রাজধানীতে আরও একটি মেট্রোরেল নির্মাণের প্রকল্প পাস করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেক সভায় এই প্রকল্প পাস হয়। গাবতলী থেকে দাসেরকান্দি পর্যন্ত এই মেট্রোলাইন হবে। এটি হলো ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৫), সাউদার্ন রুট। নতুন এই প্রকল্পের খরচ হবে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। সভায় আরও দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের খরচ বাড়ানো হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। এই দুটি প্রকল্পে দ্বিতীয়বারের মতো খরচ বাড়িয়ে সংশোধন করা হলো। এখন ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের লাইন ৫-এর নর্দান রুটের খরচ দাঁড়াল ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা এবং ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (লাইন-১) ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। রাজধানীর গণপরিবহনে যুক্ত হতে যাওয়া মেট্রোরেলের এই তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা।
এদিন সভায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে মোট ১২টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। এর সাতটি নতুন এবং পাঁচটি সংশোধিত। এতে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৪৮ হাজার ২৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ১ লাখ ২০ হাজার ৪৬৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। মেট্রোরেল ছাড়া অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে আছে, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সড়ক জোনের জেলা মহাসড়ক উন্নয়ন; নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালু; বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ; বরিশাল সেনানিবাস স্থাপন ও খুলনা নৌ-অঞ্চলে নৌ সদস্যদের আবাসনসহ অবকাঠামো নির্মাণ; খুলনা পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নয়ন; বস্ত্র ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা উন্নয়ন; মনপুরা দ্বীপাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের প্রকল্প।
একনেক সভা শেষে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি মেট্রোরেল প্রকল্পগুলো নিয়ে কথা বলেন। এ সময় তিনি বিগত সরকারের সময়ে নির্মিত মেট্রোরেলের পিলারে ফাটলের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কথা সাংবাদিকদের জানান।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম মেট্রোরেল এমআরটি লাইন ৬-এর ২৭টি ত্রুটিপূর্ণ বেয়ারিং প্যাডকে ক্রিটিক্যাল হিসেবে এবং ৪৬টি পিয়ারে বিভিন্ন মাত্রায় ফাটল চিহ্নিত হয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন।
এ বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, মেট্রোরেলে ফাটলের বিষয়টি দ্রুত নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্যতার জায়গায় নেওয়া হবে। এখানে কোনো ত্রুটি, গাফিলতি, অবহেলা কিংবা দুর্নীতির কারণে এ ধরনের দুর্বলতা তৈরি হয়ে থাকলে তার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
পরবর্তী প্রকল্পগুলোতে এমন কোনো সমস্যা তৈরি হওয়ার শঙ্কার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নতুন এমআরটি লাইনগুলো যেহেতু আন্ডারগ্রাউন্ডে যাচ্ছে, সেখানে নতুন একটি ঝুঁকির বিষয় যুক্ত হয়েছে, যা আগে হিসাবে ধরা হয়নি। যতটুকু অংশ আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকবে, তার ওপর থাকা স্থাপনা, বসতবাড়ি, অফিস ভবন ও রাস্তাঘাটের কোনো অংশে ফাটল বা অন্য কোনো ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান শুধু ক্ষতিপূরণই দেবে না, মেরামতসহ পুরো দায়ও নেবে। বিশেষত এ দায় তিন বছর পর্যন্ত তাদের থাকবে।
মেট্রোরেলের নতুন প্রকল্পে খরচ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মেট্রোরেলে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির মান বৃদ্ধিতে বেশ কিছু নতুন বিষয় সংযোজন করা হয়েছে, যার ফলে সার্বিক খরচ কিছুটা বেড়েছে। বর্তমান সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো সব প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্যারালালি প্রযুক্তি স্থানান্তর নিশ্চিত করা। কেবল জনবলের দিক থেকেই নয়, প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও কীভাবে এই প্রযুক্তি স্থানান্তর সফল করা যায়, তা বিবেচনায় রেখে সম্পূরক ও প্যারালাল প্রকল্প গ্রহণ করার কাজ চলছে।
অনুমোদন পাওয়া মেট্রোরেলের তিনটি প্রকল্প হলো মেট্রোরেল লাইন-৫ সাউদার্ন রুট, মেট্রোরেল লাইন-১ এবং মেট্রোরেল লাইন-৫ নর্দান রুট। তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা।
প্রকল্পগুলোর মধ্যে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর-কমলাপুর) ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দান (হেমায়েতপুর-ভাটারা) প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ অর্থায়নে নতুন এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন (গাবতলী-দাশেরকান্দি) প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, শুরুতে একনেকের মূল এজেন্ডায় শুধু এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা ছিল। তবে পরে সমন্বিত অগ্রগতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ নর্দান প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ সংশোধনের প্রস্তাবও একই সভায় উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জাইকার অর্থায়নে ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এমআরটি লাইন-৫ নর্দান প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
অন্যদিকে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার পাতালপথসহ মোট ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।