বিষাক্ত কেমিক্যালে দুধ

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১৯ এএম

কোনো বাধাই মানছে না পাবনার ভেজাল দুধ সিন্ডিকেট। প্রশাসনের দফায় দফায় সাঁড়াশি অভিযান, মোটা অঙ্কের জরিমানা কিংবা জেলদ- সবকিছুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলছে নকল দুধের কারবার। অধিক মুনাফা আর রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভে একশ্রেণির অসৎ ঘোষ ও ব্যবসায়ী কেমিক্যাল দিয়ে নকল দুধ বানানোর ব্যবসা অব্যাহত রেখেছে। রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতকৃত এসব ভেজাল দুধ সাধারণত খালি চোখে বা সাধারণ উপায়ে ধরার কোনো উপায় নেই। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের পাশাপাশি চরম বিপাকে পড়ছেন দুগ্ধ সংগ্রহকারী সংস্থাসমূহ ও সৎ খামারিরা।

তথ্য মতে, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলো থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটাসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানগুলো দুধ সংগ্রহ করে থাকে। ভেজাল প্রতিরোধে প্রক্রিয়াজাতকারী হাবগুলোতে এখন আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে দুধ পরীক্ষা করা হচ্ছে। ল্যাব পরীক্ষায় কেমিক্যাল বা নকল উপাদান ধরা পড়লেই সরাসরি রিজেক্ট (বাতিল) করা হচ্ছে চালান এবং বাতিল করা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট অসাধু সরবরাহকারীর আইডি (আইডেন্টিফিকেশন)। তবে এই কঠোর পদক্ষেপেও রোধ করা যাচ্ছে না অসাধু চক্রগুলোকে। ভেজাল দুধ প্রত্যাখ্যান করায় অনেক সময় সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ওপর চড়াও হচ্ছে তারা। গত বছর পাবনার চাটমোহরে অবস্থিত প্রাণ ডেইরির দুধ সংগ্রহকারী হাবের এক কর্মকর্তা ভেজাল শনাক্ত করে দুধ ফেরত দেওয়ায় এবং অসাধু ব্যবসায়ীর আইডি বাতিল করায় তার ওপর সরাসরি হামলার ঘটনা ঘটে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বেড়া, সাঁথিয়া, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলার অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রামে প্রকাশ্যে ও গোপনে চলছে বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশ্রিত কৃত্রিম দুধ তৈরির কারখানা। আসল দুধ থেকে ননি তুলে নিয়ে পানি ও সয়াবিন/পাম তেল ব্লেন্ডারে ফুটিয়ে কৃত্রিম ফ্যাট তৈরি করা হয়। পাশাপাশি ছানার পানির সঙ্গে ডিটারজেন্ট, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড ও কস্টিক সোডা মিশিয়ে প্রস্তুত করা হয় ফেনা ও গাঢ় কৃত্রিম দুধ। সাধারণত ভোর থেকে সকাল ৯টা এবং সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে এ কর্মকা-। অসাধু ব্যবসায়ীদের এমন কর্মকান্ডে সাধারণ খামারি ও সৎ ব্যবসায়ীরা চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন। আর ভোক্তারা পড়ছেন চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাঁথিয়া ও বেড়ার একাধিক দুগ্ধ সংগ্রহকারী আক্ষেপ করে বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দুধ সংগ্রহের পর তাতে ভেজাল মিশিয়ে বাজার নষ্ট করছে। প্রশাসন দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই অঞ্চলের দুগ্ধশিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।

এদিকে ভোজ্য তেল, ডিটারজেন্ট ও কস্টিক সোডা মিশ্রিত বিষাক্ত ভেজাল দুধ মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। পাবনার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. খায়রুল কবির বলেন, ভেজাল দুধে কোন কোন কেমিক্যাল বা ক্ষতিকারক পদার্থ ব্যবহার হচ্ছে ক্ষতিটা তার ওপর নির্ভর করে। তবে কিডনিসহ ক্যানসার ও বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এছাড়া অঙ্গহানি বা দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগও হতে পারে। এক্ষেত্রে যেকোনো মূল্যে এই ভেজাল দুধ উৎপাদন বন্ধ করা প্রয়োজন।

সম্প্রতি সাঁথিয়া উপজেলার জুই ডেইরি ফার্ম নামের এক প্রতিষ্ঠানকে ভোক্তা অধিকারের এক অভিযানে ২ হাজার ৫০০ লিটার ভেজাল দুধ জব্দ ও প্রতিষ্ঠানকে সিলগালা করা হয়। এছাড়াও চাটমোহর উপজেলা প্রশাসন এক বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ৩০০ লিটার নকল দুধ জব্দ, ১ মাসের বিনাশ্রম কারাদ- ও ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগে অভিযান আমিনা ডেইরিকে ৩০ হাজার এবং প্রিমিয়াম ফুডকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এবং বেড়ার নাকালিয়া ও পেঁচাকোলা বাজারে অভিযান চালিয়ে ভেজাল দুধ তৈরির প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানে ১২ বছর ভেজাল দুধ তৈরিতে যুক্ত জয়দেব ঘোষ নামের এক ব্যবসায়ীকে ২ লাখ টাকা জরিমানা ও এক বছরের কারাদ- দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভাঙ্গুড়া উপজেলার সিংগাড়ি গ্রামে উপজেলা প্রশাসনের এক বিশেষ অভিযানে আশরাফুল আলী নামের এক ব্যক্তিকে ২০০ লিটার ভেজাল দুধ এবং বিষাক্ত কেমিক্যালসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাকে ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদ- ও ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এভাবে প্রতিনিয়তই এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করছে প্রশাসন।

ভাঙ্গুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহমুদ হাসান রনি জানান, জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানে রয়েছে। অভিযান ও তদারকি আরও জোরদার করা হবে।

এ বিষয়ে পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ভেজাল দুধ সঠিকভাবে শনাক্ত করার জন্য উন্নত ল্যাব সুবিধা জরুরি, যা বর্তমানে পাবনায় নেই। রাজশাহী থেকে মাসে মাত্র একবার ভ্রাম্যমাণ ল্যাব আসে। পাবনায় একটি স্থায়ী আধুনিক ল্যাব স্থাপন করা গেলে এই অসাধু চক্রকে রোধ করা অনেকাংশেই সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে এই ল্যাব স্থাপনে আমরা চেষ্টা করছি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত