টাকা দিয়ে অনেক তারকাই কেনা যায়, কিন্তু এমন কিছু খেলোয়াড় আছেন যারা মাঠে নেমে কেবল নিজেদের নামের প্রতি সুবিচারই করেননি, বরং বদলে দিয়েছেন পুরো ক্লাবের ভাগ্য ও লিগের গতিপথও।
দলবদলের জানালা বন্ধ হওয়ার পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসের সেরা এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০টি ট্রান্সফার নিয়ে সম্প্রতি এক চমকপ্রদ বিশ্লেষণ করেছেন ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি। যেখানে সাধারণ কোনো কেনাকাটার চেয়ে ক্লাব ও প্রতিযোগিতার মানচিত্র বদলে দেওয়া ‘গেম-চেঞ্জার’ খেলোয়াড়দের মুন্সিয়ানা তুলে ধরা হয়েছে। থিয়েরি অঁরি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কিংবা আর্লিং হালান্ডের মতো তারকারাও যেখানে পেছনে পড়ে গেছেন, সেখানে কোন ফুটবলাররা এই তালিকার শীর্ষস্থান দখল করেছেন, তা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।
তালিকায় যেমন জায়গা করে নিয়েছেন চেলসির রক্ষণ দুর্গ মজবুত করা পিটার চেক কিংবা লিভারপুলকে বদলে দেওয়া ভার্জিল ফন ডাইক, তেমনি রয়েছে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের হয়ে ইতিহাস গড়া অ্যালান শিয়ারারের নাম।
এছাড়া কান্তের অবিশ্বাস্য লেস্টার সিটি জয় কিংবা সার্জিও আগুয়েরোর সেই জাদুকরী মুহূর্ত তো ম্যানচেস্টার সিটির পুরো ইতিহাসকেই পাল্টে দিয়েছে। তবে এই পুরো তালিকার এক নম্বরে রয়েছে এমন এক নাম, যিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেওয়ার পর রেড ডেভিলসদের খরা কাটিয়ে উপহার দিয়েছিলেন নতুন এক সোনালী সাম্রাজ্য। মাঠের লড়াইয়ে চিরতরে পরিবর্তন এনে দেওয়া এই সেরা দলবদলগুলোর গল্প কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রিমিয়ার লিগের দীর্ঘ ইতিহাসকে রোমাঞ্চকর করে তোলার এক অনন্য দলিল।
এক নজরে দেখে নিন সেই সেরা ১০ তারকাদের।
১০. পিটার চেক (রেনে থেকে চেলসি, ২০০৪)
রোমান আব্রামোভিচ যুগের শুরুতে চেলসি বড় বড় কিছু নাম দলে ভেড়ালেও ব্লুজদের রক্ষণভাগের মূল স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এই চেক গোলরক্ষক। স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে নিজের প্রথম লিগ মৌসুমে তিনি গোল হজম করেছিলেন মাত্র ১৫টি! টানা ১,০২৫ মিনিট গোল না খেয়ে থাকার রেকর্ড গড়ে এবং রেকর্ড ২৪টি ক্লিন শিট রেখে চেলসিকে টানা প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা উপহার দেন তিনি। মাত্র ৭ মিলিয়ন পাউন্ডের এই সাইনিং পরবর্তীতে ক্লাবের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও লাভজনক চুক্তি হিসেবে প্রমাণিত হয়।
৯. অ্যালান শিয়ারার (সাউদাম্পটন থেকে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্স, ১৯৯২)
দ্বিতীয় বিভাগ থেকে উঠে এসেই প্রিমিয়ার লিগের প্রথম মৌসুমে বাজিমাত করেছিল ব্ল্যাকবার্ন রোভার্স। রেকর্ড ৩.৬ মিলিয়ন পাউন্ডের ব্রিটিশ ট্রান্সফার ফিতে তখনকার ২১ বছর বয়সী সেই স্ট্রাইকারকে দলে ভিড়িয়েছিল ক্লাবটি। প্রথম ২১ ম্যাচে ১৬ গোল এবং পরের মৌসুমে ৩১ গোল করে দলকে রানার্সআপ করার পর, ১৯৯৪-৯৫ মৌসুমে ব্ল্যাকবার্নকে ঐতিহাসিক প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা উপহার দেন শিয়ারার।
৮. কার্লোস তেভেজ (করিন্থিয়ান্স থেকে ওয়েস্ট হ্যাম, ২০০৬)
লিগ টেবিলের তলানিতে থাকা ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেড যখন রেলিগেশনের মুখে, তখন সবাইকে চমকে দিয়ে এই আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডকে দলে টানে হ্যামাররা। শেষ ১১ ম্যাচে ৯ পয়েন্টের ব্যবধান ঘুচিয়ে চমকপ্রদ কামব্যাক করে ওয়েস্ট হ্যাম। যার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল তেভেজের ৭টি গোলের, যার মধ্যে মৌসুমের শেষ ম্যাচে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
৭. রবিনহো (রিয়াল মাদ্রিদ থেকে ম্যানচেস্টার সিটি, ২০০৮)
আবুধাবি ইউনাইটেড গ্রুপ ম্যানচেস্টার সিটি কেনার দিনেই ব্রিটিশ রেকর্ড ফি’তে রবিনহোকে দলে টানে সিটিজেনরা। মাঠের পারফরম্যান্সে তিনি প্রথম মৌসুমে ১৪ গোল করে দলের শীর্ষ স্কোরার হন। তবে এই দলবদলের আসল গুরুত্ব ছিল ভিন্ন, এটি ছিল বিশ্ব ফুটবলে ম্যানচেস্টার সিটির পরাশক্তি হয়ে ওঠার প্রথম বড় ঘোষণা।
৬. ভার্জিল ফন ডাইক (সাউদাম্পটন থেকে লিভারপুল, ২০১৮)
ইউার্গেন ক্লপের লিভারপুলকে খাদের কিনারা থেকে বিশ্বমঞ্চের অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে রূপ দেওয়ার কারিগর এই ডাচ ডিফেন্ডার। ৭৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল ট্রান্সফার ফিতে অ্যানফিল্ডে পা রাখার পর থেকেই লিভারপুলের রক্ষণভাগের দুর্বলতা উধাও হয়ে যায়। তার জাদুকরী উপস্থিতিতেই রেডরা প্রিমিয়ার লিগ এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপা ঘরে তোলে।
৫. রবিন ফন পার্সি (আর্সেনাল থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ২০১২)
আর্সেনালের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বৈরিতা পাশ কাটিয়ে গানার্সদের তৎকালীন সেরা গোলদাতা ও অধিনায়ককে সরাসরি ওল্ড ট্রাফোর্ডে নিয়ে আসেন স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন। প্রিমিয়ার লিগে নিজের আগের মৌসুমে ৩০ গোল করা ফন পার্সি ইউনাইটেডে এসেই ২৬ গোল করেন এবং ফার্গুসনের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ মৌসুমে ক্লাবকে ঐতিহাসিক ২০তম লিগ শিরোপা উপহার দেন।
৪. সল ক্যাম্পবেল (টটেনহ্যাম থেকে আর্সেনাল, ২০০১)
নর্থ লন্ডন ডার্বির ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং বিতর্কিত দলবদল এটি। টটেনহ্যামের ঘরের ছেলে ও অধিনায়ক ক্যাম্পবেল কোনো ট্রান্সফার ফি ছাড়াই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্সেনালে যোগ দিয়ে পুরো ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন। গানার্সদের রক্ষণভাগে এসে তিনি দারুণ স্থায়িত্ব আনেন এবং ক্লাবের অবিস্মরণীয় ‘ইনভিসিবলস’ (অপরাজিত) হয়ে লিগ জয়ের ইতিহাসে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন।
৩. এনগোলো কান্তে (কায়েন থেকে লেস্টার সিটি, ২০১৫)
ফরাসি থার্ড টিয়ার থেকে উঠে আসা এই মিডফিল্ডার লেস্টার সিটিতে যোগ দেওয়ার সময় কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি কী ঘটতে চলেছে। মাঠজুড়ে তার অদম্য দৌড় আর বল কাটার অবিশ্বাস্য দক্ষতার ওপর ভর করেই রূপকথার জন্ম দিয়েছিল লেস্টার সিটি। ক্লাউদিও রানিয়েরির সেই ঐতিহাসিক প্রিমিয়ার লিগ জয়ের মুকুটের আসল হীরা ছিলেন এই ফরাসি মিডফিল্ডার।
২. সার্জিও আগুয়েরো (আতলেতিকো মাদ্রিদ থেকে ম্যানচেস্টার সিটি, ২০১১)
ম্যানচেস্টার সিটির আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইকন। বদলি হিসেবে নেমেই জোড়া গোল আর অ্যাসিস্ট দিয়ে অভিষেক রাঙানো আগুয়েরো এক দশক ধরে সিটির আক্রমণভাগের অবিসংবাদিত রাজা ছিলেন। বিশেষ করে ২০১১-১২ মৌসুমের শেষ ম্যাচে যোগ করা সময়ে তার সেই জাদুকরী গোলটি সিটিকে ৪৪ বছর পর এনে দিয়েছিল প্রিমিয়ার লিগের স্বাদ, যা বদলে দিয়েছিল ইংলিশ ফুটবলের ক্ষমতার সমীকরণ।
১. এরিক ক্যান্টোনা (লিডস ইউনাইটেড থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ১৯৯২)
তালিকার একদম শীর্ষে থাকা এই ফ্রেঞ্চ ফরোয়ার্ড ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ভাগ্য ও খেলার ধারা চিরতরে বদলে দিয়েছিলেন। ২৬ বছর ধরে লিগ শিরোপার খরায় ভোগা ইউনাইটেড যখন টেবিলের মাঝমাঠে ধুঁকছিল, তখন মাত্র ১.৬ মিলিয়ন পাউন্ডে তাকে ওল্ড ট্রাফোর্ডে নিয়ে আসেন স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন। তার অনবদ্য নেতৃত্ব ও জাদুকরী পারফরম্যান্সে ভর করেই ইউনাইটেড প্রিমিয়ার লিগের প্রথম আসরে চ্যাম্পিয়ন হয় এবং পরবর্তী এক দশকের সফলতার ভিত গড়ে তোলে।