মেডিকেলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির বেপরোয়া সিন্ডিকেট

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৮ এএম

মেডিকেল শিক্ষার গুণগত মান উন্নত ও কম খরচে চিকিৎসক হওয়ার সুযোগ থাকায় ভারত ও নেপালের শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। শিক্ষার্থীদের এ চাহিদার সুযোগ নিয়ে দুই দেশে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের বাইরে কোনো শিক্ষার্থী বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেলগুলোতে ভর্তির সুযোগ নেই। শুধু তাই নয়, সরকারি মেডিকেলে ভর্তিও নিয়ন্ত্রণ করে এই চক্র। সিন্ডিকেটের কারণে স্বাভাবিক খরচের চেয়ে বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে বিদেশি শিক্ষার্থীদের। শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে তারা নানা জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়।

এই সিন্ডিকেটে বাংলাদেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজের কর্তাব্যক্তি, মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসাধু চক্র, ভারতীয় চিকিৎসক, ভারত ও বাংলাদেশের দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে বেসরকারি ৬৭ মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তির আসন হচ্ছে ৬ হাজার ২৯৩টি। এর মধ্যে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ৪৫ শতাংশ হিসেবে আসন রয়েছে ২ হাজার ৭৬৪টি। এর মধ্যে এমবিবিএস কোর্সে ২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে এক হাজার ৭০০ বিদেশি শিক্ষার্থী পড়তে এসেছেন।

সম্প্রতি ভারত থেকে পড়তে আসা এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের। এই শিক্ষার্থী বেসরকারি আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করছেন। তিনি বলেন, ভারতে এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করতে যে খরচ হয় বাংলাদেশে তা অর্ধেকের মধ্যে সম্ভব। এ জন্য তিনি অনলাইনে কলেজগুলোর খোঁজখবর নিয়ে এনাম মেডিকেল কলেজ ও আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দুই কলেজ কর্র্তৃপক্ষই তাকে সরাসরি ভারতীয় এজেন্টের নম্বর দিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। তারা জানিয়ে দেন এজেন্ট ছাড়া সরাসরি ভর্তি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

ওই শিক্ষার্থীর দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হয় কলেজ দুটিতে। সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজের সেক্রেটারি (কলেজ সেক্রেটারি) মো. শাহিনুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় গোপন করে দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদক কথা বলেন। তিনি জানান, বিদেশি শিক্ষার্থী সরাসরি ভর্তির কোনো সুযোগ নেই। ভারতের কাশ্মীরে ডেডি কনসালটেন্সির মো. নবাব, কলকাতায় মান্টু দেব এবং নেপালে ডা. সঞ্জিব ও তিলক পান্ডে তাদের এজেন্ট। ওই দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তি হতে হলে তাদের মাধ্যমে আসতে হবে। এরপর তিনি তাদের ফোন নম্বর দিয়ে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

একইভাবে আনোয়ার খান মেডিকেল কলেজ থেকে জানানো হয়, ভারতে এমসিএফ এডুকেশনের শেখ মান্নাফ এবং নেপালে সগীর খান তাদের এজেন্ট। এজেন্ট ছাড়া ভর্তির কোনো সুযোগ নেই।

কেবল এনাম কিংবা আনোয়ার খান মডার্ন নয়, দেশের প্রায় সব বেসরকারি মেডিকেল কলেজেই ভারত ও নেপালি শিক্ষার্থী ভর্তির দায়িত্ব বিদেশি এজেন্টদের হাতে। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য দেশের বেসরকারি মেডিকেলগুলো বিদেশি এজেন্টদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। একেকজন শিক্ষার্থী ভর্তির বিনিময়ে ভারতীয় দালালদের কলেজভেদে ৫-৭ হাজার ডলার কমিশন দিয়ে থাকে। অন্যদিকে নিজ দেশের শিক্ষার্থীদের থেকে এসব দালাল নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি ফি নিয়ে থাকেন। ফলে বাংলাদেশে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের গুনতে হয় বাড়তি টাকা। এতে বিদেশি শিক্ষার্থী কমার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিদেশিদের অথরাইজেশন দেওয়ার ক্ষেত্রে কলেজগুলো কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করে না। বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে বাংলাদেশ সরকারের অনুমতিও নেয়নি কোনো কলেজ। ফলে তারা সরকারকে কোনো টেক্স দেয় না। এতে রাজস্ব বঞ্চিত হয় দেশ। ব্যবসা করার জন্য তাদের কোনো লাইসেন্স নেই, নেওয়া হয়নি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্লিয়ারেন্স এমনকি আর্থিক লেনদেন করার বিষয়টি জানানো হয়নি বাংলাদেশ ব্যাংককেও। এতে এজেন্টরা নানা ছলছাতুরির আশ্রয় নেয় এবং জালিয়াতির মাধ্যমে যোগ্যতা নেই এমন শিক্ষার্থীদের নকল সার্টিফিকেট বানিয়ে ভর্তি করিয়ে থাকে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইচ্ছামতো ফি আদায় করছে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলো। আবার এজেন্টরাও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নানাভাবে প্রতারণা করে অধিক টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে । বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে ৩৫ থেকে ৫০ হাজার আমেরিকান ডলার নিয়ে থাকে কলেজগুলো। কলেজের মান অনুযায়ী ফির পরিমাণ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এসব চক্র মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করত টেম্পারিং করা নকল নম্বরপত্র দিয়ে, যদিও বর্তমানে কড়াকড়ির কারণে এ প্রবণতা কমছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতীয় এজেন্টরা শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে নানা অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে থাকে।  বেসরকারি মেডিকেল কলেজে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য ইকুইভেলেন্স সার্টিফিকেটের প্রয়োজন হয়, যা তারা নিজেরাই বানিয়ে দিয়ে থাকে। একেকটি সার্টিফিকেটের জন্য তারা ১০-১৫ হাজার রুপি নিয়ে থাকেন বলে একাধিক ভারতীয় শিক্ষার্থী দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, কম নম্বর পাওয়ার কারণে  বেসরকারি মেডিকেলে যোগ্যতা নেই এমন শিক্ষার্থীকে নম্বরপত্র নকল করে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেয় এই চক্রটি। নকল নম্বরপত্র বানাতে তারা ৩-৫ লাখ রুপি পর্যন্ত নিয়ে থাকে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে ৩০০ শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়েছে, যারা ভারতে পরীক্ষা (ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স এক্সাম) দিয়ে মেডিকেলে ভর্তির ন্যূনতম নম্বর তুলতে পারেননি বলে জানা গেছে।

সাধারণত সার্ক কোটায় এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি হতে ভালো নম্বর থাকতে হয়। কিন্তু যেসব শিক্ষার্থীর ভর্তি হওয়ার মতো নম্বর থাকে না, তাদের নকল নম্বরপত্র ভারত থেকে বানিয়ে দেয় এসব এজেন্ট। ২০১৯ সাল পর্যন্ত কাশ্মীরের ১৯ শিক্ষার্থী জাল সার্টিফিকেট নিয়ে সরকারি মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিল বলে দুর্নীতি দমন কমিশন জানিয়েছিল। শুধু তাই নয়, নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভারতীয় এজেন্ট জানান, যেসব বিদেশি শিক্ষার্থী সার্ক কোটায় চান্স পেয়ে থাকেন, তাদের তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ওয়েবসাইটে দেওয়ার আগেই টাকার বিনিময়ে সংগ্রহ করে নেয় ভারতীয় এজেন্টরা। এরপর ওই শিক্ষার্থীদের চান্স পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ১৮-২৫ লাখ রুপি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় তারা।

 যেসব ছাত্রছাত্রী সার্ক কোটায় সরকারি মেডিকেলে ভর্তি হন, তাদের আবেদনপত্র, সার্টিফিকেট, মার্কশিট সে দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে মেডিকেল এডুকেশন শাখায় পৌঁছায় মেরিট লিস্ট তৈরির জন্য। যারা সময়মতো এসব ডকুমেন্টস জমা দিতে পারেন না, তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভর্তি ম্যানেজ করে দেয় এসব সিন্ডিকেট।

 দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে বেসরকারি মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তিতে ভারত ও নেপালের এজেন্টদের নাম উঠে এসেছে। যার মধ্যে সর্বোচ্চ ৪০টি কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি করে থাকেন শেখ মান্নাফ। এর বাইরে ভারতীয়দের মধ্যে বাংলাদেশের ২০টির বেশি মেডিকেলে শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে থাকেন পিস এডুকেশনের শেখ বশির উদ্দিন, স্প্রীং লাইফ এডুকেশনের চৈতালী সেনগুপ্তা, স্মাইল এডুকেশনের মিস রিপা এবং কাশ্মীরের চিকিৎসক ফয়সাল। ভারতের আরও কয়েকজন এজেন্ট হলেন ইসফাক মালিক, শাহনেওয়াজ খান, তাহির বাবা, মানিস জেসওয়াল, রাজমন্ডল এবং মান্টু দেব। কাশ্মীর অঞ্চলে ডেডি কনসালটেন্সির মো. নবাব। এসএস এডুকেশনের বাশারত, এনামুল হক সুমনও বিভিন্ন কলেজের এজেন্ট হিসেবে শিক্ষার্থী পাঠিয়ে থাকেন। নেপালের এজেন্টরা হলেন সগীর খান, ডা. সঞ্জীব ইয়াদাব ও সঞ্জয় সাহা।

এই সিন্ডিকেটে বাংলাদেশ থেকে কয়েকজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা মূলত ভারতীয়দের সহযোগী হিসেবে কাজ করে থাকেন। দারা হলেন নিডস এডুকেশনের মালিক সৈয়দ মোফাজ্জল করীম ও ফ্রেন্ডস এডুকেশনের আনীস। এ দুজন আবার সরকারি মেডিকেল ভর্তি জালিয়াতি মামলার আসামি। এর বাইরে আব্দুল করিম নামে আরও এক এজেন্ট রয়েছেন, যিনি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর হয়ে এ দেশে কাজ করেন।

 মেডিকেলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বাংলাদেশি কেউ এজেন্সি খুলতে চাইলে তাদের অথরাইজড দেয় না বেসরকারি মেডিকেলগুলো। এ ক্ষেত্রে তারা শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে গেলে তারা ভারতীয় এজেন্টদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ বলে সাফ জানিয়ে দেন এবং তাদের অনুমতি নিয়ে আসতে বলে দিতেন। ফলে বাধ্য হয়ে এরা ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বেসরকারি মেডিকেল কলেজ শাখার সরকারি পরিচালক উপল সিজার বলেন, মেডিকেল কলেজগুলো বিদেশি শিক্ষার্থী পর্যাপ্ত পায় না, তাই বিদেশি এজেন্টদের মাধ্যমে ভর্তি নেয়। কিন্তু এর সঙ্গে  কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ আমাদের হাতে নেই।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মেডিকেল খাতে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তিতে নানা অনিয়মের কথা শুনে আসছি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত অবিলম্বে বিষয়টি খতিয়ে দেখা। কলেজগুলোর অডিট কার্যক্রম সঠিকভাবে তদারকি হয় না এবং তারা বিভিন্ন কৌশলে সরকারকে ফাঁকি দিচ্ছে। এটা গুরুতর অপরাধ।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মহিউদ্দিন মাতব্বর দেশ রূপান্তরকে বলেন, কলেজগুলো তাদের নিজস্ব উদ্যোগেই বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়ে আসে। আমরা একটা প্যারামিটার বা মানদণ্ড দিই তারা এটা অনুসরণ করেই শিক্ষার্থী নিয়ে আসে। অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে কাগজপত্র আমাদের হাতে আসে। এখানে জালিয়াতির কোনো সুযোগ নেই।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত