অচল তথ্য কমিশন পুনর্গঠন শিগগির

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২০ এএম

স্বাধীন তথ্য কমিশনের প্রধান ও অপর দুই কমিশনার পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রার্থী বাছাই শুরু হবে শিগগির। এ লক্ষ্যে সার্চ কমিটি পুনর্গঠন করেছে সরকার। ইতিমধ্যে দুই দফায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করার মাধ্যমে শতাধিক প্রার্থীর আবেদনও পেয়েছে সার্চ কমিটি। দুএকদিনের মধ্যেই কমিটির বৈঠক হবে বলে জানা গেছে। এরপর পর্যায়ক্রমে আবেদনকারীদের মধ্য থেকে যোগ্যতরদের বাছাই করে সংশ্লিষ্টদের সম্পর্কে গোয়েন্দা রিপোর্ট নিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। সবশেষ ধাপে তথ্য কমিশনে চূড়ান্ত নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদান ও দায়িত্ব অর্পণের গেজেট প্রকাশিত হবে। এক মাসের মধ্যেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলে তথ্য কমিশনের দুই কমিশনার পদত্যাগ করে সরে যান। পরে অপর একজনকে অপসারণ করা হয়। সেই সময় থেকেই কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে তথ্য কমিশন। কমিশনে কয়েকশ অভিযোগ নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। কমিশন অচল থাকায় এসব অভিযোগের শুনানি হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এত দীর্ঘ সময় তথ্য কমিশন অচল থাকেনি। ফলে তথ্য পেতে নাগরিকের অধিকারও পূরণ হচ্ছে না। এ ছাড়াও তথ্য অধিকার বিষয়ক প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম, প্রকাশনাসহ অন্যান্য কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়েছে।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বর্তমান সরকার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তথ্য কমিশনকে পূর্ণ উদ্যমে সচল করতে উদ্যোগ নেয়। তারই অংশ হিসেবে গত ৯ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের নেতৃত্বে একটি সার্চ বা বাছাই কমিটি গঠন করে দেয়। কিন্তু সার্চ কমিটি কার্যক্রম শুরু করলে মাঝপথে কমিটির অন্যতম সদস্য আন্দালিভ রহমান সরকারের মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হওয়ায় তথ্য কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি জামালপুর-৩ আসনের এমপি মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলকে সার্চ কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে। কমিটির কার্যক্রম আবারও শুরু হবে। ওই কর্মকর্তা জানান, দুয়েক দিনের মধ্যেই পুনর্গঠিত সার্চ কমিটি বসবে। আশা করা যাচ্ছে তথ্য কমিশনারদের নিয়োগ প্রক্রিয়া এক মাসের মধ্যেই সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ ব্যাপারে তাগিদ রয়েছে।

সার্চ কমিটি তথ্য কমিশন পুনর্গঠনের লক্ষ্যে প্রথম দফায় গত ২২ জুলাই প্রধান তথ্য কমিশনার (সিআইসি) ও অপর দুই তথ্য কমিশনার (আইসি) পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রত্যাশিত সংখ্যক যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থী পায়নি। পরে ১২ আগস্ট নতুন করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। দ্বিতীয় দফার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনের শেষ তারিখ ছিল ২৩ আগস্ট। এবারে তুলনামূলক বেশি সংখ্যক প্রার্থী পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে। সব মিলিয়ে মোট প্রার্থী হবে প্রায় ১০০ জনের মতো। সূত্র জানায়, সরকার তথ্য কমিশনে একজন যোগ্যতর নারীও নিয়োগ দিতে চায়। 

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গত ২০ আগস্ট এক মাসের মধ্যে তথ্য কমিশন পুনর্গঠন করার কথা জানিয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে নিয়োজিত বাছাই কমিটি আন্তরিকভাবে কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের নেতৃত্বে বর্তমান বাছাই কমিটিতে রয়েছেন পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ ও জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল। বাছাই কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দিচ্ছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সম্প্রচার ও উন্নয়ন) মো. শাহ আলম।

বাছাই কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, ‘তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯’-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী গঠিত কমিটি প্রধান তথ্য কমিশনার ও তথ্য কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে সভায় উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুজন করে ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবেন।

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে তথ্য কমিশন গঠিত হয়। কোনো ব্যক্তি তথ্য না পেলে কমিশনে অভিযোগ করতে পারেন। অভিযোগের শুনানি শেষে কমিশন জরিমানা আরোপ, ক্ষতিপূরণ প্রদান কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারে। ওই তথ্য অধিকার আইনের আওতায় মানুষের তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে গঠিত তথ্য কমিশন বিগত দুই বছরের বেশি সময় ধরেই কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। এ কারণে তথ্য না পাওয়ার অভিযোগের শুনানি বন্ধ রয়েছে।

তথ্য কমিশনের মূল দায়িত্ব হলো অভিযোগের শুনানি, তথ্য অধিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা। কিন্তু এই তিন মৌলিক কাজই বন্ধ রয়েছে। আইন অনুযায়ী প্রতি বছরের ৩১ মার্চের মধ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও কমিশন না থাকায় গত দুই বছরে তা প্রতিপালন করা হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেছেন, আগের তথ্য কমিশনগুলো নামকাওয়াস্তে ছিল। এবার একটি কার্যকর ও স্বাধীন তথ্য কমিশন গঠন করা হবে। তথ্য দিতে কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠান অনীহা দেখালে প্রতিকারের ব্যবস্থাও নেবে কমিশন।

তিনি বলেন, তথ্য পেতে সমস্যা হতে পারে বলেই তথ্য কমিশন করা হয়েছে। কমিশন আইনের মাধ্যমে গঠিত একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। সেখানে যারা থাকবেন, সরকার চাইলেই তাদের অপসারণ করতে পারবে না। বিচারকদের যেভাবে অপসারণ করা হয়, সেভাবেই কমিশনের সদস্যদের অপসারণের বিধান রয়েছে। ভবিষ্যতে তথ্য পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে কমিশন নিজ থেকেই নির্দেশনা দেবে।

তিনি বলেন, মেইনস্ট্রিম (মূলধারার) মিডিয়াতেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডিজইনফরমেশন (অপতথ্য ছড়ানো) হচ্ছে। আমাকে নিয়েও ডিজইনফরমেশনের কার্ড বানানো হয়েছে। অনেক সময় কোনো বক্তব্যের একটি বাক্য তুলে ধরে আশপাশের বক্তব্য বাদ দেওয়া হচ্ছে। আমি মনে করি, এসব (অপতথ্য প্রতিরোধ) বিষয়েও তথ্য কমিশনের দায়িত্ব রয়েছে। এছাড়া তথ্যের অবাধ ব্যবহার নিয়ে সতর্কতা অবলম্বনেও সবাইকে সচেতন হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত