বিদ্যুৎ-জ্বালানি সরবরাহ বাড়লেও সংকট এখনো কাটেনি

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষণার পর থেকে দেশে আমদানি করা তরল গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তাকেও যথেষ্ট বলে মনে করছেন না শিল্পমালিকরা।

দেশে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে গতকাল মঙ্গলবার রাত ৮টায় সরবরাহ করা হয় ২ হাজার ৬২৪ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ করা হয় ১ হাজার ৬০৯ মিলিয়ন ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ১ হাজার ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এলএনজি থেকে সর্বোচ্চ সরবরাহ করার পরও প্রায় ১ হাজার ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, গত সোমবার পর্যন্ত ৪টি এলএনজি কার্গো এসেছে। ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আরও ৫টি কার্গো আসবে। সেই হিসাবে চলতি মাসে আর সংকট হওয়ার কথা না। আগামী মাসের এলএনজিও কেনা হচ্ছে।

অন্যদিকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়লেও গতকাল বিকেলে সরকারি হিসাবে বিদ্যুতের প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং ছিল। রাতে বিদ্যুৎ চাহিদা এবং উৎপাদনের যে প্রক্ষেপণ ছিল, তাতে দেখা যায় রাতে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকবে ১ হাজার ৩৬০ মেগাওয়াট। অর্থাৎ গ্যাসের সরবরাহ বাড়লেও বিদ্যুতের লোডশেডিং খুব একটা কমেনি।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত সোমবার জানান, মঙ্গলবার (গতকাল) থেকে কারখানায় গ্যাসের সংকট থাকবে না। সোমবার রাত ৯টার পর থেকেই এলএনজি সরবরাহ বাড়তে শুরু করে। রাত ৯টার দিকে এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে ৯৮০ মিলিয়ন ঘনফুট করা হয়। গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকা-ের পর এটিই এলএনজি থেকে গ্যাস সরবরাহের সর্বোচ্চ অবস্থা।

এদিকে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) বলছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে দেশের পোশাকশিল্প ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে। জাহাজীকরণ বা শিপমেন্টে বিলম্বে ক্রেতার আস্থা হারাচ্ছে পোশাক রপ্তানি খাত।

বিকেএমইএর পক্ষ থেকে করা একটি সমীক্ষা প্রতিবেদনে গতকাল বলা হয়েছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ডাইং কারখানাগুলোর উৎপাদন গড়ে প্রায় ৫১ শতাংশ কমেছে। নিটিংয়ে কমেছে ৩৭ থেকে ৩৮ শতাংশ এবং তৈরি পোশাকের সেলাই উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

বিকেএমইএ জানায়, চালু কারখানার ২০ শতাংশের ওপর সমীক্ষা করে তারা এই চিত্র দাঁড় করিয়েছে। এতে দেখা যায়, বিদ্যুৎ সংকটের কারণে প্রায় ৯০ শতাংশ কারখানার উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। আর গ্যাস সংকটে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ কারখানার। অন্যান্য সংকটের কারণে ১৪ শতাংশ কারখানা সংকটে রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব কারখানা গ্যাসের চাপের তথ্য দিয়েছে, তাদের স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় বর্তমান সরবরাহে গড়ে প্রায় ৭৮ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। একইভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়ও বেড়েছে ব্যাপকভাবে। যেসব কারখানা লোডশেডিংয়ের তথ্য দিয়েছে, সেখানে দেখা যায়, আগের তুলনায় দৈনিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় গড়ে প্রায় ২০০ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় প্রায় তিনগুণ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।

শুধু উৎপাদন কমেই থেমে নেই সংকটের প্রভাব। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানাকে। প্রায় ৮৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ক্রেতার আস্থা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। ৮৭ শতাংশের শিপমেন্টে বিলম্ব হয়েছে।

এ ছাড়া প্রায় ৭৮ শতাংশ কারখানার উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ হয়েছে। প্রায় ৬০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানকে ক্রেতাকে মূল্য ছাড় দিতে হয়েছে। ব্যাংক ঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে প্রায় ৫৯ শতাংশ। আর ৫৫ শতাংশ কারখানায় রপ্তানি আদেশ বাতিল বা কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সংকটের কারণে প্রায় ৭ শতাংশ ক্ষেত্রে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্যের ভৌগোলিক বিশ্লেষণেও সংকটের বিস্তৃতি স্পষ্ট হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সাড়া এসেছে নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রায় ৪৫ থেকে ৪৬ শতাংশ। গাজীপুর থেকে এসেছে প্রায় ২০ শতাংশ, চট্টগ্রাম থেকে ১৮ শতাংশ এবং ঢাকা থেকে ১৩ শতাংশ। অন্যান্য এলাকা থেকে এসেছে প্রায় ৩ শতাংশ সাড়া।

গ্যাসের সরবরাহ বাড়ায় কারখানা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে কি না জানতে চাইলে বিকেএমইএর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম জানান, এখনো সে অর্থে সরবরাহ বাড়েনি। তিনি ঢাকা এবং আশপাশের এলাকায় খবর নিয়ে দেখেছেন, কোথাও গ্যাসের চাপ ১৫ পিএসআই, আবার কোথাও এক, দুই এমনকি শূন্যও রয়েছে। তবে ভালুকার দিকে একটি কারখানায় চাপ ৮ এবং আরেকটি কারখানায় ৪ পাওয়া গেছে। তিনি জানান, চট্টগ্রামের কারখানাগুলোতে সরবরাহ ৮ থেকে ১০-ও পাওয়া যাচ্ছে। গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো হলেও ঢাকা এবং আশপাশের এলাকায় আসতে তা এক থেকে দেড় দিন লাগতে পারে।

জানতে চাইলে সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর জানান, এখনো সিএনজিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আগে যা ছিল, এখনো এমনই গ্যাস পাচ্ছেন তারা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত