রবীন্দ্রসংগীতে আজন্ম নিবেদিত এক শিল্পী মিতা হক। রবীন্দ্রসংগীতের অমিয় ধারায় নিজেকে সিক্ত করার পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মাঝেও ছড়িয়ে দিয়েছেন তার সংগীত লব্ধ জ্ঞান। আজ ৬ সেপ্টেম্বর এই উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের জন্মদিন। ১৯৬২ সালের এই দিনে ঢাকায় জন্ম হয় মিতা হকের। তার জন্মদিনকে উপলক্ষ করে আয়োজন করা হয়েছে স্মরণ অনুষ্ঠান ‘যেখান দিয়ে হেসে গেছে, হাসি তার রেখে গেছে’। শিল্পীর পরিবার, প্রিয়জন ও শিক্ষার্থীরা এটি আয়োজনে করে। শনিবার (৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৭টায় ছায়ানটে এটির আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনে অতিথিদের স্মৃতিচারণে 'মিতা হকের রবীন্দ্রসংগীতচর্চা, সাংগঠনিক ভূমিকা, স্বদেশচেতনা, শিক্ষকতা এবং মানুষের প্রতি তার গভীর ভালোবাসার কথা উঠে আসে। একসময় ছায়ানটের রবীন্দ্রসংগীত বিভাগের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।
সংগীতপ্রেমী পরিবারে বড় হওয়ায় গানের জন্য আলাদা কোনো স্কুল বা একাডেমিতে ভর্তি হননি। তার চাচা দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক ও রবীন্দ্র গবেষক ওয়াহিদুল হক। প্রথমে চাচা ওয়াহিদুল হক এবং পরে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খান ও সনজিদা খাতুনের কাছে বাড়িতেই গান শেখেন তিনি। মাত্র ১১ বছর বয়সে বার্লিনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শিশু উৎসবে অংশ নেন তিনি। ১৯৭৬ সাল থেকে তিনি তবলা বাদক মোহাম্মদ হোসেন খানের কাছে সংগীত শেখা শুরু করেন। ১৯৭৭ সাল থেকে নিয়মিত তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারে সংগীত পরিবেশনা করেন। মিতা হক ছিলেন বাংলাদেশ টিভি ও বেতারের সর্বোচ্চ গ্রেডের তালিকাভুক্ত শিল্পী।
এককভাবে মুক্তি পাওয়া ২৫টি অ্যালবাম আছে তার। এর মধ্যে ১৪টি ভারত থেকে ও ১১টি বাংলাদেশ থেকে। তার প্রথম রবীন্দ্রসংগীতের অ্যালবাম ‘আমার মন মানে না’ প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। সঙ্গীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০১৬ সালে শিল্পকলা পদক এবং ২০২০ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। সুরের এই মহান সাধক ‘সুরতীর্থ’ নামে একটি সঙ্গীত প্রশিক্ষণ দল গঠন করেন, যেখানে তিনি পরিচালক ও প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্বপালন করতেন। পাশাপাশি ছায়ানটের রবীন্দ্রসংগীত বিভাগের প্রধান হিসেবে গান শিখিয়েছেন বহুদিন ধরে। জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদে প্রথমে সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তী সময়ে সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনে মিতা হক অকাল প্রয়াত স্বনামধন্য অভিনেতা-পরিচালক নাট্যজন খালেদ খানকে বিয়ে করেন। তাদের একমাত্র সন্তানের নাম ফারহিন খান জয়িতা। উল্লেখ্য, জয়িতাও একজন সম্ভাবনাময় সংগীত শিল্পী হিসেবে আমাদের সংগীত ভূবনে বিশেষ দৃষ্টি কেড়েছেন। বাঙালি সংস্কৃতির শুদ্ধতায় নিমগ্ন এই শিল্পী অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে শুধু ধারণ ও লালনই করেননি, নিরন্তর সচেষ্ট ছিলেন তার বিকাশেও। শিল্প-সংস্কৃতির নানান ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি ২০১৬ সালে শিল্পকলা পদক লাভ করেন। সংগীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০২০ সালে একুশে পদক প্রদান করে। দীর্ঘ পাঁচ বছর কিডনি রোগেও ভুগছিলেন এই শিল্পী। ২০২১ সালের ১১ এপ্রিল ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
জীবন ও শিল্পের মেলবন্ধনে মিতা হক
মিতা হক স্মরণে বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা
একুশে পদক পেলেন মিতা হক ও জাফর ওয়াজেদ