মারিয়ার মৃত্যু হত্যা নাকি আত্মহত্যা, রহস্য কাটেনি তিন মাসেও

ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও হত্যা মামলা হয়েছে ১৫ জনের বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রধান শিক্ষক, আইসিটি শিক্ষক, সংবাদকর্মী ও এক শিক্ষার্থীসহ নয়জন। সবাই জামিনে মুক্ত হলেও মারিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে এখনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৫ পিএম

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মারিয়া মাহির মৃত্যুর প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও ঘটনাটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা, তা নিয়ে রহস্য কাটেনি। ১৪ বছর বয়সী এই কিশোরীর মৃত্যু ঘিরে করা হত্যা মামলায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, আইসিটি শিক্ষক, সংবাদকর্মী, দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের কেউ দিনের পর দিন কারাগারে ছিলেন, কেউ রিমান্ডের মুখোমুখি হয়েছেন। পরে আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন সবাই।

গত ১৫ জুন স্কুল থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় মারিয়া। ছয় দিন পর ২১ জুন সিংগাইর উপজেলার চন্দননগর এলাকার একটি কবরস্থানসংলগ্ন ঝোপে গাছের ডালে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাওয়ায় শুরু থেকেই ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে আলোচনায় আসে।

পরদিন ২২ জুন মারিয়ার মা কামরুন্নাহার বাদী হয়ে সিংগাইর থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়। পরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর এজাহারভুক্ত আরও একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

তবে তদন্তের বর্তমান পর্যায়ে এসে মৃত্যুর কারণ নিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মারিয়ার মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সিংগাইর থানার ওসি মো. মাজহারুল ইসলামও জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথা এসেছে।

জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলমও বলেছেন, পোস্টমর্টেম রিপোর্টে আত্মহত্যা করে মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি পুলিশ ‘স্টাডি’ করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে মামলার তদন্তে শতভাগ ইনসাফ করা হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। তবে পুলিশ এখনো এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রকাশ করেনি।

মৃত্যুর ধরন নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, ওই প্রতিবেদনে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন কিংবা হত্যার স্পষ্ট কোনো আলামতের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে মারিয়ার পরিবার মরদেহের নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টিকে হত্যার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কয়েক দিন মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থায় থাকায় টানা বৃষ্টির কারণে শরীরের নিচের অংশ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। তবে এই দুই ভিন্ন ব্যাখ্যার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কী, তা পরিষ্কার হতে ফরেনসিক ও পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আশপাশের বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে যে মারিয়া ঘটনাস্থলের দিকে একাই গিয়েছিল। সেখানে অন্য কারও যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করেছেন ওই কর্মকর্তা।

তদন্তে এই তথ্য নিশ্চিত হলে ঘটনাস্থলে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি বা সম্পৃক্ততার প্রমাণ কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল বিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি অভিযোগকে ঘিরে। গত ১০ জুন সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে মারিয়া ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিফকে ‘ঘনিষ্ঠ অবস্থায়’ দেখার অভিযোগ ওঠে। কয়েক দিন বিষয়টি বিদ্যালয়ে আলোচনায় থাকার পর ১৫ জুন শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে প্রধান শিক্ষকের কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়।

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অভিভাবকদের ডেকে মুচলেকা নেওয়া হয় এবং দুজনকেই টিসি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর পরই স্কুল থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় মারিয়া। ছয় দিন পর উদ্ধার হয় তার মরদেহ।

মারিয়া স্কুল থেকে বের হওয়ার পর কোথায় কোথায় গিয়েছিল, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এবং তার গতিপথের প্রতিটি ধাপ কতটা অনুসরণ করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য কতটা বিশ্লেষণ করা হয়েছে, বিদ্যালয় ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ কীভাবে যাচাই করা হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রেস ব্রিফিং করা হয়নি।

মরদেহ উদ্ধারের রাতের ঘটনাপ্রবাহ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে পরে জামিনে মুক্ত হওয়া শিক্ষক ও সংবাদকর্মী পীর ইয়াকুব হোসেন মোল্লা। তাঁর দাবি, ২১ জুন রাতে তিনি সিংগাইর প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. সোহরাব হোসেন, সাধারণ সম্পাদক রকিবুল হাসান বিশ্বাসসহ কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে আশুরা উপলক্ষে তাঁর বাড়ির বার্ষিক আয়োজনের বিষয়ে থানার ওসি মো. মাজহারুল ইসলামকে অবহিত করতে যান।

ইয়াকুবের ভাষ্য, ওরশ অনুষ্ঠানের বিষয়টি ওসিকে জানানোর পর অন্য সাংবাদিকরা থানার বাইরে চলে যান। মোটরসাইকেল বের করতে কিছুটা সময় লাগায় তিনি দৈনিক বাংলা বাজার পত্রিকার প্রতিনিধি হাবিবুর রহমানকে নিয়ে থানায় ছিলেন।

ইয়াকুবের অভিযোগ, এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. আব্দুল মোমিন তাঁকে ‘কথা আছে’ বলে বসিয়ে রাখেন। পরে তাঁকে মামলায় হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে আসামি করা হয় এবং রিমান্ড চাওয়া হয়। জামিনে মুক্তির পর তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ইয়াকুব আরও দাবি করেন, একজন আইসিটি শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাঁকে মানসিকভাবে চাপ দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মামলা হওয়ার আগের রাতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলামকেও থানায় নিয়ে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরদিন তাঁকেসহ বিদ্যালয়ের তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলায় হত্যার নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযোগ আনা হয় বলে দাবি করেন ইয়াকুব।

এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বিস্তারিত বক্তব্য প্রকাশ্যে আসা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হত্যা মামলায় কোনো শিক্ষক, সংবাদকর্মী বা অন্য কাউকে আসামি করার ক্ষেত্রে তাঁর বিরুদ্ধে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা তদন্তের স্বচ্ছতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

একইভাবে ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার কথা উঠে এলে সেই প্রতিবেদনের সঙ্গে মামলার অভিযোগ, ঘটনাস্থলের আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং অন্যান্য ফরেনসিক উপাদানের মিল-অমিলও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

এদিকে সিংগাইর প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. সোহরাব হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক রকিবুল হাসান বিশ্বাস অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় একটি দালালচক্রের প্ররোচনায় কয়েকজন নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, নিহতের পরিবারকে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করার পরও মামলাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য তাঁদের রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা নিরপেক্ষ তদন্ত এবং নিরীহ মানুষকে হয়রানির জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলামও একই ধরনের দাবি করেছেন। তাঁর ভাষ্য, বিদ্যালয়ে নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী। গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে অভিভাবকদের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছিল এবং নিয়ম অনুযায়ী টিসি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পরে তাঁকে থানায় ডেকে এনে হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই হত্যার বিচার দাবিতে সাহরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন হয়। থানাও ঘেরাও করা হয়। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেগ পেতে হয়। ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যেও হত্যার অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল।

ইতোমধ্যে মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া নয়জনই জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তাঁরা হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে মারিয়ার পরিবার শুরু থেকেই ঘটনাটিকে হত্যা বলে দাবি করে আসছে। সেই দাবিতেই তাঁর মা কামরুন্নাহার হত্যা মামলা করেন।

মারিয়ার বাবা মিজানুর রহমান দেওয়ান বলেছেন, ‘পুলিশ বলেছে ডাক্তারি রিপোর্ট অনুযায়ী আমার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। আমি তা বিশ্বাস করি না।’ তাঁর দাবি, মারিয়া নিখোঁজ হওয়ার পর কয়েকজন তাঁদের পরিবারের কাছে টাকা দাবি করেছিলেন।

শিক্ষকদের মামলায় জড়ানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি প্রকাশ না করতে আমার মেয়ে প্রধান শিক্ষকের পা পর্যন্ত ধরেছিল—এমন কথা শুনেছি। প্রধান শিক্ষক ঘটনাটি সামনে না আনলে হয়তো আমার মেয়ের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটত না।’

ফলে একদিকে পরিবারের হত্যা দাবি, অন্যদিকে ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার কথা উঠে আসা এবং তদন্তে পাওয়া সিসিটিভি-সংক্রান্ত তথ্য—সবকিছু মিলিয়ে মারিয়ার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মারিয়া আত্মহত্যা করে থাকলে তার পেছনে কী কারণ ছিল, আর যদি হত্যা হয়ে থাকে তাহলে কারা জড়িত—দুই ক্ষেত্রেই উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক তদন্ত। ময়নাতদন্ত, সুরতহাল প্রতিবেদন, ফরেনসিক আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, ঘটনাস্থলের গতিপথ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য—সবকিছুর সমন্বিত বিশ্লেষণেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত সত্য।

কারণ, শুধু মারিয়ার মৃত্যুর কারণ নির্ধারণই নয়, এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে হয়রানির অভিযোগ তোলা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হতে পারে একটি নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর তদন্ত।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত