বাঘ ও হরিণের পদচারণায় সুন্দরবনে ফিরল প্রাণ

সুনশান নীরবতায় সুুযোগ মিলেছে নিজেকে নিজে নিরাময় করার; নির্বিঘ্ন প্রজনন আর বাড়তি স্বাধীনতায় সজীব ম্যানগ্রোভ, খুলতেই প্রথম দিনে বৈরী আবহাওয়ায় সাড়া দিলো তিন শতাধিক পর্যটক।

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৮ পিএম

দীর্ঘ ৩ মাসের টানা নিষেধাজ্ঞা শেষে মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) থেকে আবারও উন্মুক্ত হয়েছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের দুয়ার। উন্মুক্ত হওয়ার প্রথম দিনেই প্রকৃতির এই অপার রূপ দেখতে ছুটে এসেছেন প্রায় ৩০০ জনের মতো দেশি-বিদেশি পর্যটক। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রথম দিনে ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় কিছুটা কম দেখা গেছে।

মাছ ও বন্যপ্রাণীর বংশবৃদ্ধি, বিচরণ এবং প্রজনন পরিবেশ সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন রাখার লক্ষ্যে প্রতিবছর ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত একটানা ৯২ দিন সুন্দরবনে সব ধরনের সাধারণ মানুষের প্রবেশ, মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, মধু সংগ্রহ এবং পর্যটন কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখা হয়। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ইন্টিগ্রেটেড রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্ট প্ল্যানের (আইআরএমপি) সুপারিশের আলোকেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। 

উল্লেখ্য, পূর্বে ২০১৯ সাল থেকে ১ জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ চালু থাকলেও পরবর্তীকালে ২০২২ সাল থেকে তা আরও পরিবর্ধন করে মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে ১ জুন থেকে কার্যকর করা শুরু হয়।

নিষেধাজ্ঞার এই টানা ৩ মাস সুন্দরবন ছিল একেবারেই নিস্তব্ধ ও নীরব। ছিল না কোলাহল, ছিল না কোনো নৌযানের যান্ত্রিক শব্দের উপদ্রব। ফলে যান্ত্রিক দূষণ ও মানুষের বাড়তি চাপ না থাকায় বিশ্বের বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বন যেন নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার এবং মানবসৃষ্ট ক্ষত নিজে নিরাময় করার পরম সুযোগ পেয়েছে। বনজুড়ে এখন নবকচি সবুজের সমারোহ। কেওড়া, সুন্দরী ও বাইনগাছের চারাগুলো বাধা ছাড়া দ্রুত বেড়ে ওঠায় বনের ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি প্রাণীদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হয়েছে আরও সমৃদ্ধ।

বনের অভ্যন্তরীণ নদী ও খালে অবাধে প্রজননের সুযোগ পাওয়ায় প্রচুর মাছের বংশবৃদ্ধি ঘটেছে। কোনো ধরনের ভয়ের আঁচ না পেয়ে বনের চরে চরে নির্ভয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে হরিণের পাল, খালের পাড়ে রোদে পিঠ দিয়ে শুয়ে থেকেছে কুমির, আর ডালে ডালে পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়েছে প্রতিটি কোণ। গভীর গহীনে রাজকীয় ভঙ্গিতে বাঘের অবাধ বিচরণ সুন্দরবনকে ফিরিয়ে দিয়েছে তার চিরচেনা রূপ ও নিজস্ব ছন্দ। পরিবেশবিদ ও বন বিশেষজ্ঞদের মতে, সার্বিক ইকোসিস্টেম সুরক্ষায় এই সময়টি সুন্দরবনের জন্য এক পরম ‘বিশ্রামের সময়’ হিসেবে কাজ করেছে।

বনজ সম্পদের উপর মানুষের চলাচল সীমিত থাকায় বনের প্রাণ-প্রকৃতি যেমন পুনরুদ্ধার হয়েছে, তেমনি বিগত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে সুন্দরবন-কেন্দ্রিক অপরাধ। বাগেরহাট সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, চলতি বছরের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বনরক্ষীরা দুর্গম বনাঞ্চলে ৬৩টি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছেন। এসব অভিযানে মোট ৩৯টি মামলা করা হয়েছে এবং ৩৭ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়।

এ সময় ১২টি ট্রলার, ৫০টি নৌকা, ৫৫টি মাছ ধরার জাল, ২৮ বোতল ও দুই লিটার তরল বিষ এবং ৬ হাজার ২৯০টি হরিণ শিকারের ফাঁদ জব্দ করা হয়। পাশাপাশি ১৮৬ কেজি বিষযুক্ত মাছ, ৭৩৬ কেজি কাঁকড়া, ১ হাজার ৫৬২টি চারু, ২ হাজার বড়শি, ১৭০ কেজি মধু এবং দুই বস্তায় থাকা পাঁচ কেজি শুঁটকি মাছ উদ্ধার করা হয়েছে। বন বিভাগ জানিয়েছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছর বন অপরাধ কমেছে।

বন বিভাগ এখন বন সুরক্ষায় আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার ও প্রযুক্তিনির্ভর। বনের গহীনে প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট পেট্রোলিং’-এর পাশাপাশি ড্রোন দিয়ে আকাশপথে নিবিড় নজরদারি চালানো হচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে বিষ প্রয়োগকারী অসাধু চক্র ও হরিণ শিকারিদের অপতৎপরতা অনেকটাই নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, সুন্দরবন কেবল বাঘ কিংবা হরিণের বাসস্থান নয়, এটি বিপুলসংখ্যক উদ্ভিদ, পাখি, সরীসৃপ, উভচর ও জলজ প্রাণীর এক অনন্য আশ্রয়স্থল। কৃত্রিম চাপ কম থাকলে প্রকৃতি নিজেই নিজেকে সুস্থ করে তোলে। বনের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্যই নির্দিষ্ট সময়ের নীরবতা অত্যন্ত জরুরি ছিল।

নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা পার হওয়ায় মঙ্গলবার থেকে পুনরায় বনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন উন্মুক্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে বন বিভাগ সব ধরনের পাস-পারমিট প্রদান ও প্রবেশ ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় নদী ও ডাঙ্গায় কঠোর নজরদারি অব্যাহত রেখেই সব ধরনের অর্থনৈতিক ও পর্যটন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত