ঝোপে ঢাকা আবদালের মসজিদ

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৮ এএম

ঝোপঝাড়ে ঢাকা ভাঙা ইটের দেয়াল। কোথাও পুরনো ইটের গাঁথুনি, কোথাও লতাপাতা ও ফুলের কারুকাজের চিহ্ন। মাথার ওপর নেই ছাদ, নেই গম্বুজের পূর্ণ অবয়ব। মসজিদের ভেতর জন্ম নেওয়া বড় গাছের শিকড় আঁকড়ে ধরেছে প্রাচীন দেয়াল।

বহু বছর ধরে সেখানে শোনা যায় না আজানের ধ্বনি। নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার চকমাহাপুর গ্রামের এই নীরব স্থাপনাই স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ‘আবদালের মসজিদ’ নামে। প্রায় তিনশ বছরের পুরনো এই মসজিদটি দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলা আর প্রাকৃতিক ক্ষয়ে আজ বিলুপ্তির পথে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংরক্ষণের জন্য কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে মসজিদটির জরিপ, সীমানা নির্ধারণ, জঙ্গল পরিষ্কার করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

বাগাতিপাড়া উপজেলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে এই মসজিদের অতীত। লোকমুখে প্রচলিত আছে, পদ্মার শাখা বড়াল নদ থেকে উৎপন্ন একটি নদী একসময় এ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো। এই নদীতে একসময় প্রচুর ঝিনুক ও শামুক পাওয়া যেত। সেগুলো পুড়িয়ে তৈরি করা হতো চুন। এই চুন উৎপাদনকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে মুসলিম জনগোষ্ঠীর পেশাভিত্তিক আবদাল সম্প্রদায়।

স্থানীয়দের মতে, ‘আবদালের মসজিদ’কে শুধু একটি পুরনো ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাগাতিপাড়ার নদীকেন্দ্রিক জনপদ, ঝিনুক-শামুক থেকে চুন তৈরির শিল্প, স্থানীয় অর্থনীতি এবং প্রায় হারিয়ে যাওয়া আবদাল সম্প্রদায়ের জীবন ও পেশার ইতিহাস।

বাগাতিপাড়া উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য গবেষক আজিজুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ বছর আগে নবাব মুর্শিদকুলী খাঁর শাসনামলে চকমাহাপুর গ্রামের নদীতীরে আবদাল সম্প্রদায়ের লোকজন এই মসজিদ নির্মাণ করেন। স্থাপত্যশৈলী ও নির্মাণকৌশলের দিক থেকে এটি তৎকালীন গ্রামীণ স্থাপত্যের ব্যতিক্রমী নিদর্শন ছিল। একসময় মসজিদের আশপাশে আরও অনেক পুরনো স্থাপনা ও ইট ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। সময়ের সঙ্গে সেগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। জীবিকার তাগিদে আবদাল সম্প্রদায়ের মানুষও বিভিন্ন পেশায় ছড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তারা এলাকা ছেড়ে যান। তাদের চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে মসজিদটি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চকমাহাপুর থেকে বাঘা, আড়ানী যাওয়ার পথে মূল সড়কের ডানপাশে একটি সরু রাস্তা। সেখান থেকে পশ্চিম দিকে প্রায় ২০০ গজ এগোলেই জঙ্গলের আড়ালে চোখে পড়ে মসজিদের ধ্বংসাবশেষ। প্রায় ১৯ শতক জমির উঁচু ভিটার একটি অংশে এখনো দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন স্থাপনাটির অবশিষ্ট দেয়াল। মসজিদের চারপাশে খেজুর, ভেন্না ও নানা ধরনের ঝোপঝাড়ে জায়গাটি প্রায় ঢেকে গেছে। সাপ-পোকামাকড়ের ভয়ে অনেকেই এখন সেখানে যেতে চান না। মসজিদের অবশিষ্ট স্থাপনাটি আনুমানিক ১০ ফুট লম্বা ও প্রস্থে ১২ ফুট। দেয়ালগুলোর উচ্চতা প্রায় ১০ থেকে ১২ ফুট। দেয়ালগুলোর পুরুত্ব আনুমানিক দেড় ফুট। ছোট ছোট পুরনো ইট ও সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত দেয়ালগুলো এখনো অতীতের নির্মাণশৈলীর সাক্ষ্য বহন করছে। মসজিদের দরজাগুলোও স্থাপনাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দরজাগুলো অনেকটা ইংরেজি ইউ আকৃতির। দরজার গাঁথুনি আনুমানিক দুই ফুট পুরু। প্রতিটি দরজার ভেতরে প্রায় চার ফুট ফাঁকা জায়গা রয়েছে। দরজার গাঁথুনিতে পুরনো আমলের ইটের প্রায় পাঁচটি করে স্তর বা সারির চিহ্নও দেখা যায়। মসজিদের পূর্ব ও পশ্চিম দেয়ালে এখনো লতাপাতা ও ফুলের কারুকাজের চিহ্ন রয়েছে। প্রাচীন নকশায় নির্মিত ৫টি দরজার চিহ্নও দেখা যায়। আর দেওয়ালের গায়ে দুই একটি নকশা এখনো বিদ্যামান।

পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন বলেন, আবদালের মসজিদটি আমাদের এলাকার একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাটি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুল ইসলাম বলেন, আবদালের মসজিদটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজনে প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত