বাংলাদেশে উন্নয়ন-বিতর্ক, জনস্বার্থ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষায় অবিচল কণ্ঠস্বর অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। দীর্ঘ চার দশকের অধ্যাপনার গন্ডি পেরিয়ে রাজপথের প্রতিরোধ আন্দোলন অর্থনীতি ও সমাজভাবনার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে সবসময় আপসহীন। তার অর্থনীতিবিদ হওয়ার গল্পটি ছিল নিতান্তই আকস্মিক ও অপরিকল্পিত। রাষ্ট্রভাবনা, জীবনদর্শনসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
প্রশ্ন : অর্থনীতিতে আপনার আগ্রহ কীভাবে শুরু হলো? মানে অর্থনীতির প্রতি আপনার আগ্রহের জায়গাটা কোথায় থেকে শুরু?
আনু মুহাম্মদ : না, অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হওয়া কিংবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া কোনোটাই পরিকল্পিত ছিল না। সবই ছিল পরিকল্পনা ছাড়া।
ছোটবেলায় আমি শুনতাম যে আমি ডাক্তার হব। আমার গায়ের রঙ কালো বলে আমার মা ঠাট্টা করে আমাকে ‘কালা ডাক্তার’ বলে ডাকতেন। আমাদের পাড়ায় ‘কালা ডাক্তার’ নামে এক ব্যক্তি ছিলেন। মা ঠাট্টা করে বলতেন, ‘এই যে আমাদের আরেকজন কালা ডাক্তার আসছে।’
আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পরীক্ষা দেই, তখন আমার মা মারা যান। এরপর আমার পড়াশোনা ও জীবন কিছুটা অগোছালো হয়ে পড়ে।
উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষার পরও মায়ের সেই কথাটি আমার মনে ছিল। তাই আমি মেডিকেলে পরীক্ষা দিই। ইন্টারমিডিয়েটে আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম এবং জীববিজ্ঞান ছিল চতুর্থ বিষয়। কিন্তু ততদিনে আমার চিন্তা ভাবনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে, বড় পরিবর্তন আসে সম্ভবত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রভাবে।
মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই আমি লেখালেখি করতাম। ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই কবিতা, ছড়া, গল্প ও গদ্য ইত্যাদি লিখে ছোটদের পাতায় পাঠাতাম। সেগুলোর কিছু কিছু ছাপা হতো। চারপাশের নানা কিছু নিয়েই লিখতাম।
’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ বড় একটি ধাক্কা দেয়। নিজে নানাভাবে এর সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম এবং আমার পুরো মনোযোগ তখন রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি চলে গেল। তখন ভিয়েতনাম, কিউবা ও চীনের কথা শুনি; মানুষের সংগ্রাম ও বিপ্লবের কথা শুনি। আগ্রহ সেদিকেই।
স্বাধীনতার পর প্রবন্ধের দিকে আগ্রহ বাড়ে, আমার পড়াশোনাও ইতিহাস, দর্শন ও রাজনীতির দিকে পরিচালিত হতে থাকে। আমি তখন বিভিন্ন দেশের মুক্তির সংগ্রাম এবং বিভিন্ন বিপ্লবীর কাহিনি সম্পর্কে জানতে চাইতাম। বৈষম্য ও মুক্তির সংগ্রাম নিয়ে বোঝা এবং লেখার চেষ্টা করতাম।
প্রশ্ন : তখন আপনার বয়স কত ছিল?
আনু মুহাম্মদ : ১৫ বছর। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিই।
বিচিত্রা তখন একমাত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে মনোযোগ দিত এবং বেশ জনপ্রিয় ছিল। আমি পোস্টে সেখানেও লেখা পাঠাই। তার মধ্যে একটি লেখা তারা বেশ গুরুত্ব দিয়ে এক পৃষ্ঠা জুড়ে ছাপে। লেখার শিরোনাম ছিল, ‘অবিলম্বে স্কুল-কলেজ সব বন্ধ করে দাও এক বছরের জন্য।’
মুক্তিযুদ্ধের পরপর আমাদের বা আরও বড় বয়সের অনেকের মধ্যেই, স্কুলে যাওয়ার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না। তারা দেশের জন্য, গ্রামে বা বস্তিতে গিয়ে কাজ করতে চাচ্ছিল। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী তরুণ প্রজন্মের মানসিকতা কী ছিল, তা আমি নিজেকে দিয়ে বুঝতে পারছিলাম। যা সরকার কিংবা রাজনীতিকরা অনুধাবন করতে পারছিলেন না।
তখন যদি তরুণদের বলা হতো যে তোমরা গ্রামে গিয়ে খাল কাটো, বস্তিতে গিয়ে নিরক্ষরতা দূর করো কিংবা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ পরিষ্কার করো তবে তাই হতো। কিউবাতে স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা ব্রিগেড তৈরি করে এক-দুই বছরের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করেছিল। সেটা তখন আমার জানা ছিল না, কিন্তু সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হয়েছিল যে এখন স্কুল-কলেজ বন্ধ করে ছেলেমেয়েদের সবাইকে গ্রাম ও বস্তিতে পাঠানো উচিত। সেটাই আমি লিখেছিলাম।
ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর আমি গ্রামে গিয়ে নানাবাড়িতে বেশ কিছুদিন অবস্থান করি এবং বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখি। এরপর ফিরে এসে আবার লিখলাম যে, গ্রামে খাদ্যাভাব ও দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে, মানুষের মনে ক্ষোভ ও সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং প্রত্যাশা ভঙ্গ হচ্ছে।
গ্রামে যা দেখেছি, তা নিয়েই বিচিত্রাতে লিখেছি। ফলে লেখালেখির ধরনটি আস্তে আস্তে পরিবর্তিত হতে থাকে। এরপর আমি যখন নিজে সরাসরি বিচিত্রা কার্যালয়ে গেলাম, ততদিনে দেশ দুর্ভিক্ষের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
তখন বিচিত্রার সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরী, শাহরিয়ার কবির, মাহফুজ উল্লাহ, মুনতাসীর মামুন তারা সবাই উপস্থিত ছিলেন।
তারা আমাকে দেখে কিছুটা অবাক হলেন, কারণ লেখক আনু মুহাম্মদ এত অল্প বয়সী তারা ভাবেননি। যাই হোক, শাহাদাত ভাই তরুণদের খুব উৎসাহ দিতেন এবং আমাকেও অনেক উৎসাহিত করেন। দুর্ভিক্ষ নিয়ে সিরিজ লিখেছিলাম।
ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময়ও লেখালেখি অব্যাহত থাকে। নিয়মিত ক্লাস করা হতো না। আমার সাইকেল থাকায় যাতায়াত সহজ ছিল। আমি বিভিন্ন লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়তাম এবং মানুষের কথা শুনতাম। নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আমাকে থাকতে হয়নি, যেখানে ইচ্ছা যেতে পারতাম।
সাইকেল থাকায় যাতায়াত খরচ লাগত না এবং তখন ঢাকা শহরে সাইকেলে চলাফেরা করা যেত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়াশোনা করতাম। হাকিম চত্বরে টোস্ট বিস্কুটের ওপর মাখন দেওয়া খাবার পাওয়া যেত। দুটি টোস্ট বিস্কুট আর এক কাপ লাল চা বা দুধ চা খেলে দুপুরের সময়টা মোটামুটি পার হয়ে যেত। তারপর লাইব্রেরিতে পড়াশোনা শেষ করে বিকেলে বাসায় ফিরতাম।
এভাবেই আমার মনোযোগ অন্যদিকে চলে যায়।
উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ভাবলাম আমার ডাক্তার হওয়ার কথা, তাই মেডিকেলে পরীক্ষা দিলাম। রংপুরে মেডিকেলে আমার সুযোগ হলো এবং সেখানে ভর্তি হতে হতো। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল মেডিকেলে ভর্তি হলে আমি মূল জগৎ থেকে অন্যদিকে চলে যাব।
তা ছাড়া আমাদের সামনের বাসার একজন মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার এক বছর পর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফিরে এসেছিল।
প্রশ্ন : পড়াশোনার চাপে?
আনু মুহাম্মদ : পড়াশোনার চাপ ছাড়াও, কাটাকাটি নিয়ে আমার টেনশন ছিল। তারপর আমি মেডিকেলে গিয়ে পরিবেশ দেখলাম। সেখানে কাটাকাটি দেখে ভাবলাম, এমনিতেই তো আমার মন এখানে নেই, তার ওপর এই পরিবেশ দেখে মনে হলো আমার অবস্থাও হয়তো তেমনই হবে।
এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা মাথায় এলো। বিচিত্রায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর একটি প্রচ্ছদ কাহিনি দেখেছিলাম যে নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয়, হল রয়েছে ইত্যাদি।
মেডিকেলের পর্ব শেষ হওয়ার পর জাহাঙ্গীরনগরের কথা মনে হওয়ার মূল কারণ ছিল, তারা একটি বিজ্ঞাপন দিয়েছিল যে তাদের আসন খালি আছে। দ্বিতীয় দফা ভর্তি হবে।
আমার হলে থাকার ইচ্ছা ছিল। জাহাঙ্গীরনগর গেলাম। গিয়ে দেখলাম কিছু বিভাগে আসন খালি আছে। দর্শনের প্রতি আমার আকর্ষণ ছিল। কিন্তু জানলাম দর্শন কোনো পূর্ণাঙ্গ বিভাগ নয়, সাবসিডিয়ারি বিষয়।
পূর্ণাঙ্গ বিভাগ ছিল পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন এবং অর্থনীতি। লেখালেখির অভিজ্ঞতার কারণে মনে হলো অর্থনীতি বিষয়টাই আমার চিন্তাধারার কাছাকাছি হতে পারে।
এভাবেই অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হওয়া। জাহাঙ্গীরনগরে যাওয়াও একইভাবে হয়েছে দুটি সিদ্ধান্তই ছিল অপরিকল্পিত। আমার বাবা গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, তিনিও জানতেন না যে আমি নিজে গিয়ে ভর্তি হয়ে এসেছি।
প্রশ্ন : জানার পর উনার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
আনু মুহাম্মদ : জানার পর কিছুটা প্রতিক্রিয়া দেখালেও পরে মেনে নিয়েছিলেন। কারণ ততদিনে আর কোনো বিকল্প ছিল না।
প্রশ্ন : আপনার নৃবিজ্ঞান পড়ানোর সূচনা কীভাবে হলো? সেটাও কি অপরিকল্পিতভাবে হয়েছে?
আনু মুহাম্মদ : সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানে একাডেমিকভাবে যেসব বিষয় আলোচনা করা হয়, সে ধরনের কাজ আমি আগেই কিছু করেছিলাম। যেমন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর আমাদের ‘গ্রামীণ সমাজের অর্থনীতি’ বইটি দেখে বলেছিলেন যে, আমি তো নৃবিজ্ঞানের কাজ আগেই করে রেখেছি।
নৃবিজ্ঞানের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। জাহাঙ্গীরনগরে যখন নৃবিজ্ঞান বিভাগ চালু হলো, তখন আমাদের বিভাগের একজন শিক্ষক এর দায়িত্ব নেন। এরপর বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর সাহেব এলেন। রেহনুমা ও ফারজানা তারা দুজন ছিলেন মূল শিক্ষক। আমি এই বিভাগে বহু বছর একাধিক কোর্স পড়িয়েছি। শেষের দিকে ‘অ্যানথ্রপোলজি অব রিলিজিয়ন’ কোর্সটি পড়াতাম।
বিষয়টি আমার কাছে খুব আকর্ষণীয় মনে হতো। শিক্ষার্থীরা এ বিষয়ে অনেক ফিল্ডওয়ার্ক করেছিল, যা বেশ ভালো হয়েছিল।
প্রশ্ন : আপনি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করছেন এবং বিভিন্ন প্রজন্মকে দেখেছেন। বিষয়টি আপনার কাছে কেমন লাগে? আপনি সময়ের সঙ্গে কী কী পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন? বিশেষ করে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জায়গায় তরুণরা আগে কীভাবে ভাবত আর এখন কীভাবে ভাবে?
আনু মুহাম্মদ : ১৯৭০-এর দশকেই বিচিত্রা পত্রিকায় তরুণদের ওপর জরিপ করে আমি ‘গন্তব্য কোথায়’ শিরোনামে লিখেছিলাম যে তরুণরা কোথায় যাচ্ছে এবং কী করছে।
এরপর ১৯৮০-এর দশকে ‘এই সময়ের তরুণেরা’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ লেখা লিখেছিলাম। অধ্যাপক মোস্তফা নূরউল ইসলাম পরিচালিত একটি প্রবন্ধ পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশিত হয়। লেখাটিতে ৭০ ও ৮০-এর দশকের তরুণদের মধ্যকার মিল ও অমিলগুলো তুলে ধরা হয়েছিল।
তরুণদের সঙ্গে বর্তমানের তুলনামূলক একটি লেখা নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরে চিন্তা করছি। সবকালেই প্রবীণরা প্রায়ই বলে থাকেন যে তরুণরা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এ ধরনের কথার কোনো যুক্তি নেই। নিজেদের দায়দায়িত্ব তরুণদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ‘আমাদের সময়ে আমরা কত ভালো ছিলাম, আর এখনকার তরুণদের কোনো আগ্রহ নেই’ বলে যে অবক্ষয়ের কথা বলা হয়, তা এক ধরনের মুখস্থ কথা। একাধিক প্রজন্মে তরুণদের দেখে আমার কখনোই এমনটা মনে হয়নি।
৮০-এর দশকে একটি বিষয় লক্ষ্য করেছিলাম, এখনো দেখি কিছু অংশ তরুণদের সঙ্গে প্রবীণদের চিন্তাভাবনা মিলে যায়। যেমন প্রবীণরা যেমন প্রতিষ্ঠামুখী, তরুণরাও তেমনি হয়ে পড়ছিল। কিন্তু তরুণদের তো এ রকম আপসমুখী হওয়ার কথা না।
বার্ট্রান্ড রাসেলের একটি কথা আমার খুব তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। তিনি বলেছিলেন, পশ্চিমা বিশ্বে তরুণরা সিনিক হয় কারণ তাদের সামনে তেমন কিছু পরিবর্তনের সুযোগ থাকে না। আর তৃতীয় বিশ্বের তরুণরা বিপ্লবী হয়, কারণ তাদের সামনে পরিবর্তনের তাগিদ ও সুযোগ তৈরি হয়।
প্রশ্ন : ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে কি আমরা এই ঘটনাটাই দেখলাম?
আনু মুহাম্মদ : ২৪ এই প্রথম তরুণরা এমন কাজ করেছে তা নয়, ইতিহাসে সবসময় তরুণরাই পরিবর্তন আনে। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিল, তাদের প্রধান অংশের বয়স ছিল ১৯ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এটি নতুন কোনো ইতিহাস নয়, ইতিহাসজুড়ে তরুণরাই এটি করে এসেছে কারণ তাদের পক্ষেই তা সম্ভব।
এখন প্রযুক্তির কারণে তরুণদের মধ্যে বৈশ্বিক যোগাযোগ আগের চেয়ে বেড়েছে। তাদের জন্য আয় ও সুযোগ-সুবিধার নতুন পথ তৈরি হয়েছে। এখন উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের একজন শিক্ষার্থীও বিদেশে যাওয়ার কথা চিন্তা করে, যা আগে দেখা যেত না।
প্রযুক্তির কারণে বিশ্ব এখন অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে। তরুণরা অনলাইনে অনেক তথ্য পায়, বিদেশে থাকা আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে গ্লোবাল পারসপেক্টিভ তৈরি করছে।
তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, অনেকেই নিজেদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
আরেকটি বিষয় হলো, বর্তমানে তরুণদের একটি বড় অংশের কাছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পৌঁছানোর জন্য ইংরেজিতে অনুবাদ করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। ইংলিশ মিডিয়াম বা ইংলিশ ভার্সনে পড়ার কারণে এবং বাবা-মায়ের অমনোযোগিতার ফলে অনেকেই বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে রক্ষণশীলতা ও ধর্মীয় চিন্তা ভাবনার প্রাধান্য বাড়ছে, যা আগে এভাবে দেখা যায়নি। বিশ্বজুড়ে অনেক দেশেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
প্রশ্ন : তারা কি বেশি বৈষয়িকও হয়ে পড়ছে?
আনু মুহাম্মদ : আবার বৈষয়িকও হচ্ছে। মানসিকতার দিক দিয়ে এসব পরিবর্তন লক্ষণীয়।
প্রশ্ন : উন্নয়ন বলতে সাধারণত বড় বড় অবকাঠামো বোঝানো হয়। কিন্তু আপনার কাছে প্রকৃত উন্নয়ন কী?
আনু মুহাম্মদ : অবকাঠামো দরকার তবে উন্নয়ন বলতে আমি তার সঙ্গে মানুষের তার চারপাশ প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে বিকশিত জীবনের নিশ্চয়তা পাওয়ার পথকে বুঝি। উন্নয়ন বলতে আমি বুঝি, দেশের নিজস্ব ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক শক্তিকে বিকশিত করা এবং দুর্বলতাকে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সামাল দেওয়া।
বাংলাদেশের প্রধান তিনটি সম্পদ হলো উর্বর জমি, মানুষ এবং সুপেয় পানি। এই পানির সম্পদ ও উর্বর জমির ওপর ভিত্তি করে আমাদের প্রাণবৈচিত্র্য গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের জমি কম হলেও তা অত্যন্ত উর্বর এবং ভূগর্ভস্থ ও ভূউপরিস্থ পানির সম্পদ অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
আমাদের দুর্বলতা হলো জমির তুলনায় মানুষ বেশি। আমাদের শক্তির জায়গা অর্থাৎ উর্বর জমি, পানি সম্পদ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। আর সীমিত জমির কারণে গণপরিবহন, জনশিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে।
আমাদের দেশে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াকে উন্নয়ন মনে করা হচ্ছে, অথচ ঢাকা শহরে গণপরিবহনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দামি গাড়ির পাশাপাশি ভাঙাচোরা বাস চলছে।
বর্তমানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জমি ও সম্পদের মতো সর্বজনীন খাতগুলোর অবক্ষয় ঘটেছে। কিন্তু প্রকৃত উন্নয়ন হলো সবার জন্য উন্নত ও সমমানের শিক্ষা এবং চিকিৎসাসেবা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যে দেশে নাগরিকের চিকিৎসার নিশ্চয়তা থাকে না বা একটি মানসম্পন্ন সরকারি হাসপাতাল থাকে না, সে দেশকে কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে উন্নত বলা যায় না। ১ ট্রিলিয়ন ডলারের জিডিপি হলেও যদি সাধারণ মানুষ রাস্তায় পড়ে থাকে, তবে সেই প্রবৃদ্ধির কোনো অর্থ থাকে না।
প্রশ্ন : বিষয়টি তো অত্যন্ত সুস্পষ্ট। কিন্তু তা না হয়ে ঠিক উল্টোটা হচ্ছে এবং ব্যক্তিগত খাত ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি কীভাবে থামানো সম্ভব?
আনু মুহাম্মদ : দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় মানুষের প্রত্যাশা ছিল এটি পাকিস্তানের মতো বৈষম্যমূলক, সামরিক ও আমলাতন্ত্রভিত্তিক রাষ্ট্র হবে না; বরং গণতন্ত্র ও সর্বজনীন অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
কিন্তু স্বাধীনতার পর দেশে নতুন একটি শ্রেণি তৈরি হলো, যারা দ্রুত ক্ষমতা ও সম্পদের মালিক হতে চাইল।
শেখ মুজিবুর রহমান এই জনপদের মহানায়ক ছিলেন এবং তার মতো জনপ্রিয় নেতা বাংলাদেশে আর তৈরি হয়নি। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বন্দি ছিলেন, ধারণা করি স্বাধীনতার পর মানুষের পরিবর্তিত আকাক্সক্ষা তিনি অনুধাবন করতে পারেননি। সে সময় জরুরি বিষয়ে যেসব উদ্যোগ দরকার ছিল সেসব বিষয়ে তার মনোযোগ ছিল না। যার ফলে একটি সুবিধাভোগী শ্রেণি লাইসেন্স ও পারমিট ব্যবস্থার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। পরে বিশেষত এরশাদের সামরিক শাসনের সময় এই শ্রেণির বিকাশ আরও দ্রুত হয়।
এর পাশাপাশি ১৯৭৩ থেকেই বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবির মতো সংস্থাগুলো তাদের বৈশি^ক পুঁজিবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
৮০-এর দশক থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ শুরু হয়। ফলে সর্বজনীন অধিকারের পরিবর্তে সবকিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠীর মুনাফাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। এই নব্য উদারতাবাদী (নিউ লিবারেল) কাঠামোর মধ্যেই আমরা বর্তমানে আটকে আছি।
প্রশ্ন : অনেকেই আপনাকে উন্নয়নবিরোধী বলে মনে করে। আপনি নিশ্চয়ই এ ধরনের কথা শুনেছেন?
আনু মুহাম্মদ : হ্যাঁ, এটি প্রায়ই শুনতে হয়। আইএমএফের এক কর্মকর্তা বলেছিলেন, তারা আমাকে ‘মিস্টার নো’ (গৎ. ঘড়) বলে অভিহিত করেন, কারণ তাদের ভাষায় আমি সব কিছুতেই আপত্তি জানাই। স্বাধীন সমালোচনাকে রুদ্ধ করার জন্য এটি তাদের একটি অস্ত্র।
কিন্তু আমি কিসে ‘না’ বলছি তা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, তার পেছনে একটি বড় ‘হ্যাঁ’ রয়েছে। যখন রামপাল বা ফুলবাড়ী প্রকল্প বা মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নামের আদেশনামার বিরোধিতা করি, তখন জনস্বার্থ, পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যবস্থা এবং স্বাধীন জাতীয় সক্ষমতা আত্মমর্যাদার পক্ষেই দাঁড়াই। এই অবস্থান সুবিধাভোগী লুম্পেন দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর খুবই অপছন্দ।
শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নব্য উদারতাবাদের প্রভাব এতটাই বেশি যে, তরুণদের অনেকেও অনেক সময় এই ব্যবস্থার বাইরে চিন্তা করতে পারে না।
প্রশ্ন : আপনি কি ব্যক্তি হিসেবে আশাবাদী নাকি নিরাশাবাদী? কারণ বর্তমান প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে, সামাজিক সংগঠন থেকে দূরে সরে গিয়ে রিলস ও মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকছে এবং মনোযোগের পরিধি (অঃঃবহঃরড়হ ঝঢ়ধহ) কমে যাচ্ছে। এতে কি আমরা উত্তরণের সুযোগ হারিয়ে ফেলছি?
আনু মুহাম্মদ : এটি একটি বড় ঝুঁকির জায়গা। তবে প্রযুক্তিকে আমরা রোধ করতে পারব না, বরং এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
প্রযুক্তির কল্যাণে আজকাল অনেক অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে অনেক তথ্য জানে এবং সচেতনভাবে লিখতে ও বলতে পারে। আবার অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে পাঠ্যবইয়ের বাইরে জানার আগ্রহের অভাব দেখা যায়। তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর হয়ে পড়ছে।
আগে বই পড়া বা চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ সীমিত ছিল। এখন অনলাইনে সহজেই সব পাওয়া যায়। মোবাইল ইন্টারনেট গ্রামে গ্রামে পৌঁছে গেছে।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইন্টারনেটের কারণে মানুষ দ্রুত তথ্য পেয়েছে এবং কম সময়ে সংগঠিত হতে পেরেছে। প্রযুক্তির এই দ্রুত সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছে।
তাই প্রযুক্তির ইতিবাচক সম্ভাবনাকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে। তবে করপোরেট ও নব্য উদারতাবাদী ব্যবস্থার ফাঁদে পড়ে তরুণরা যাতে চিন্তাশূন্য না হয়ে পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
মানুষকে চিন্তাহীন রাখা দুটি গোষ্ঠীর স্বার্থ নিশ্চিত করে এক. নব্য উদারতাবাদী করপোরেট গোষ্ঠী, যারা মানুষকে যন্ত্রের মতো দেখতে চায়; দুই. ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী, যারা বিচারহীন বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে চায়।
করপোরেট ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের এই সম্মিলিত আগ্রাসন মোকাবিলা করতে হলে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, সাংস্কৃতিক তৎপরতা ও স্বাধীন চিন্তার ক্ষমতা বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আমি হাল ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে নই।