আত্মহত্যা বা আত্মহনন হলো নিজের জীবনকে নিজে ইচ্ছাকৃতভাবে শেষ করার একটি প্রক্রিয়া। অনাদিকাল ধরে জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের চরম সমাধান হিসেবে মানুষ আত্মহত্যার পথ অবলম্বন করে আসছে এবং বর্তমান বিশ্বে আত্মহত্যা অন্যতম জনস্বাস্থ্যজনিত সমস্যা, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করছে। বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ৭ লক্ষাধিক মানুষ আত্মহত্যার কারণে মৃত্যুবরণ করে। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য আত্মহত্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত (ইব্রাহিম ও রামিয়া, ২০২৫)। বাংলাদেশেও আত্মহত্যা একটি অবহেলিত ইস্যু, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যব্যবস্থা, নিয়মিত জরিপ ও পর্যাপ্ত গবেষণার ঘাটতি রয়েছে (রয় ও অন্যান্য, ২০২৩)।
বাংলাদেশের আত্মহত্যার সঙ্গে বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা, পারিবারিক সম্পর্ক, আর্থিক সংকট, কর্মক্ষেত্রে সমস্যা, সম্পর্কজনিত জটিলতা ও পারিবারিক সহিংসতা এবং ভৌগোলিক সাংস্কৃতিক উপাদানের মতো বিভিন্ন সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এছাড়া বিষণ্নতা, মাদকাসক্তি, মানসিক ব্যাধি, সমাজজীবনের সাথে সামঞ্জস্য বিধানের অপারগতা, অর্থনৈতিক সংকট, ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা, প্রযুক্তিগত অপসংস্কৃতি নানাবিধ উপাদান আত্মহত্যার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করে। তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সহজপ্রাপ্যতা বৃদ্ধি, সচেতনতা তৈরি, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং পরিবার ও সমাজের সহযোগিতামূলক ভূমিকা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি (পারভীন ও অন্যান্য, ২০২০)।
আত্মহত্যার হার বা বিস্তৃতি
বাংলাদেশে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ণয় করা কঠিন, কারণ দেশে এখনো সমন্বিত জাতীয় আত্মহত্যা নিবন্ধন ও নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। পুলিশ, হাসপাতাল, সংবাদমাধ্যম, স্থানীয় জরিপ এবং WHO-এর মডেলভিত্তিক অনুমান থেকে প্রাপ্ত সংখ্যার সংজ্ঞা ও তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি আলাদা। ফলে বিভিন্ন উৎসের হার ও মৃত্যুসংখ্যা সরাসরি তুলনা করা যায় না। ২০২৫ সালের একটি নীতি-পর্যালোচনায় বাংলাদেশের আত্মহত্যা-সংক্রান্ত সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে জাতীয় ডেটাবেইসের অনুপস্থিতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে (আরাফাত, ২০২৫)। বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ ও ২০২৫—উভয় বছরেই ঢাকা বিভাগে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর অংশ সর্বাধিক এবং প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০২৫ সালে বরিশাল ও রাজশাহীর অংশ যথাক্রমে ৩.৪৪ ও ১.৭১ শতাংশ-পয়েন্ট বৃদ্ধি পেলেও চট্টগ্রামে ০.১৭ শতাংশ-পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে।
বছর | আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর নথিভুক্ত/প্রকাশিত সংখ্যা
২০১২ | ৯৬৪২
২০১৩ | ১০১২৯
২০১৪ | ১০৪০০
২০১৫ | ১০৫০০
২০১৭ | ১১০৯৫
২০২৫ | ১৩,৪৯১ জানুয়ারি-নভেম্বর; পূর্ণবছর নয়
বছরভিত্তিক আত্মহত্যার হার বা বিস্তৃতি (২০১৩–২০২৫)। উৎস: বাংলাদেশ পুলিশ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ২০১২ সালের ৯,৬৪২ থেকে বেড়ে ২০১৭ সালে ১১,০৯৫-এ পৌঁছেছে এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারি-নভেম্বরেই ১৩,৪৯১টি মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে, যা আত্মহত্যা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক মাত্রা নির্দেশ করে।
আত্মহত্যার বহুমাত্রিক কারণসমূহ
আত্মহত্যা কোনো একক ঘটনার ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের মানসিক ব্যাধি, ঋণের বোঝা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি এবং কারও কাছে কিছু খুলে বলতে পারা বা সহায়তা না পাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে আত্মহত্যার প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের সংবাদপত্রে প্রকাশিত ২৭১টি ঘটনা বিশ্লেষণ করে শাহ ও অন্যান্য (২০১৭) দেখেছেন, ৩৪.৩২ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ অথবা পারিবারিক অশান্তি যুক্ত ছিল। এছাড়া অন্যান্য কারণের মধ্যে প্রেম বা সম্পর্কজনিত বিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা, বিবাহবিচ্ছেদ, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, কর্মক্ষেত্রের সমস্যা এবং শারীরিক অসুস্থতা অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরাফাত ও অন্যান্য (২০১৭) কেইস কন্ট্রোল সাইকোলজি অটোপসি গবেষণায় দেখেছেন, মানসিক ব্যাধির উপস্থিতি আত্মহত্যার ঝুঁকির সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে সাম্প্রতিক প্রতিকূল পরিস্থিতি বা জীবনঘটনা এ ধরনের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে রংপুর মেডিকেল হাসপাতালে আত্মহত্যার চেষ্টা করা ১০১ জন রোগীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় ৬৫% রোগীর অন্তত ১টি মানসিক রোগ শনাক্ত হয় এবং ১৮% রোগীর মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার ছিল, ৪৯% পারিবারিক বা গৃহস্থালি কলহের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ৫৮% প্রচেষ্টা ছিল আকস্মিক বা ইমপালসিভ। তদুপরি, ৬৩% অংশগ্রহণকারীর আত্মহত্যার প্রচেষ্টার আগে সুস্পষ্ট আত্মহত্যামূলক চিন্তার ইতিহাস পাওয়া যায়নি (রয় ও অন্যান্য, ২০২৩)। এই ফলাফল থেকে বোঝা যায় যে, শুধু পূর্বঘোষিত সুইসাইডাল আইডিয়েশন শনাক্ত করার ওপর নির্ভর করলে ঝুঁকিতে থাকা অনেক ব্যক্তি নজরদারির বাইরে থেকে যেতে পারেন। এছাড়াও চুয়াডাঙ্গাতে নারীর অসহায়ত্ব, বহুবিবাহের ফলে পারিবারিক সহিংসতা, পুরুষের ওপর নারীর অধিকমাত্রায় অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা আত্মহত্যার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ আত্মহত্যার পেছনে নানাবিধ কারণ দায়ী।
বয়সভিত্তিক প্রবণতা ও কারণ
বাংলাদেশে কিশোর ও তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকি দেখা যায়। জাতীয়ভাবে প্রতিনিধিত্বশীল বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে-এর তুলনামূলক বিশ্লেষণে ২০০২ সালে ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর আত্মহত্যার হার সর্বোচ্চ ছিল—প্রতি লাখে ১৩ জন। কিন্তু ২০১৫ সালে সর্বোচ্চ হার পাওয়া যায় ১০–১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে—প্রতি লাখে ২২.৯ জন (ইসলাম ও অন্যান্য, ২০২৬)। অন্যদিকে সংবাদপত্রভিত্তিক গবেষণায় মোট ঘটনার ৬১% সংঘটিত হয়েছিল ৩০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে এবং ২৩.৬২% ছিলেন শিক্ষার্থী (শাহ ও অন্যান্য, ২০১৭)। একইভাবে (রয় ও অন্যান্য, ২০২৩) গবেষণায় ৪১.৫৯% আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকারীর বয়স ছিল ২০ বছরের নিচে এবং ৩৮.৬২% ছিলেন শিক্ষার্থী। কিশোর ও তরুণদের ঝুঁকির সঙ্গে পরীক্ষার চাপ, ফলাফল নিয়ে হতাশা, পারিবারিক প্রত্যাশা, মাদকদ্রব্যের প্রতি কৌতূহল, প্রেম বা সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, সামাজিক অপমান, বুলিং, ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের অপরিপক্বতা সম্পর্কিত হতে পারে। যশোর জেলার শৈলকুপাতে দীর্ঘদিন ধরে রোগে আক্রান্ত বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে আত্মহত্যার হার লক্ষ্যণীয়। তরুণ বয়সে পারিবারিক নির্ভরতা বেশি থাকায় পারিবারিক অশান্তি, কঠোর নিয়ন্ত্রণ, যোগাযোগের অভাব এবং প্রত্যাশার চাপের প্রভাব তুলনামূলকভাবে তীব্র হতে পারে। অন্যদিকে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতা, শোক, একাকিত্ব, আর্থিক নির্ভরশীলতা এবং সামাজিক ভূমিকা হারানো ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অতএব, বয়সভিত্তিক প্রতিরোধব্যবস্থায় এবং জীবনচক্রভিত্তিক আলাদা কৌশল প্রয়োজন।
আঞ্চলিক ও ভৌগোলিক প্রভাব
বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে আত্মহত্যার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। শাহ ও অন্যান্য (২০১৭)-এর বিশ্লেষণে গ্রামীণ এলাকার আত্মহত্যার ঘটনা ৬০.৮৯%। রয় ও অন্যান্য (২০২৩) তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকারীদের ৭২.২৮% ছিলেন গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা। জাতীয় সার্ভে-ভিত্তিক তুলনাতেও ২০০২ ও ২০১৫—উভয় বছরেই শহরের তুলনায় গ্রামীণ অঞ্চলে আত্মহত্যার হার বেশি পাওয়া গেছে (ইসলাম ও অন্যান্য, ২০২৬)। গ্রামীণ এলাকার এই অধিক ঝুঁকির সঙ্গে কয়েকটি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত উপাদান কাজ করতে পারে: মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমিত প্রাপ্যতা, মনোরোগ সম্পর্কে কুসংস্কার, সামাজিক কলঙ্ক, পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে গোপনীয় সহায়তার অভাব, দারিদ্র্য, নিম্নশিক্ষা, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিষাক্ত কীটনাশকের সহজলভ্যতা। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর অঞ্চলে প্রাণঘাতী কীটনাশক সহজে পাওয়া যাওয়ায় আকস্মিক সংকট দ্রুত গুরুতর আত্মহানিতে রূপ নিতে পারে। তবে বর্তমানে শহরাঞ্চলে আত্মহত্যার হার গ্রামীণ এলাকার তুলনায় উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে তীব্র মানসিক চাপ, একাকীত্ব, প্রতিযোগিতামূলক জীবনযাত্রা, যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি এবং সম্পর্কের অবক্ষয়। অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়েছে যে, চুয়াডাঙ্গা দেশের অত্যধিক উষ্ণতম স্থান হওয়ায় সেখানে অধিক পরিমাণে আত্মহত্যার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার বাংলাদেশে এপ্রিল-মে এ সময়টাই সর্বাধিক তাপমাত্রা থাকায় আত্মহত্যার প্রবণতা এ সময়টাই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশের আত্মহত্যার আঞ্চলিক চিত্র ব্যাখ্যা করতে শহর-গ্রাম, জেলা, লিঙ্গ, বয়স এবং আর্থসামাজিক অবস্থাকে একত্রে বিবেচনা করে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
মানসিক ব্যাধি ও চিকিৎসাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা
মানসিক অবসাদ, মাদকাসক্তি, ব্যক্তিত্বের সংকট, উদ্বেগজনিত ব্যাধি এবং অন্যান্য মানসিক অসুস্থতার হার আত্মহত্যার ঝুঁকিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং মানসিক রোগের সঙ্গে আত্মহত্যার শক্তিশালী সম্পর্ক পাওয়া যায় এবং অধিকাংশ ব্যক্তি আত্মহত্যার ঘটনার আগে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেননি। সেবার সীমিত প্রাপ্যতা, খরচ, সামাজিক কুসংস্কার, প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি এবং মানসিক সমস্যাকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখার প্রবণতা চিকিৎসা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। গুরুতর আত্মহত্যার প্রচেষ্টার পর শুধু শারীরিক চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। পুনরায় আত্মহানির ঝুঁকি, বর্তমান অভিপ্রায়, মানসিক ব্যাধি, মাদকদ্রব্য সেবন, পারিবারিক সহায়তা, প্রাণঘাতী উপকরণে প্রবেশাধিকার এবং ডিসচার্জ ইত্যাদি বিষয়াবলী মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এমন কিছু যেমন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, মনোচিকিৎসা, থেরাপিউটিক্যালি সেবা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক ফলোআপ প্রদান করা জরুরি (ম্যাথু এট আল., ২০২৫)।
উপকরণের সহজলভ্যতা ও ইমপালসিভনেস
রয় ও অন্যান্য (২০২৩)-এর গবেষণায় দেখেন, ৫৬% আত্মহত্যার প্রচেষ্টা বিষক্রিয়ার মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছিল। গবেষণালগ্ন অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে যে, বর্তমানে গ্যাস ট্যাবলেট আত্মহত্যার জন্য অন্যতম সহজ উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যুবক, যুবতী, কিশোর, কিশোরীরা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং আবেগপ্রবণ, তাই এই বয়সের অনেকেই কোনো সংকটকালীন সময়ে দীর্ঘ চিন্তাভাবনা না করেই এই ধরনের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং উপকরণের সহজলভ্যতা থাকাতে তা ব্যবহার করে। সুতরাং এই উপকরণের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ কার্যকর এবং সহজলভ্যতা কঠোর হলে আত্মহত্যা কমতে পারে।
করণীয় বিষয়সমূহ
১. তথ্য ও মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ
প্রতিটি থানা, হাসপাতাল, জরুরি বিভাগ, ফরেনসিক বিভাগ ও কমিউনিটি পর্যায়ের একটি অভিন্ন সংজ্ঞা ও রিপোর্টিং প্রটোকল অনুসারে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। তথ্যের মধ্যে বয়স, লিঙ্গ, পেশা, শিক্ষাগত অবস্থা, জেলা, ব্যবহৃত উপকরণ, পূর্ববর্তী প্রচেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট সাইকোলজিক্যাল ফ্যাক্টর অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। জাতীয় তদারকি ব্যবস্থা ছাড়া উচ্চঝুঁকির জেলা, বয়স বা জনগোষ্ঠী নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব নয় (ইসলাম ও অন্যান্য, ২০২৬; শাহ ও অন্যান্য, ২০১৭)।
২. কমিউনিটি বেজড কাউন্সেলিং ও সোশ্যাল সাপোর্ট প্রদান
আত্মহত্যার ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধে কমিউনিটি-ভিত্তিক কাউন্সেলিং ও সামাজিক সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা যেতে পারে। এ কার্যক্রমের আওতায় সংশ্লিষ্ট এলাকার কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং অন্যান্য স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর ও কমিউনিটি পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারেন। প্রয়োজনে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী বা কাউন্সেলররা কিশোর-কিশোরীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের মানসিক অবস্থা, পারিবারিক ও সামাজিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা গ্রহণ করবেন এবং ব্যক্তিগতভাবে কাউন্সেলিং প্রদান করবেন। পাশাপাশি কিশোর-কিশোরী ও তাদের অভিভাবকদের নিয়ে সচেতনতামূলক আলোচনা সভা, উঠান বৈঠক ও ছোট পরিসরের গ্রুপ সেশন আয়োজনের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মহত্যার ঝুঁকি, সংকট মোকাবিলা এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে কোনো কিশোর-কিশোরীর মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা, আত্মক্ষতির প্রবণতা বা গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত হলে, তার প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট বা সংশ্লিষ্ট মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর কাছে রেফার করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে রেফার করা ব্যক্তির পরবর্তী চিকিৎসা ও মানসিক অবস্থার বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর ও প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
৩. প্রতিটি স্কুল-কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার, মনোবিজ্ঞানী এবং কাউন্সেলর নিয়োগ প্রদান
প্রথমত, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি; দ্বিতীয়ত, বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা, বুলিং, অপব্যবহার ও আত্মহত্যার চিন্তা শনাক্ত করার রেফারেল প্রটোকল ব্যবস্থা থাকা দরকার; তৃতীয়ত, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর অথবা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ; চতুর্থত, পরীক্ষার ফল, সম্পর্ক বিচ্ছেদের পর ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীর ফলোআপ; পিয়ার সাপোর্ট (সমবয়সীদের সাহায্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা) ব্যবস্থা এবং ক্লায়েন্টের তথ্যের গোপনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সাহায্য দেওয়ার ব্যবস্থা, সামাজিক ও আবেগীয় জীবনদক্ষতা, সমস্যা সমাধান ও মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনার শিক্ষা অত্যাবশ্যকীয়। WHO-এর LIVE LIFE কাঠামোতে তরুণদের মনোসামাজিক জীবনদক্ষতার বিকাশকে জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধের প্রধান হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে (ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন, ২০২৩)। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শিক্ষক, সংগীত শিক্ষকের ন্যায় মনোবিজ্ঞানী এবং পেশাগত ক্লিনিক্যাল সোশ্যাল ওয়ার্কার বা সোশ্যাল ওয়ার্কার নিয়োগদানের ব্যবস্থা করতে হবে। ১৯৬০ সালে এ অঞ্চলে স্কুল সোশ্যাল ওয়ার্কার থাকলেও তা পরবর্তীতে বিলুপ্তি করা হয়, পুনরায় তা চালু করতে হবে।
৪. মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ
প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং জেলা হাসপাতালে বিষণ্নতা, মাদকাসক্ত ও আত্মঘাতী আচরণসম্পন্ন ব্যক্তিকে শনাক্ত করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। চিকিৎসক, নার্স এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের ঝুঁকি মূল্যায়ন ও রেফারাল ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকারীকে ডিসচার্জ দেওয়ার আগে সাইকিয়াট্রিক অ্যাসেসমেন্ট, সংকট মোকাবিলার পরিকল্পনা, পরিবারের সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর পরবর্তী সাক্ষাৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত (রয়, ২০২৩)।
৫. প্রাণঘাতী উপকরণের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ
কীটনাশক বিক্রিতে লাইসেন্স, নিরাপদ সংরক্ষণ, উচ্চঝুঁকির রাসায়নিক পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার এবং কৃষক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহ চালু করা প্রয়োজন। ওষুধের অতিরিক্ত সরবরাহ সীমিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির ক্ষেত্রে পরিবার-নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণ কার্যকর হতে পারে, কারণ গ্যাস ট্যাবলেট ও কীটনাশকের সহজলভ্যতার জন্য কৃষিপ্রধান এলাকাগুলোতে আত্মহত্যার হার অনেক বেশি।
৬. পরিবার ও কমিউনিটিভিত্তিক সহায়তা
পরিবারের সদস্যদের আচরণগত পরিবর্তন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, হতাশা, ঘুমের সমস্যা, আত্মহানির কথা বলা এবং পূর্ববর্তী প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিচারমূলক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে সক্রিয়ভাবে শোনা, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত পেশাগত সহায়তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন প্রয়োজন। পারিবারিক কলহ বা সহিংসতা ও যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে গোপনীয় অভিযোগ, আইনি সহায়তা এবং মনোসামাজিক সেবা একই কাঠামোয় যুক্ত করে সমন্বিত উপায়ে সার্ভিস চালু করা।
৭. গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল প্রতিবেদন
আত্মহত্যার সংবাদে পদ্ধতির বিস্তারিত বিবরণ, লোমহর্ষক শিরোনাম, ব্যক্তিকে দোষারোপ এবং ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করা পরিহার করতে হবে। প্রতিটি প্রতিবেদনে সহায়তার উৎস, সতর্কসংকেত ও প্রতিরোধযোগ্যতার তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। WHO দায়িত্বশীল গণমাধ্যম প্রতিবেদনকে চারটি প্রধান LIVE LIFE হস্তক্ষেপের একটি হিসেবে নির্ধারণ করেছে (ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন, ২০২১)।
৮. উচ্চঝুঁকির ব্যক্তির ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনা
পূর্ববর্তী আত্মহত্যার প্রচেষ্টা, বর্তমান আত্মহত্যার ইচ্ছা, মানসিক ব্যাধি, জীবনের সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা, যৌন নির্যাতন, মাদকদ্রব্যের ব্যবহার এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা থাকলে সমন্বিত ঝুঁকি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। গুরুতর বা তাৎক্ষণিক ঝুঁকির ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমিক পর্যবেক্ষণ, মানসিক স্থিতিশীলতা আনয়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ইনপেশেন্ট কেয়ার বিবেচনা করতে হবে। ঝুঁকি কমে গেলেও নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুযায়ী ফলোআপ, সাইকোথেরাপি, ওষুধের মাত্রা কমানো এবং পরিবারভিত্তিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে (আরাফাত ও অন্যান্য, ২০২১)।
উপসংহার
বাংলাদেশে আত্মহত্যা একটি ক্রমবর্ধমান ও বহুমাত্রিক জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যার পেছনে অনেকগুলো কারণ বিদ্যমান রয়েছে, বিশেষত মানসিক ব্যাধি, পারিবারিক ও দাম্পত্য দ্বন্দ্ব, প্রতিকূল পরিস্থিতি, আর্থিক অনিশ্চয়তা, শিক্ষাজীবনের চাপ, সম্পর্কজনিত সংকট, সহিংসতা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং প্রাণঘাতী উপকরণ। গবেষণার ফলাফলে কিশোর-তরুণ, শিক্ষার্থী, নারী এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে তুলনামূলকভাবে অধিক ঝুঁকির প্রবণতা দৃশ্যমান হয়েছে। তবে বিদ্যমান তথ্যের বড় অংশ হাসপাতাল, পুলিশ ও সংবাদমাধ্যমনির্ভর হওয়ায় দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণে এখনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত, প্রমাণভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা। নির্ভরযোগ্য জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং সেবা চালু, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ঝুঁকি শনাক্তকরণ, আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকারীদের ধারাবাহিক চিকিৎসা ও অনুসরণ, পারিবারিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, সহিংসতা প্রতিরোধ, দায়িত্বশীল গণমাধ্যম প্রতিবেদন এবং প্রাণঘাতী উপকরণের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আত্মহত্যাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা অপরাধ হিসেবে না দেখে প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করলেই ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য সময়মতো সহায়তা নিশ্চিত করা এবং অকাল প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
অধ্যাপক তাহমিনা আখতার
সভাপতি-সোশ্যাল ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ
উপাচার্য-রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ