোভেটের (এটুআই) জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ফজলুল জাহেদ পাভেল, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) জনপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ নূর উল্লাহ এবং সাভার উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান অংশ নেন।

সিপিডির প্রতিবেদনে বলা হয়, জরিপের প্রাপ্ত তথ্যে স্থানীয় সরকার দপ্তরগুলোর সামগ্রিক ই-গভর্নেন্স প্রস্তুতি মাত্র ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ। নাগরিকবান্ধব সেবা প্রদানের প্রস্তুতি ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এর মধ্যে অবকাঠামোগত প্রস্তুতিতে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

সিপিডি জানায়, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের দপ্তরগুলোর মধ্যেও ডিজিটাল প্রস্তুতিতে বড় ব্যবধান রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি অফিসের প্রস্তুতি মাত্র ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। ইউনিয়ন সমাজসেবা অফিসের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ইউনিয়ন পরিষদের ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যদিকে উপজেলা পর্যায়ে যুব উন্নয়ন অফিসের প্রস্তুতি ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক অফিসের ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ, সমাজসেবা অফিসের ৪৬ এবং ভূমি অফিসের ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রস্তুতিও সর্বোচ্চ ৫০ দশমিক ২ শতাংশ।

প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ক্ষেত্রেও দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে সিপিডির জরিপে। সংস্থাটির তথ্যমতে, ইউনিয়ন কৃষি অফিসের মাত্র ২৭ শতাংশে ইলেকট্রনিক ডেটাবেজ রয়েছে। এসব কার্যালয়ে গড়ে কম্পিউটার রয়েছে শূন্য দশমিক ২৭টি করে। এর মধ্যে ৪৪ শতাংশ কম্পিউটার অকেজো বা নষ্ট অবস্থায় রয়েছে। ইউনিয়ন সমাজসেবা অফিসের মাত্র ২০ শতাংশে ইলেকট্রনিক ডেটাবেজ রয়েছে।

সংস্থাটি আরও জানায়, অফিসগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে। ইউনিয়ন কৃষি অফিসের ৯৭ শতাংশ, ইউনিয়ন সমাজসেবা অফিসের ৮৩ শতাংশ এবং ইউনিয়ন পরিষদের ৬৭ শতাংশ কার্যালয়ে কোনো বিদ্যুৎ ব্যাকআপ নেই। উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসের ৯০ শতাংশ কার্যালয়ও বিদ্যুৎ ব্যাকআপের বাইরে রয়েছে। অন্যদিকে ইন্টারনেট সংযোগেও রয়েছে অনিশ্চয়তা। ইউনিয়ন কৃষি অফিসের ৯৩ শতাংশ এবং ইউনিয়ন সমাজসেবা অফিসের ৮৭ শতাংশ কার্যালয়ে বিকল্প ইন্টারনেট সংযোগ নেই। এ ছাড়া ডেটা সুরক্ষায় প্রশিক্ষিত কর্মীর সংখ্যাও কম। ইউনিয়ন কৃষি অফিসের মাত্র ১৩ শতাংশ এবং ইউনিয়ন সমাজসেবা অফিসের ১০ শতাংশ কর্মী নাগরিকদের তথ্য সুরক্ষায় প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।

সিপিডির গবেষণায় স্থানীয় পর্যায়ে ই-সেবা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জও চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্তঃসরকারি ডিজিটাল যোগাযোগের ক্ষেত্রে মানসম্মত অবকাঠামোর অভাবকে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইউনিয়ন পরিষদের ৯৩ শতাংশ এবং উপজেলা যুব উন্নয়ন অফিসের ৯৭ শতাংশ কর্মকর্তা। এ ছাড়া ই-সেবা প্রদানে কারিগরি সমস্যা ও বাজেটের সীমাবদ্ধতাকে বড় বাধা হিসেবে দেখেন তারা। উপজেলা মহিলা ও শিশুবিষয়ক অফিসের ১০০ শতাংশ কর্মকর্তা কারিগরি সমস্যাকে এবং ৮৬ দশমিক ২ শতাংশ কর্মকর্তা বাজেটের সীমাবদ্ধতাকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, ডিজিটাল মাধ্যমে নাগরিকরা তাদের সেবা পাওয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার যদি সুযোগ বাড়াতে পারে, তাহলে সেটাকে কার্যকর ডিজিটালাইজেশন কিংবা ই-গভর্নেন্স আমরা বলতে পারব। কারণ সেবা পেতে বারবার সরকারি অফিস-দপ্তরে যায়, এতে সময় নষ্ট হয়। অনেক সময় হয়রানি এবং দুর্নীতিও হয়ে থাকে। তিনি বলেন, ডিজিটাল সুশাসনে তরুণদের চাহিদাটাকে কিন্তু বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে, অংশগ্রহণমূলক বাজেট প্রণয়ন এবং স্থানীয় পরিকল্পনায় তরুণদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত