সুন্দরবনে দস্যুতা বন্ধে কয়েক বছর ধরে চলা আত্মসমর্পণ কার্যক্রমে বড় সাফল্য এলেও সম্প্রতি নতুন আতঙ্ক ছড়িয়েছে ভারতের ‘কাজল-মুন্না’ বাহিনী। জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালিদের অভিযোগ, এই বাহিনীর সদস্যরা সুন্দরবনে প্রবেশ করে জেলেদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়, মাছ ও কাঁকড়া লুটসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। এ কারণে অনেকে বৈধ পাস নিয়ে সুন্দরবনে যেতেও ভয় পাচ্ছেন। স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রানাঘাটের ধানতলা থানার পাঁচবেড়িয়া গ্রামের কিশোর রায় ওরফে কাজল ওরফে মুন্নার নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি দল সুন্দরবনে সক্রিয় রয়েছে। দলটিকে ‘কাজল-মুন্না বাহিনী’ নামে ডাকা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই দলের সঙ্গে ভারতের মোল্লাখালী এলাকার গোপাল ম-ল, কাকমারি সাতজেলিয়ার কাঁকড়া ডিপোর মালিক সঞ্জয় নায়েক, মোল্লাখালী পালমারি খেয়াঘাটের বাপ্পি ম-ল, চুনোখালীর মিন্টু মোড়ল, কালিতলার আলী হোসেন ও মোল্লাখালীর সিদ্ধেশ্বরসহ কয়েকজনের যোগাযোগ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, মাধবকাটি পাটঘেরা এলাকার নেপাল ম-ল ও জোনাব নামের ব্যক্তিরাও দলটিকে নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখেন।
ভুক্তভোগীদের স্বজনরা জানান, গত এক সপ্তাহে এই দলের হাতে অন্তত ১৫ জন জেলে জিম্মি হয়েছেন। তাদের কয়েকজন মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছেন। কেউ কেউ এখনো জিম্মি রয়েছেন। জিম্মিদের দিয়ে দস্যুতার কাজে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
সম্প্রতি সুন্দরবন থেকে ফিরে আসা শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনীর দাতিনাখালী গ্রামের আব্দুল্লাহ বলেন, ‘বৈধ পাস নিয়ে সুন্দরবনে যাওয়ার পর ফিরিঙ্গি এলাকায় আমাদের আটক করা হয়। দস্যুদলটি নিজেদের কাজল-মুন্না বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।’ এ ছাড়া প্রায় এক মাস আগে সুন্দরবনে যাওয়ার পর কালিঞ্চি এলাকার খানজাহান নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, খানজাহান ওই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার স্ত্রীর মাধ্যমে মুক্তিপণের টাকা সংগ্রহ করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় জেলে ও বনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরবনে ‘কাজল-মুন্না’ ও ‘জোনাব’ নামে দুটি বাহিনীর কথা প্রচলিত থাকলেও মূলত তারা একই দল। অভিযোগ রয়েছে, এক মাস কাজল-মুন্না বাহিনীর নামে এবং পরের মাস জোনাব বাহিনীর নামে জেলেদের থেকে অর্থ আদায় করা হয়। জেলেদের থেকে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে আদায় করা মুক্তিপণের টাকা শৈলখালী এলাকার সহদেব নামের এক ব্যক্তি হুন্ডি ব্যবস্থার মাধ্যমে ভারতে পাচার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলেও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, জেলেদের জিম্মি ও মুক্তিপণ আদায়ের পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে মাদক ও গরু পাচারকারীদের সহযোগিতা, হরিণ ও বাঘ শিকারসহ বিভিন্ন অপরাধেও দলটির সদস্যরা জড়িত। সম্প্রতি শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনীর চুনা, মুন্সিগঞ্জের হরিনগর, বড় ভেটখালী ও রমজান নগরের টেংরাখালী এলাকায় র্যাব ও পুলিশের পৃথক অভিযানে ভারতীয় ওষুধ, মাদক ও কসমেটিকসসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব পণ্য সুন্দরবনের ভেতরের পথ ব্যবহার করে পারাপারে কাজল-মুন্না বাহিনী সহযোগিতা করে।
সুন্দরবনে দীর্ঘদিন ধরে দস্যুতা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও আত্মসমর্পণ কার্যক্রমে বনজীবীদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরে এসেছিল। নতুন করে সশস্ত্র দল অপতৎপরতায় আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় জেলে ও বাওয়ালিরা। সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘কাজল-মুন্না’ বাহিনীর সদস্যদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং জিম্মিদের উদ্ধারের দাবি জানান তারা।